বিষবৃক্ষ তামাক চাষে ছয় বছরের রেকর্ড ভাঙল লালমনিরহাট

জমির উর্বরতা ও জনস্বাস্থ্যে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

Printed Edition
bangla-2
ক্ষেতে তামাকচারা পরিচর্যা করছেন দুই চাষি : নয়া দিগন্ত

আসাদুল ইসলাম সবুজ লালমনিরহাট

বিষবৃক্ষখ্যাত তামাক চাষে বিগত ছয় বছরের রেকর্ড ভেঙেছে লালমনিরহাট জেলা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জেলায় তামাক চাষের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণে পৌঁছেছে। জমির উর্বরতা, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কথা জেনেও থামছে না তামাক চাষের আগ্রাসন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, লালমনিরহাট কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ২০২০-২১ অর্থবছরে সাত হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়। ২০২১-২২ অর্থবছরে সাত হাজার ৫৫০ হেক্টর, ২০২২-২৩ অর্থবছরে সাত হাজার ৪৪০ হেক্টর, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯ হাজার ৮৬৫ হেক্টর এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৫ হাজার ৫৭ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়েছে। তবে চলতি মৌসুমে অর্থাৎ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে প্রায় ২৫ হাজার হেক্টরে পৌঁছেছে, যা গত ছয় বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

উত্তরের সীমান্তবর্তী এই জেলায় প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ কৃষিনির্ভর। এক সময় এখানে ধান, গম, সরিষা, ভুট্টা, আলু, আখ ও বিভিন্ন শাকসবজির চাষ করা হতো। কিন্তু বিগত কয়েক বছর সবজি চাষে টানা লোকসান এবং সরকারি কৃষি সহায়তার অভাবে কৃষকরা বিকল্প ফসল হিসেবে তামাক চাষে ঝুঁকছেন। ফলে জেলা সদর থেকে তিস্তা নদীর অববাহিকাজুড়ে বুড়িমারী স্থলবন্দর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় তামাক চাষ ছড়িয়ে পড়ছে।

কৃষকদের অভিযোগ, এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তামাক কোম্পানিগুলো আক্রমণাত্মকভাবে তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। বিনামূল্যে বীজ, সহজ শর্তে ঋণ, সার ও কীটনাশক সরবরাহের পাশাপাশি নগদ সহায়তা ও দাম বৃদ্ধির লোভনীয় প্রস্তাব দিয়ে কৃষকদের তামাক চাষে উৎসাহিত করছে। ফলে মা, শিশু ও বৃদ্ধসহ পুরো কৃষি পরিবার এখন তামাক ক্ষেতে কাজ করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করবে বলে জানান স্বাস্থ্য সচেতনমহল।

আদিতমারী উপজেলার সাপ্টিবাড়ী ইউনিয়নের বিরানী এলাকার তামাক চাষি মজিবর রহমান (৫৫) বলেন, ‘আলু বা সবজি চাষে বড় অঙ্কের খরচ লাগে, যা আমাদের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। তামাক কোম্পানি বিনামূল্যে বীজ ও ঋণ দেয় বলেই তিন বিঘা জমিতে তামাক করেছি। আশা করছি, ঋণ পরিশোধের পরও বেশ কিছু লাভ থাকবে।’

একই উপজেলার সাপ্টিবাড়ী ও সারপুকুর এলাকায় তামাক চাষ সবচেয়ে বেশি। সেখানকার চাষি আবদুল মজিদ জানান, ‘এলাকায় একাধিক তামাক কোম্পানির কার্যালয় রয়েছে। সব ধরনের সহায়তা পাওয়ায় প্রতিবছর তামাক চাষ করছি। গত বছর প্রায় তিন বিঘা জমিতে তাকাম চাষ করলেও এবার ছয় বিঘা জমিতে তামাক করেছি।’

লালমনিরহাটের সিভিল সার্জন আব্দুল হাকিম বলেন, ‘তামাক চাষ ও তামাকজাত দ্রব্য সেবন মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। বিড়ি, সিগারেট, জর্দা ও খৈনির কারণে শ্বাসকষ্ট, স্ট্রোক, ক্যানসারসহ সমাজে নানা জটিল রোগের আক্রমণ হচ্ছে। তামাক চাষের ফলে কৃষক পরিবারসহ সাধারণ মানুষও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে।’

এ বিষয়ে লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক ড. মো: সাইখুল আরিফিন বলেন, ‘তামাক কোম্পানিগুলো যাতে সরাসরি কৃষকদের প্রভাবিত করতে না পারে, সে বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় কঠোর ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। তামাক চাষে ব্যবহৃত অতিরিক্ত রাসায়নিক সার মাটি, পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। আমরা সভা-সেমিনার ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করছি, তবে অধিক মুনাফার আশায় তারা তামাকের দিকেই ঝুঁকছেন।’

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, তামাক চাষের এই লাগামহীন বিস্তার অব্যাহত থাকলে জেলার খাদ্যনিরাপত্তা, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য মারাত্মক সঙ্কটে পড়বে।