নির্বাচন ডাকাতি যেন আর ঘটতে না পারে : প্রধান উপদেষ্টা

Printed Edition
first-2
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশনের সদস্যরা বৈঠক করেন : পিআইডি

বিশেষ সংবাদদাতা

নির্বাচন ডাকাতি যেন আর কখনো না ঘটতে পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস গতকাল সোমবার রাতে প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে জাতীয় নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪) তদন্ত কমিশন। এ সময় প্রধান উপদেষ্টা একথা বলেন।

রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রতিবেদন জমা দেয়ার পর তদন্তের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন কমিশনের সদস্যরা। এতে উপস্থিত ছিলেন কমিশন প্রধান সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইন, কমিশন সদস্য শামীম আল মামুন, কাজী মাহফুজুল হক সুপণ, ব্যারিস্টার তাজরিয়ান আকরাম হোসেন, ড. মো: আব্দুল আলীম। উপদেষ্টাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, তথ্য উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, সংস্কৃতি উপদেষ্টা মুস্তফা সরয়ার ফারুকী।

তদন্ত প্রতিবেদনে কমিশন জানায়, ২০১৪ সালে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং অবশিষ্ট ১৪৭টিতে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতা’র নির্বাচন ছিল সম্পূর্ণ সাজানো ও সুপরিকল্পিত। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে এ বন্দোবস্ত করা হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালের নির্বাচন সারা বিশ্বে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন হিসেবে সমালোচিত হওয়ায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ২০১৮ সালের নির্বাচনকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ করার মিশন গ্রহণ করে। বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দল তাদের এ সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বুঝতে না পেরে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। প্রতিবেদন গ্রহণের পর প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা ভোট ডাকাতির কথা শুনেছিলাম, কিছু কিছু জানতাম। কিন্তু এত নির্লজ্জভাবে পুরো প্রক্রিয়াকে বিকৃত করে সিস্টেমকে দুমড়ে মুচড়ে ফেলে নিজেদের মনের মতো একটা কাগজে রায় লিখে দিয়েছে এগুলো জাতির সামনে তুলে ধরা দরকার। পুরো রেকর্ড থাকা দরকার।’

প্রধান উপদেষ্টা আরো বলেন, ‘দেশের টাকা খরচ করে, মানুষের টাকায় নির্বাচন আয়োজন করে পুরো জাতিকেই শাস্তি দেয়া হয়েছে। এ দেশের মানুষ অসহায়ের মতো তাকিয়ে ছিল। কিছু করতে পারেনি। এ দেশের জনগণ যেন কিছুটা হলেও স্বস্তি পায় সেজন্য যারা যারা জড়িত ছিল তাদের চেহারা সামনে নিয়ে আসতে হবে। কারা করল, কিভাবে করল সেটা জানতে হবে। নির্বাচন ডাকাতি আর কখনো না ঘটতে পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে।’

তদন্ত কমিশনের প্রাক্কলন অনুযায়ী ২০১৮ সালে ৮০% কেন্দ্রে রাতের বেলায় ব্যালট পেপারে সিল মেরে আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত করে রাখা হয়। আওয়ামী লীগকে জেতাতে প্রশাসনের মধ্যে এক ধরনের অসৎ প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। ফলে কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোট প্রদানের হার ১০০% এর বেশি হয়ে যায়। ২০২৪ সালে বিএনপিসহ বিরোধী দল নির্বাচনে অংশ না দেয়ায় ‘ডামি’ প্রার্থী দিয়ে নির্বাচনকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ করার অপকৌশল গ্রহণ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনটি নির্বাচনের অভিনব পরিকল্পনা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হয় এবং বাস্তবায়নে প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করা হয়। কিছু কর্মকর্তার সমন্বয়ে বিশেষ সেল গঠন করা হয়, যা নির্বাচন সেল নামে পরিচিত লাভ করে।

২০১৪-২০২৪ পর্যন্ত সময়কালে নির্বাচন ব্যবস্থাকে নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে মূলত প্রশাসনের হাতে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময়ে কমিশনের পরিবর্তে প্রশাসনই হয়ে ওঠে নির্বাচন পরিচালনার মূলশক্তি। এ ছাড়া প্রতিবেদনে কমিশনের পক্ষ থেকে সুপারিশমালা দেয়া হয়েছে।

জাপানি বিনিয়োগ ও আরো বাংলাদেশী কর্মী নেয়ার আহ্বান

বাসস জানায়, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি আরো বেশি বাংলাদেশী কর্মীকে জাপানে নিয়োগ দেয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশ বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জাপানের সাথে সহযোগিতা আরো বিস্তৃত করতে চায়।

রোববার ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় জাপানের সাবেক ফার্স্ট লেডি আকিয়ে আবে ও জাপানি উদ্যোক্তাদের একটি প্রতিনিধি দল প্রধান উপদেষ্টার সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এলে তিনি এই আহ্বান জানান।

সাক্ষাতে আকিয়ে আবে বাংলাদেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য অধ্যাপক ইউনূসের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বৈঠকে বিনিয়োগ, সামুদ্রিক গবেষণা এবং জাপানে পরিচর্যাকারী ও নার্স নিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। দ্রুত বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে জাপানে এসব পেশায় জনবলের চাহিদা বাড়ছে বলে বৈঠকে উল্লেখ করা হয়।

