পঞ্চান্ন বছরের বাংলাদেশ
বিভেদ বিভাজন বৈষম্যের বেড়াজালে : ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ
Printed Edition
নতুন বাংলাদেশের সমাজ রাজনীতি অর্থনীতি সবই এখন সবার। দলীয় রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি করে নয়, ছাত্র, শিক্ষক, বার কাউন্সিল, ট্রেড ইউনিয়ন, ব্যবসায়-বাণিজ্য সংগঠন, রাষ্ট্রীয় সংস্থা, পেশাজীবীদের সমিতির রাজনীতি যদি হয় শুধু বাংলাদেশপন্থি, তাহলেই মিলবে প্রকৃত মুক্তি
সেই স্বর্গবাসের কাল থেকে বিভেদ-বিভাজন বৈষম্য চলে আসছে। আদি চাচারা হাবিল-কাবিল বিভাজন মতানৈক্যের ফেরে পড়ে প্রথম খুনোখুনির শিকার হয়েছিল। সেই থেকে আজ পর্যন্ত আমাদের এই প্রিয় বাংলাদেশে, যে দেশকে কেউ কেউ বেহেশতের সাথে তুলনা করতেন, যে দেশটির মতো আর কোনো দেশ খুঁজে পাওয়া যাবে না বলে আমলা গীতিকবি দ্বিজেন্দ্রলাল দেশপ্রেমের সুর সেধেছিলেন, এক সময় যে দেশকে ‘চিরজীবী’ হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হতো সব বক্তৃতার শেষে, যারা শহীদ হয়েছেন তাদের প্রতি আমরা গভীর শ্রদ্ধা জানাই, তবে হিসাব কষে বের করা যাবে এই শতসহ¯্র মৃত্যুর শতভাগ কারণ বিভেদ বিভাজন বৈষম্যের বেড়াজালে আটকিয়েই।
বেশি দূরে যাওয়ার দরকার নেই, মাত্র ২৬৯ বছর আগে এই ভারতবর্ষে যে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে বিশ্বাসঘাতকতার পরিণতিতে সাতসমুদ্র তেরো নদীর পার থেকে আসা ইংরেজরা এদেশীয়দের মধ্যে বিভেদ-বিভাজন বৈষম্যের বেড়াজালে ১৯০ বছর আটকিয়ে রাখতে পেরেছিল এবং এই সমতটে সদর্পে টিকে থাকতে পেরেছিল। ১৯৪৫ সালে সাতসমুদ্র তেরো নদীর পারে লন্ডনে বসেই চার্চিল সাহেব স্বাধীনতা দেয়ার নাম করে যেভাবে ভারত ভাগের চাল চেলেছিলেন, তা ছিল ঐক্যবদ্ধ ভারতকে বিভাজিত করা; তার অন্যতম কূটকৌশল ছিল ভারতের প্রধান দুই সমৃদ্ধ অঞ্চল বাংলা ও পাঞ্জাবকে দ্বিখণ্ডিত করে দুই পরম শত্রুর সংসারে গুছিয়ে দেয়া। ফলে ভয়াবহতম মানবিক বিপর্যয়ের শিকার হয়েছিল বাংলা ও পাঞ্জাবের মানুষ। আজও আঞ্চলিক অর্থনীতি ও সমৃদ্ধি সাধনের পথে অন্তরায় হিসেবে আছে এই বিভেদ-বিভাজন মানসিকতা। ভারত তথা বাংলা ভাগের সময় নিছক অর্থনৈতিক স্বার্থের কারণে কলকাতাকে পশ্চিমবঙ্গে তথা ভারতের ভাগে রাখতে চেয়েছে। আবার তারাই চট্টগ্রামকে পূর্ববঙ্গে দেয়ার বিরোধিতাসহ ভারতের ওপর দিয়ে নেপাল ও ভুটানে কানেকটিভিটি দেয়ায় বাধ সেধেছে। আন্তর্জাতিক নদী গঙ্গা ও তিস্তার পানিতে ভাটির দেশ বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা দিতে নানান কূটকৌশলের ক্যারিশমা চলছেই। উজানে পানি সরিয়ে নিয়ে ফারাক্কায় পানিপ্রবাহ কমিয়ে ভাটির দেশে নদী ও নিসর্গ, কৃষি অর্থনীতি এবং প্রাকৃতিক সুরক্ষা সুন্দরবনকে ধ্বংসের স্লো পয়জনিং চলছে। তিস্তার উৎসমুখ ও মধ্য পর্যায়ে পানি সরিয়ে তিস্তাকে পানিশূন্য করে এখন শোনানো হচ্ছে, বলা হচ্ছে- ‘পানি নেই তো দেব কোত্থেকে?’ এক্ষেত্রে ভূ-রাজনীতির ভায়রা ভাইদের মধ্যে ঠাণ্ডা যুদ্ধের শিকার হচ্ছে ভাটির দেশ বাংলাদেশ। এমনকি একই দেশের কেন্দ্রীয় সরকার তদীয় রাজ্য সরকারের সঙ্গে নিজেদেও (অভ্যন্তরীণ) তর্কাতর্কির অভিনয়ে বাংলাদেশকে বোঝাতে চাওয়া হচ্ছে, তিস্তার পানি না দেয়ার অজুহাত তৈরি করে প্রকারান্তরে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের (উভয়ে একত্রে সেই বৃহৎ বাংলা) মধ্যকার বিভেদ-বিসম্বাদ বজায় রাখতে পারলে তাতে মিলবে কেন্দ্রীয় সরকারের স্বস্তি এবং সুদূরপ্রসারী সেই পরিকল্পনা এরা যেন বন্ধুত্বে এক না হতে পারে তার পথ পরিষ্কার রাখা ।
প্রতিবেশীর রাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের কানেকটিভিটির কথা বলে কানেকটিভিটির মন্ত্র বাংলাদেশকে শুনিয়ে নিজে নিজে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে সাত রাজ্যে যাওয়ার পথ ট্রানজিট নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সাত রাজ্যের কানেকটিভিটির সম্ভাবনা ও সুযোগকে গলা টিপে হত্যা করার চেষ্টা চলেছে। আস্তে আস্তে এটাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে মাতারবাড়ি ও সোনাদিয়ায় জাপানি সহায়তায় গড়ে তোলা অবকাঠামোর সুযোগ সম্প্রসারিত করার কথা সেই সাত রাজ্যে। এখানেও এক ঢিলে দুই পাখি শিকারের সাফল্যের স্বপ্ন দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক নদী পানির হিস্যা দিতে গড়িমসি করলেও বাংলাদেশ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নিজস্ব নদীর পানি সীমান্ত শহরে দেয়ার সিদ্ধান্ত ছিল সমতা ও সহাবস্থানের নীতি কৌশলের বরখেলাপ। এ সবই সেই সনাতন বিভেদ-বিভাজনের ফল- এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না। ভূ-রাজনীতির বিভাজন এখন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নিজস্ব বিভাজন দুরারোগ্য ব্যধির মতো গেড়ে বসেছে। দগদগে ঘা যেমন তেমনি ৫৫ বছর বয়েসি বাংলাদেশ পক্ষের ও বিপক্ষের শক্তির শিরোনামে জাতিকে বিভক্ত করেই রাখতে চেয়েছে। সেই ভিত্তিতে রাষ্ট্র ও সরকারে দ্বিধাবিভক্ত; প্রশাসন, জনসেবা, বিচার বিভাগ সবই হচ্ছিল দ্বিধাবিভক্ত। বাংলাদেশের প্রশাসন দলীয়করণের দ্বারা গ্রেশামসিনড্রমের কবলে পড়েছে বলে প্রয়াত আকবর আলি খান একটা আলাদা বই-ই লিখেছেন। পিএসসিতে সর্বোচ্চ পদে নিয়োগের সুপারিশ পেয়েও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রার্থী নিয়োগই পায়নি অদৃশ্য কারণে। চাকরিতে ওএসডি কালচারের নামে প্রশাসনের মেধাবী ও করিৎকর্মাদের সরিয়ে, হাজার হাজার প্রশিক্ষিত কর্মকর্তাদের বসিয়ে বসিয়ে বেতন দিয়ে আর্থিক সামর্থের ক্ষতি সাধনসহ তাদেরকে অকর্মণ্য করে অপচয় তদস্থলে দলীয় অদক্ষ প্রার্থীদের পদোন্নতি পদায়নে পাঁয়তারায়- তারা নিজেরাই হয়ে ওঠেন সুশাসনের শক্তিশালী