দুই যুগ ধরে ১০ হাজার তালগাছ লাগিয়েছেন আবুল কালাম

Printed Edition

নুরুল ইসলাম রইসী সিরাজগঞ্জ

নিজ নানার বাড়ির উঠোনে দণ্ডায়মান একটি তালগাছের কারণেই একদিন প্রাণে রক্ষা পেয়েছিলেন আবুল কালাম আজাদসহ পুরো নানাবাড়ির লোকজন। ২০০০ সালের সেই দিনে হঠাৎ বজ্রপাত হলে তালগাছটি বজ্রের আঘাত নিজের শরীরে ধারণ করে নেয়। মানুষ বেঁচে গেলেও সপ্তাহখানেকের মধ্যে তালগাছটি মারা যায়। সেই ঘটনা আজও আবুল কালামের স্মৃতিতে গভীরভাবে দাগ কেটে আছে। পরে পরিবেশ ও বজ্রপাত বিষয়ে পত্রিকায় প্রকাশিত একটি জার্নাল পড়তে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেন, তালগাছ প্রকৃতির নীরব রক্ষাকবচ। সেদিন যেন নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে গাছটি সবাইকে রক্ষা করেছিল।

এই অভিজ্ঞতাই বদলে দেয় তার জীবনের গতিপথ। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা এবং মানুষ ও গবাদিপশুকে বজ্রপাতের ঝুঁকি থেকে নিরাপদ রাখার প্রত্যয় নিয়ে ২০০০ সালের পর থেকেই সিরাজগঞ্জ শহর ও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় তালগাছ রোপণ শুরু করেন আবুল কালাম আজাদ। শহরের প্রধান সড়কের দু’পাশ, বাড়ির আঙিনা, স্কুল-কলেজ প্রাঙ্গণ, খেলার মাঠ, ক্ষেতের আইলে গাছা লাগান তিনি।

পেশায় দর্জি হলেও কাজের ফাঁকে ফাঁকে তিনি নেমে পড়েন গাছের পরিচর্যায়। কখনো ভোরবেলা, কখনো বিকেলে, আবার কখনো সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কোদাল, কাঁচি আর তালচারা কাঁধে নিয়ে ছুটে যান নতুন জায়গার সন্ধানে। এ পর্যন্ত তিনি প্রায় ১০ হাজারের বেশি তালগাছ লাগিয়েছেন বলে জানান স্থানীয়রা।

বজ্রপাত থেকে প্রাণিকুলকে রক্ষায় তালগাছ যে কতটা কার্যকর, তা এখন বিজ্ঞানীরাও বলছেন। তালগাছ প্রাকৃতিকভাবে বজ্রের বিদ্যুৎ শোষণে ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া এই গাছে বাবুই পাখিরা বাসা বাঁধে, যা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক। তালের রস ও গুড় দিয়ে তৈরি পিঠাপায়েস যেমন উপাদেয়, তেমনি গ্রীষ্মের দাবদাহে তালের শাঁস পিপাসা মেটায় ফলে দেশে তালগাছ রোপণের চাহিদা বাড়ছে।

সয়াধানগড়া এলাকার বাসিন্দা ইব্রাহিম হোসেন জানান, সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজ, মনসুর আলী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল এলাকা, ওয়াপদা বাঁধ, কাটাখালির দু’পাশ, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাটবাজার এলাকায় আবুল কালামের হাতে লাগানো হাজার হাজার তালগাছ আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। অনেক গাছে ইতোমধ্যে ফল ধরাও শুরু হয়েছে। তালবীজ সংগ্রহের বিষয়ে আবুল কালাম আজাদ বলেন, তাল ব্যবসায়ী ও বাড়িঘর থেকে তিনি বীজ সংগ্রহ করেন। অনেকেই জানেন তিনি তালগাছ লাগান, তাই স্বেচ্ছায় তার দোকান বা বাসায় বীজ রেখে যান। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি এই কাজ করে যাচ্ছেন। তার ভাষায়, এটি সাদকায়ে জারিয়া; ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কিছু রেখে যাওয়ার আনন্দই তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

শহরের ২ নং খলিফা পট্টির বাসিন্দা নাজমা রুমা বলেন, কালাম ভাইয়ের উৎসাহে অনেকেই এখন তালের আঁটি সংরক্ষণ করে তার হাতে তুলে দিচ্ছেন রোপণের জন্য। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের গানের মতো; সব কিছু বাঁচানো না গেলেও, আবুল কালাম আজাদ তার সাধ্যের মধ্যে সমাজ আর প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন নিঃশব্দে।