সিপিডির আলোচনায় অভিমত

রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে রাখতে হবে এনবিআরকে

Printed Edition
Back------------3
বাজেটে রাজস্ব প্রস্তাবনা বিষয়ে সিপিডির আলোচনা অনুষ্ঠানে অতিথিরা : নয়া দিগন্ত

বিশেষ সংবাদদাতা

কর ফাঁকি রোধ এবং কর পরিহার বন্ধ করতে এনবিআর ও এর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ডিজিটাইজ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি করব্যবস্থাকে আইনসম্মত করতে হবে। এ ছাড়া আইনি সুরক্ষার মাধ্যমে নবগঠিত দু’টি বিভাগকে (রাজস্ব নীতি বিভাগ এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ) রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের নাগালের বাইরে রাখা নিশ্চিত করতে হবে।

রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে গতকাল বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) আয়োজিত জাতীয় বাজেটে ‘কর ন্যায়বিচার : ২০২৬-২৭ অর্থবছরের রাজস্ব প্রস্তাবনাবিষয়ক পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক আলোচনায় এমন অভিমত জানানো হয়। সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের সভাপতিত্বে ও সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট এম তামিম আহমেদ।

অনুষ্ঠানে সিপিডি কর প্রস্তাবনা নিয়ে বলেছে, বিশেষায়িত নিরীক্ষা ও তথ্য বিশ্লেষণ পেশাদারদের আকৃষ্ট করতে এনবিআরের নিয়োগ নীতি সংস্কার করা দরকার। নাগরিক সন্তুষ্টি বজায় রাখতে অংশগ্রহণমূলক বাজেট ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। আর ব্যবসায়ীরা বলেন, জাতীয় বাজেটে কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ ব্যবসায়ীদের চাহিদা নয়। বরং রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক চাপের ফল।

বাংলাদেশে কর জিডিপি এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন : প্রবন্ধ উপস্থাপনায় সিপিডির তামিম আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়াসহ সমগ্র এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। যা ক্রমবর্ধমান আর্থিক অব্যবস্থাকে প্রতিফলিত করে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে কর ফাঁকি ও কর এড়ানোর কারণে প্রায় ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারিয়েছে সরকার। একই সাথে সম্ভাব্য ভ্যাট আয়ের মাত্র ২৮ থেকে ২৯ শতাংশ সংগ্রহ করতে সক্ষম হচ্ছে এনবিআর। বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই সঙ্কট আরো তীব্র হয়েছে। সরকার মধ্যমেয়াদে এই অনুপাত ১০ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া একটি সংকীর্ণ, রাজস্বকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বৈষম্যকে আরো গভীর করার এবং আর্থসামাজিক অগ্রগতিকে ব্যাহত করার ঝুঁকি তৈরি করে। একটি কর-ন্যায়বিচারভিত্তিক কাঠামোর দিকে মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন।

সিপিডি বলছে, কর ন্যায়বিচারের দৃষ্টিকোণ থেকে জাতীয় বাজেটে প্রস্তাবিত কর ব্যবস্থাগুলোর আনুষ্ঠানিক মূল্যায়নে একটি উল্লেখযোগ্য ও দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতি রয়েছে। একটি পূর্ণাঙ্গ কর ন্যায়বিচার বিশ্লেষণে খতিয়ে দেখা হবে কর ব্যবস্থাটি প্রগতিশীলভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না, কর ফাঁকি ও পরিহারের কারণে রাজস্ব ক্ষতির বিশ্লেষণ করা হবে। প্রতিকারমূলক ব্যবস্থার পর্যাপ্ততা মূল্যায়ন করা হবে এবং সংগৃহীত রাজস্ব দুর্বল জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দিয়ে বণ্টন করা হচ্ছে কি না তা যাচাই করা হবে।

বলা হয়েছে, বাজেট ও রাজস্ব কাঠামোতে কর ন্যায়বিচারকে অন্তর্ভুক্ত করা ন্যায্যতা ও সমতাকে উৎসাহিত করে, বৈষম্য হ্রাস করে, টেকসই অভ্যন্তরীণ সম্পদকে কাজে লাগায়, জনআস্থা জোরদার করে এবং কর পরিপালন উন্নত করে। যদিও বেশ কয়েকটি দেশ ন্যায্যতা, সমতা এবং কর পরিপালন বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। এখানে সুইডেন, ডেনমার্ক, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্স, কানাডা এবং নিউজিল্যান্ডসহ বেশ কয়েকটি দেশ প্রগতিশীল করব্যবস্থা, ন্যায়সঙ্গত সরকারি ব্যয় এবং বৈষম্য হ্রাস ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ শক্তিশালীকরণের লক্ষ্যে গৃহীত পদক্ষেপের মাধ্যমে তাদের রাজস্ব কাঠামোতে কর ন্যায়বিচারের নীতিগুলোকে একীভূত করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে।