প্রতিপক্ষ। কোটা আন্দোলন বৈষম্যবিরোধী অন্দোলনে রূপ নেয়ায় এ বিষয়টি সামনে চলে আসে। এই বিভেদ ও বিভাজনের বীজ বোনা হয় ১৯৪৫ সালে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময় বিভেদ সৃষ্টি হয় রাষ্ট্রের তিন স্তম্ভের মধ্যেও- বিচার বিভাগ, সংসদ বা আইন বিভাগ এবং নির্বাহী বিভাগের জন্য এমনকি চতুর্থ স্তম্ভ মিডিয়াতেও , যে যখন যেভাবে পারে নিজেদের কর্তৃত্ব জাহির করতে চেয়েছে। সুযোগ পেলেই সবাই স্বৈরাচারী হয়ে যায়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণের দ্বারা তারা সহজে সরকারের বশংবদ বাহকে পরিণত হয়- নিজেদের অস্তিত্বের প্রশ্নে ও প্রয়োজনে।
২০২৪ এর ৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত, অন্যের ভেদ-বুদ্ধি, প্ররোচনা ও প্রযোজনায় নিজের নাক কেটে (নিজের ভবিষ্যৎ মানব সম্পদ ও রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি ধ্বংস করে) হলেও বিভেদ-বিভাজন ও বৈষম্যের শিকার জনগণের কণ্ঠরোধ, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও কোণঠাসা এমনকি গুম (আয়নাঘরে আটকে) হত্যার তৎপরতাই ছিল একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার প্রয়াস। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাপনাকে দলীয় রাজনীতিকরণের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাঠঘাট পয়মাল করতেই এই বিভেদ-বিভাজন বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হয় ‘বাংলাদেশের জনগণ’।
অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টির আরেকটি বেড়াজাল সমতা ও সহজাত সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে। ধনী-দরিদ্রের মধ্যে ব্যবধান বেড়েছে। অর্থনৈতিক বৈষম্য সর্বত্র, সিন্ডিকেট এত শক্তিশালী যে তারা রাষ্ট্র ও সরকার সামলানোর ভূমিকায় প্রতীয়মান। রাষ্ট্রাচারে বিধিবিধান অনুসরণ যেহেতু দায়িত্ব ও কর্তব্যের পর্যায়ে পড়ে সেহেতু রাষ্ট্র ও নাগরিক উভয় পক্ষেরই পারস্পরিক সহযোগিতার ব্যাপারটি গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্র ও নাগরিকের পারস্পরিক স্বার্থে বিষয়টি অনেকটা ডিম আগে না মুরগি আগের মতো। রাষ্ট্র নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও সেবার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করবে, না নাগরিক আগে পাথেয় পরিশোধ করলে রাষ্ট্র সুযোগসুবিধা তৈরিতে হাত দেবে? কোনটি আগে? বিভিন্ন ক্ষেত্রেই সৃষ্ট জটিলতা, অসম্পূর্ণতা, অসচ্ছতা পুরো পরিবেশটাকে প্রশ্নবোধক করে তুলতে পারে। এখানেই নির্বাচনব্যবস্থাকে সৎ স্বচ্ছ ও সাবলীল হওয়ার প্রসঙ্গ চলে আসে । রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য গঠিত সরকার নির্বাচিত হবে জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য। উদাহরণস্বরূপ, রাজস্ব আহরণ প্রক্রিয়ায় অনুপ্রেরণা প্রদায়ক সহজ সাবলীল ব্যবস্থা যেমন থাকা দরকার, আবার সে রাজস্ব অসদ্ব্যবহার যাতে না হয়, তা নিশ্চিতকরণার্থে প্রতিবিধানের ব্যবস্থাও থাকা দরকার। করদাতা যাতে হয়রানির শিকার হয়ে নিরুৎসাহিত না হন- এটা দেখাও যেমন জরুরি, তেমন জরুরি কর প্রদান এড়িয়ে চলার বা ফাঁকিজুকি দিয়ে পার পাওয়ার প্রতিরোধাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ আবশ্যক , করের টাকা দুর্নীতি দুর্বৃত্তপরায়ণের দ্বারা লোপাট হতে না দেয়াও গণগুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র্রীয় দায়িত্ব। জবাবদিহিতার পরিবেশে নাগরিকের সকল মৌলিক অধিকার ও দাবি পূরণে রাষ্ট্রের স্বচ্ছতাসুলভ আচরণ ও সুনিশ্চিত সেবা প্রাপ্তি সুনিশ্চিত হলেই বিভেদ-বিভাজন-বৈষম্যের বেড়াজাল থেকে মুক্তি মিলবে।
জাতিকে বিভক্তকরণে দীর্ঘদিনের একদেশদর্শিতা, একক ব্যক্তিবন্দনা, অসংখ্য গোঁয়ার্তুমি, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও ভুল, আত্মশ্লাঘা, অহংবোধ ও অপশক্তির অপব্যবহার ও স্বার্থ হাসিলের জন্য রাজনৈতিক উৎকোচ প্রথার অতি অপব্যবহারের দ্বারা সৃষ্ট নৈরাজ্য দূর করতে বিভেদ-বিভাজন বিভ্রান্তি বিচ্যুতির পরিবর্তে অন্তর্ভুুক্তির চিন্তা ও চেতনায় জাগ্রত হওয়া এবং পারস্পরিক দোষারোপের দ্বারা আমরাই যেন আর আমাদের শত্রু না হই।
বর্তমান হচ্ছে অতীতের আলোকে এ মুহূর্তের অবস্থান, যা ভবিষ্যতের ভিত্তি নির্মাণ করে। বর্তমান মুহূর্তের মধ্যে অতীত হয়ে যায় এবং ভবিষ্যতের পথ নির্মাণ করে। বর্তমানের ভালোমন্দ অতীতের বিচার্য বিষয় হয়ে যায় এবং ভবিষ্যৎ কেমন হবে, তার একটা দিকনির্দেশনা নির্ধারিত হয়ে যায়। বর্তমানকে বাদ দিয়ে তাই অতীত হয় না এবং ভবিষ্যৎ ভাবা যায় না। বর্তমানের প্রতি মনোযোগী না হলে বর্তমানের কর্মকাণ্ড বা ফলাফল ভবিষ্যতের ইতিহাসে অতীতের ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত হবে। আর বর্তমানের অমনোযোগিতার খেসারত দিতে হবে ভবিষ্যতে। সে কারণে সবারই বর্তমানের ব্যাপারে মনোযোগী হওয়ার বিকল্প নেই। তলস্তয় যথার্থই বলেছেন বর্তমানই সেরা সময়।
সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টি বিভেদ-বিভাজনের বেড়াজাল, যা সমতাভিত্তিক সমাজ ও সহজাত সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা। ধনী-দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য ব্যবধান বেড়েছে। অর্থনৈতিক বৈষম্য সর্বত্র, সিন্ডিকেট এত শক্তিশালী যে তারা রাষ্ট্র ও সরকার সামলানোর ভূমিকাতেই হয়েছিল অবতীর্ণ। নতুন বাংলাদেশের সমাজ রাজনীতি অর্থনীতি সবই এখন সবার। দলীয় রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি করে নয়, ছাত্র, শিক্ষক, বার কাউন্সিল, ট্রেড ইউনিয়ন, ব্যবসায়-বাণিজ্য সংগঠন, রাষ্ট্রীয় সংস্থা, পেশাজীবীদের সমিতির রাজনীতি যদি হয় শুধু বাংলাদেশপন্থি, তাহলেই মিলবে প্রকৃত মুক্তি।