জুলাই সনদ ও গণভোটের বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টের রুল
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই জাতীয় সনদ, গণভোটের অধ্যাদেশ এবং নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ এর সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার বৈধতা নিয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। গতকাল মঙ্গলবার বিচারপতি রাজিক-আল-জলিল ও বিচারপতি মো: আনোয়ারুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই আদেশ দেন। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী চৌধুরী মো: রেদোয়ান-ই-খোদা রনি ও অ্যাডভোকেট গাজী মো: মাহবুব আলম জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ও গণভোট অধ্যাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে পৃথক দু’টি রিট আবেদন করলে আদালত এই রুল জারি করেন।
রুলে আদালত জানতে চেয়েছেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংশোধন) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ এবং গত ১৬ ফেব্রুয়ারি সংসদ সচিবালয় থেকে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে যে চিঠি দেয়া হয়েছে, তা কেন অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না। একই সাথে গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ৩ নম্বর তফসিল যার অধীনে রাজনৈতিক দলগুলো ৩০টি বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছিল তা কেন বেআইনি ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, সে বিষয়েও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। আইনসচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জাতীয় সংসদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব, নির্বাচন কমিশন এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে এই রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
আদালতে রিট আবেদনকারীদের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী আহসানুল করিম, সৈয়দ মামুন মাহবুব, জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, গাজী কামরুল ইসলাম সজল ও গাজী তৌহিদুল ইসলাম। শুনানিতে তারা দাবি করেন, বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির আদেশে সংবিধান সংস্কারের কোনো সুযোগ নেই; দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় কেবল সংসদেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব। অন্যদিকে রিটের বিরোধিতা করে জাতীয় নাগরিক পার্টির পক্ষে শুনানি করেন মোহাম্মদ হোসেন লিপু এবং জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে মোহাম্মদ শিশির মনির ও ইমরান সিদ্দিক। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মো: আরশাদুর রউফ ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক। রিটের বিপক্ষের আইনজীবীরা যুক্তি দেন যে, গণভোট অধ্যাদেশ অসাংবিধানিক ঘোষিত হলে সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়েও আইনি প্রশ্ন উঠবে।
দীর্ঘ এক বছরের আলোচনা, সংলাপ ও তর্কবিতর্কের পর রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগগুলো নিয়ে গত বছরের ১৭ অক্টোবর ‘জাতীয় সনদ’ চূড়ান্ত করা হয়। তবে এই সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে শুরু থেকেই তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়। পরবর্তীতে গত বছরের ১৩ নভেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোট আয়োজনের সময় নির্ধারণ করে ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ’ ও ‘গণভোট অধ্যাদেশ’ জারি করা হয়। আদেশে বলা হয়, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সমন্বয়ে একটি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠিত হবে এবং তারা পরিষদের সদস্য হিসেবে পৃথক শপথ নেবেন।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সাথে অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ার পর জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব সংবিধান সংস্কার পরিষদের ওপর বর্তানোর কথা ছিল। তবে নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয় পাওয়া বিএনপির নির্বাচিত সদস্যরা গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নিয়ে কেবল সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলে নতুন জটিলতা তৈরি হয়।
বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ এর কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘আমরা কেউ সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হইনি এবং সংবিধানে এটি এখনও ধারণ করা হয়নি। এ ছাড়া পরিষদের সদস্যকে কে শপথ পড়াবেন, তার কোনো নির্দিষ্ট ফর্ম বা বিধান সংবিধানে নেই।’ বিএনপি শপথ না নিলেও জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ ১১ দলীয় জোট থেকে নির্বাচিতরা প্রথমে দ্বিধাগ্রস্ত থাকলেও পরে উভয় শপথই গ্রহণ করেন এবং বিএনপির এই ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করেন।