এ ক্ষেত্রে সিপিডির সুপারিশ তুলে ধরে তামিম আহমেদ বলেন, ব্যক্তিগত আয়করের আওতা সম্প্রসারণ, উচ্চ-আয়কারীদের কর পরিপালন উন্নতকরণ এবং পরোক্ষ করের ওপর অত্যধিক নির্ভরতা হ্রাসের মাধ্যমে প্রগতিশীল প্রত্যক্ষ কর ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা। ঋণ ও বিনিয়োগ বিষয়ক এমন একটি সুস্পষ্ট কৌশল প্রণয়ন করা, যা সরকারি ঋণের কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ সঙ্কুচিত হওয়ার প্রভাব কমিয়ে আনে এবং বেসরকারি খাতে অধিক বিনিয়োগকে উৎসাহিত করে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের জন্য একটি সামগ্রিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা, যেখানে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বৃদ্ধির সাথে সামাজিক সুরক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির সম্প্রসারণের সমন্বয় ঘটানো হবে, যাতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক উত্তরণ নিশ্চিত করা যায়। বিধিবদ্ধ করপোরেট আয়করের হারকে পর্যায়ক্রমে ওইসিডি/এ২০-এর নির্ধারিত ১৫ শতাংশ বৈশ্বিক ন্যূনতম করসীমার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা এবং নিশ্চিত করা যেন রফতানিমুখী বা অরফতানিমুখী কোনো খাতেই করের হার এই সীমার নিচে না নামে। বিশেষায়িত নিরীক্ষা ও তথ্য বিশ্লেষণ পেশাদারদের আকৃষ্ট করতে এনবিআরের নিয়োগ নীতি সংস্কার করা দরকার।

কালো টাকা সাদার সুযোগ রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক চাপের ফল : আলোচনায় অংশ নিয়ে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রহমান বলেন, জাতীয় বাজেটে কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ ব্যবসায়ীদের চাহিদা নয়। বরং রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক চাপের ফল। তিনি বলেন, যে ব্যবসায়ী কর দিতে চান না, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ থাকুক বা না থাকুক তিনি কর দেবেন না। এনবিআর ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে যে বিভাজন রয়েছে, তা দূর করতে হবে। এনবিআরের নীতি বিভাগ (পলিসি উইং) ব্যবসায়ীদের সাথে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন করে। কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা প্রশাসনিক বিভাগ বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। তিনি বলেন, একসাথে সবাইকে খুশি করা সম্ভব নয়। কাউকে রাজনৈতিকভাবে, কাউকে অর্থনৈতিকভাবে সন্তুষ্ট করতে হয়। বিভিন্ন দিক থেকে নানা ধরনের চাপ আসে। আবাসন খাতে নতুন কর আরোপের সমালোচনা করে রিজওয়ান রহমান বলেন, এর ফলে ফ্ল্যাট ও বাড়ির দাম আরো বাড়বে। ইতোমধ্যে বিশ্বের অনেক প্রথম সারির শহরের তুলনায় বাংলাদেশে আবাসন কেনা ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। করের বোঝা আরো বাড়ানো হলে অনেকে দেশে বিনিয়োগ না করে বিদেশে সম্পদ কেনার দিকে ঝুঁকতে পারেন।

করব্যবস্থা ন্যায়সঙ্গত করতে সংলাপ দরকার : জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ বলেন, কর ন্যায্যতা শুধু বাজেট ঘোষণার সময় আলোচনার বিষয় হতে পারে না। বাজেট প্রণয়নের আগে ও পরে অংশীজনদের মতামত বিবেচনায় নেয়ার ধারাবাহিক প্রক্রিয়া থাকতে হবে। তিনি বলেন, করব্যবস্থা ন্যায়সঙ্গত করতে হলে ব্যবসায়ী, করদাতা, গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের সাথে নিয়মিত সংলাপ চালিয়ে যেতে হবে।

ন্যায়সঙ্গত করব্যবস্থা ছাড়া টেকসই রাজস্ব আহরণ অসম্ভব : এনবিআরের সদস্য (কর নীতি) ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী বলেন, ন্যায়সঙ্গত করব্যবস্থা ছাড়া টেকসই রাজস্ব আহরণ সম্ভব নয়। পর্যাপ্ত রাজস্ব সংগ্রহ করতে না পারলে রাষ্ট্রের পক্ষে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং প্রয়োজনীয় জনসেবা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, কর ন্যায্যতা ও রাজস্ব আহরণ একে অপরের পরিপূরক। জনগণের আস্থা অর্জন করে কর আদায় বাড়াতে হলে করব্যবস্থা আরো স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক করতে হবে।

কিছু নতুন করব্যবস্থা শিল্প খাতের জন্য উদ্বেগের : বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়ীরা যেসব দাবি জানিয়ে আসছিলেন, বাজেটে তার কিছু প্রতিফলন দেখা গেছে।