নতুন নামে ইউপিডিএফের তৎপরতায় বাড়ছে উদ্বেগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম অশান্ত করতে ফের চক্রান্ত

Printed Edition

এস এম মিন্টু ও আরফাত বিপ্লব

  • বিদেশে থাকা নেতাদের তত্ত্বাবধানে পিসিএসএফের আত্মপ্রকাশ

  • অস্ত্র আসছে ভারতের মিজোরাম থেকে

জাতীয় নির্বাচনের আগে পার্বত্য চট্টগ্রামে ফের অস্থিরতা তৈরি করতে চাইছে ভারতের মদদপুষ্ট সশস্ত্র সংগঠন ইউপিডিএফ। সম্প্রতি বাঙালি-পাহাড়িদের মধ্যে পরিকল্পিত দাঙ্গায় তাদের বিরুদ্ধে সারা দেশে সমালোচনার পর নতুন মুখোশ ও নতুন পরিচয়ে মাঠে নামছে তারা। ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম সংহতি ফ্রন্ট (পিসিএসএফ)’ নামে নতুন এই সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটানো হয়েছে, যা ইউপিডিএফের পুরনো তৎপরতারই অংশ বলে নিশ্চিত করেছে দেশের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। এই সংগঠনের নেতারা বিদেশে বসে নিয়ন্ত্রণ করলেও গোয়েন্দা তথ্য ও স্থানীয় সূত্র বলছে পুরনো কার্যক্রম অব্যাহত এবং চাঁদাবাজি করতেই নতুন নামে তারা সংগঠন করেছে।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ইউপিডিএফের প্রধান মাইকেল চাকমাকে আদালত আট বছরের সাজা দেন। এর পর থেকেই প্রকাশ্যে না এলেও মাইকেল চাকমা পাহাড়কে অশান্ত করতে গোপনে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। অভিযোগ উঠেছে, পিসিএসএফের সদস্যরাই মূলত ইউপিডিএফের। নতুন নামে তারা ভারতের মিজোরাম থেকে গোপনে অস্ত্রের মজুদ বাড়াচ্ছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সঙ্ঘাত-সহিংসতার পর পাহাড়কে অশান্ত করার পরিকল্পনা করছে এই সংগঠনটি।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, যতবারই ইউপিডিএফ চাপের মুখে পড়ে, ততবারই তারা নতুন নামে আরেকটি সংগঠন দাঁড় করায়। তাদের উদ্দেশ্য পরিষ্কার, মূল কাঠামোকে আড়াল করা, দায় অন্য ব্যানারের ওপর চাপানো এবং আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে ভুল পথে চালিত করা। ঠিক সেই একই বৃত্তে এবার দেখা দিয়েছে ‘পিসিএসএফ’ নামের নতুন একটি প্ল্যাটফর্ম। গত ২ ডিসেম্বর হঠাৎ প্রকাশিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই ফ্রন্টের আত্মপ্রকাশ ঘোষণা করা হয়। সংগঠনটির নেতৃত্বে রয়েছেন বিদেশে অবস্থানরত পাহাড়ি নেতাদের একটি অংশ। তাদের মধ্যে সুইজারল্যান্ডে সঞ্চয় চাকমা, কানাডায় প্রজ্ঞা তাপস চাকমা, যুক্তরাষ্ট্রে প্যারিস চাকমা এবং দিল্লিতে অবস্থানরত ইউপিডিএফের সাবেক নেতা সুহাস মিত্র চাকমা রয়েছেন। যদিও তারা নিজেদেরকে ‘নিরপেক্ষ’ ও ‘সঙ্ঘাত বৈষম্যবিরোধী’ ছাত্র আন্দোলনের অংশ বলে দাবি করেছেন। তবে পেছনে ইউপিডিএফের পরোক্ষ সমর্থন রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে গোয়েন্দারা।

একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা বলছে, এটি নতুন কোনো প্ল্যাটফর্ম নয়-পুরনো সংগঠনের নতুন পর্দা। খাগড়াছড়ি জেলার পুলিশ সুপার মির্জা সায়েম মাহমুদ, রাঙ্গামাটির পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব এবং বান্দরবানের পুলিশ সুপার আব্দুর রহমান জানিয়েছেন, নতুন সংগঠনগুলোকে ঘিরে তারা সতর্ক অবস্থানে আছেন। পাহাড়জুড়ে যেসব ছোট সংগঠন হঠাৎ সক্রিয় হয়ে উঠেছে, সেসবের গতিবিধি তারা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। কর্মকর্তাদের ভাষায়, নাম যা-ই হোক, যাদের মাঠের কর্মীরা অভিন্ন তাদের তৎপরতায় আমরা ছাড় দিচ্ছি না। পরিস্থিতি ঘোলাটে হওয়ার আগেই সবধরনের নড়াচড়া নজরে রাখা হচ্ছে।

পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, তিন পার্বত্য অঞ্চলে যেসব উন্নয়নমূলক বা সামাজিক সংগঠন হঠাৎ জন্ম নিচ্ছে সেগুলোর কর্মকাণ্ডও সন্দেহজনক। বাজার থেকে পরিবহন, পাথর-বালু ব্যবসা থেকে ছোট নির্মাণকাজ-সব জায়গায়ই হঠাৎ করে নতুন মুখের চাঁদা সংগ্রহকারীদের দেখা যাচ্ছে। গ্রামভিত্তিক কমান্ডার নিয়োগ আবার শুরু হয়েছে। রাতের পাহারা, পথচলতি তরুণদের জেরা, বাজারে কে কার সাথে কথা বলছে-এসব খুঁটিনাটি নিয়েও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। খাগড়াছড়ির স্থানীয় এক চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নামটা বদলায়; কিন্তু মাঠে যাদের দেখা যায় তারা আগের মানুষই। শুধু এবার তারা অন্য রঙের ব্যানার হাতে ঘুরছে।

দাঙ্গাকে হাতিয়ার করে নতুন ব্যানার : সম্প্রতি বাঙালি-পাহাড়ি দাঙ্গার ঘটনার পর হঠাৎ করেই পিসিএসএফের ঘোষণায় গোয়েন্দারা আরো নিশ্চিত হয় যে ঘটনা পরিকল্পিতই ছিল। দাঙ্গার সূত্রপাত যেখানে হয়েছিল, ঠিক সেই এলাকাগুলোতেই কয়েকটি ‘নতুন সংগঠনের’ পোস্টার, লিফলেট ও মাইকিং দেখা গেছে। মাঠপর্যায়ে যারা নড়াচড়া করছিল, তাদের অনেকেই আগে ইউপিডিএফ সমর্থক হিসেবে পরিচিত।

একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, এটি একধরনের ‘পোস্ট-দাঙ্গা কাউন্টার স্ট্র্যাটেজি’। যাতে মনে হয় নতুন একটি আন্দোলন গড়ে উঠছে। আসলে মূল নিয়ন্ত্রণটা আগের হাতেই। পিসিএসএফের নেতৃত্বে থাকা চারজনই বিদেশে অবস্থান করেন। এতে নজরদারি কঠিন হয়ে যায়। তারা অনলাইনে সংস্কৃতি পুনরুদ্ধার, অধিকার আন্দোলন, অসমাধানজনিত ক্ষোভ- এমন শব্দ দিয়ে প্রচারণা চালালেও মাঠপর্যায়ে এগুলোকে পুঁজি করছে পুরনো ইউপিডিএফ কাঠামো।

স্থানীয় একটি সূত্র বলছে, পাহাড়ে এখন যে তৎপরতা বাড়ছে, তা একা কোনো নতুন সংগঠনের পক্ষে সম্ভব নয়। এর পেছনে পুরনো নেটওয়ার্ক ছাড়া কিছু নেই।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক এম শাহীদুজ্জামান বলেন, পরিস্থিতি ঘোলাটে হওয়ার আগে পদক্ষেপ জরুরি। পাহাড়ে যেসব নতুন ব্যানার দেখা যাচ্ছে, এগুলো শুধু নাম পরিবর্তনের খেলা নয়, এগুলো সমন্বিত পুনর্গঠনের ইঙ্গিত। তিনি সতর্ক করে বলেন, সরকার ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর এখন দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। দেরি হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে এবং ২০১৫ সালের মতো অস্থিরতা ফের ফিরে আসার ঝুঁকি রয়েছে। এ ছাড়া সাবেক এক প্রশাসনিক কর্মকর্তা কঠোর সতর্ক বার্তা দিয়ে বলেন, সরকার যদি এখনই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনে, আবারো ২০১০-১৫ সালের মতো সশস্ত্র উত্তেজনা তৈরি হতে পারে। বর্তমানে প্রশাসন দুর্বল, রাজনৈতিক নেতৃত্ব অনিশ্চিত-এই সুযোগটাই নিয়েছে ইউপিডিএফ। এটি আদর্শিক কোনো সংগঠন নয়-এটি প্রকৃতপক্ষে অর্থনৈতিক ও অস্ত্রভিত্তিক নিয়ন্ত্রণের দল।