সামুদ্রিক দূষণ রোধে সহযোগিতার বিষয়ে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেন আকিয়ে আবে। তিনি বলেন, ‘বঙ্গোপসাগরে যেন আবর্জনা না ফেলা হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে আমরা একসাথে কাজ করতে চাই। ভবিষ্যতে এ নিয়ে কিছু করতে পারব বলে আমি আশাবাদী।’ একই সাথে তিনি সমুদ্র দূষণের ক্ষতিকর দিক নিয়ে জনগণকে সচেতন করতে বড় পরিসরে প্রচারণার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন। প্রধান উপদেষ্টা জাপানি প্রতিনিধিদলকে জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব ছাড়ার পর মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে তিনি টোকিও সফরের পরিকল্পনা করছেন। সেখানে তিনি জাপানের খ্যাতনামা সাসাকাওয়া ফাউন্ডেশনের সাথে যৌথ সামুদ্রিক গবেষণা উদ্যোগে অংশ নেবেন। প্রধান উপদেষ্টার আমন্ত্রণে সাসাকাওয়া ফাউন্ডেশন চট্টগ্রাম উপকূলে মহেশখালী-মাতারবাড়ী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সাথে একটি চুক্তি স্বাক্ষরেরও পরিকল্পনা করেছে। এই চুক্তির আওতায় উপকূলীয় এলাকায় তিনটি আদর্শ মৎস্যগ্রাম গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হবে।

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, জাপানে কর্মসংস্থানের জন্য হাজার হাজার নার্স ও কেয়ারগিভারকে প্রশিক্ষণের কার্যক্রম জোরদার করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। পাশাপাশি এ উদ্যোগকে সহায়তা করতে জাপানি ভাষা প্রশিক্ষণ কর্মসূচিও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, আগামী পাঁচ বছরে অন্তত এক লাখ বাংলাদেশী কর্মীকে জাপানে পাঠাতে জাপানি বিনিয়োগকারীদের সাথে ইতোমধ্যে চুক্তি হয়েছে। কর্মী নিয়োগের এই সংখ্যা আরো বাড়াতে আকিয়ে আবে ও জাপানি প্রতিনিধিদলের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

বৈঠকে জাপানের শীর্ষ বায়োফুয়েল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইউগ্লেনার প্রতিষ্ঠাতা মিৎসুরু ইজুমোও সামাজিক ব্যবসাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন উদ্যোগে সহায়তা দেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। নির্বাচন শেষে তিনি তার আগের কাজে ফিরে যাবেন বলেও জানান।

তিনি আবারো স্পষ্ট করেন, ভবিষ্যতে রাজনীতিতে যোগ দেয়া কিংবা কোনো সরকারি বা রাষ্ট্রীয় পদে থাকার কোনো ইচ্ছা তার নেই। বরং মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা এবং ‘থ্রি জিরো’-শূন্য বেকারত্ব, শূন্য নিট কার্বন নিঃসরণ ও শূন্য সম্পদ কেন্দ্রীকরণ-এই ধারণা বাস্তবায়নেই তিনি কাজ করতে চান। বৈঠকে এসডিজি সমন্বয়ক ও জ্যেষ্ঠ সচিব লামিয়া মোরশেদ উপস্থিত ছিলেন।

‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়ে ফটোকার্ড প্রকাশ : গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়ে একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করেছে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং। গতকাল প্রকাশিত ফটোকার্ডটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করা হয়। এতে লেখা রয়েছে- ‘গণভোটের ‘হ্যাঁ’-তে সিল দিন, ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার রাস্তা চিরতরে বন্ধ করুন।’ প্রেস উইং জানিয়েছে, গণভোটের প্রচারণার অংশ হিসেবে ১১ জানুয়ারি থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে মোট আটটি ফটোকার্ড প্রকাশ করা হবে। এ উদ্যোগের লক্ষ্য হলো গণভোটের বিষয়ে জনগণকে সচেতন এবং নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণে উৎসাহিত করা।

গণভোট নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টিতে ব্যাপক কর্মসূচি : এদিকে গণভোট সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টিতে সরকারের পক্ষ থেকে দেশজুড়ে ব্যাপক কর্মসূচির বাস্তবায়ন চলছে। তৃণমূলে গণভোটের বিষয়ে অস্পষ্টতা দূর করার জন্য মাঠ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ এবং বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃস্থানীয় প্রতিনিধিদের প্রশিক্ষিত করা হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে রোববার বরিশালে পৃথকভাবে অনুষ্ঠিত হয় বিভাগীয় কর্মকর্তা সম্মেলন ও ইমাম সম্মেলন। এতে গণভোট বিষয়ে প্রশিক্ষণমূলক বক্তব্য উপস্থাপন করেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টা পদমর্যাদা) অধ্যাপক আলী রীয়াজ এবং অপর বিশেষ সহকারী মনির হায়দার। আগামী কয়েক দিনে অন্য সব বিভাগেও একই ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে।

প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে এসব কর্মসূচিতে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং বেসরকারি সংগঠনের প্রতিনিধিদের প্রশিক্ষণের আয়োজন করছে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় এবং ইমাম ও ধর্মীয় নেতাদের প্রশিক্ষণের আয়োজন করছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন।