ইন্টারনেটে সৌন্দর্যের বিষাক্ত নেশা ক্ল্যাভিকুলার ও লুকসম্যাক্সিং

Printed Edition
bino-1

সাকিবুল হাসান

বর্তমান ডিজিটাল বিশ্বে শারীরিক সৌন্দর্য বা ‘লুকস’ যখন চূড়ান্ত সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, তখন ‘ক্ল্যাভিকুলার’ নামক এক নতুন অনলাইন উন্মাদনা বিশ্বজুড়ে তরুণ প্রজন্মের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০ বছর বয়সী ব্র্যাডন পিটার্স, যিনি ইন্টারনেটে ‘ক্ল্যাভিকুলার’ নামে পরিচিত, বর্তমানে ২০২৬ সালের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত ‘লুকসম্যাক্স’ ইনফ্লুয়েন্সার। টিকটক এবং কিক-এর মতো প্ল্যাটফর্মে প্রায় ১০ লক্ষাধিক অনুসারী নিয়ে তিনি এমন এক বিপজ্জনক জীবনধারা প্রচার করছেন, যা আধুনিক সমাজ ও সংস্কৃতির গভীর ক্ষতগুলোকে প্রকট করে তুলছে।

মূলত ‘লুকসম্যাক্সিং’ শব্দটির উৎপত্তি ২০১০-এর দশকের ইনসেল বা অনিচ্ছাকৃত কৌমার্য পালনকারী অনলাইন গোষ্ঠীগুলোর মধ্য থেকে। একসময় ইন্টারনেটের অন্ধকার কোণে সীমাবদ্ধ থাকা এই উগ্র সৌন্দর্যতত্ত্ব আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমের কল্যাণে মূলধারার কিশোর ও তরুণদের মগজধোলাই করছে। ক্ল্যাভিকুলারের আদর্শ অনুযায়ী, পুরুষের সাফল্য নির্ধারিত হয় তার হাড়ের গঠন, চোখের আকৃতি এবং চোয়ালের তীক্ষèতার ওপর ভিত্তি করে। এই তথাকথিত ‘নিখুঁত’ রূপ পাওয়ার জন্য তিনি যে চরমপন্থার আশ্রয় নিয়েছেন, তা রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতো। তিনি প্রকাশ্যেই ‘বোনস্ম্যাশিং’ বা হাতুড়ি দিয়ে নিজের মুখের হাড় পিটিয়ে আকৃতি পরিবর্তনের মতো আত্মঘাতী পদ্ধতির কথা প্রচার করেন। এমনকি শরীরের মেদ কমিয়ে ‘হলো চিকস’ বা ভাঙা গাল পাওয়ার নেশায় তিনি ক্রিস্টাল মেথের মতো মরণঘাতী মাদক ব্যবহারের কথাও অকপটে স্বীকার করেছেন।

এই লুকসম্যাক্সিং সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত রয়েছে এক গভীর বর্ণবাদী এবং শ্রেষ্ঠত্ববাদী আদর্শ। ক্ল্যাভিকুলার ও তার অনুসারীরা শ্বেতাঙ্গ শারীরিক বৈশিষ্ট্যকে সৌন্দর্যের একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে উপস্থাপন করেন, যা হিটলারের ‘উবারমেনশ’ বা অতিমানব তত্ত্বের একটি আধুনিক ও ডিজিটাল সংস্করণ হিসেবে প্রতীয়মান হয়। তাদের ভাষায়, যারা এই নির্দিষ্ট ছাঁচে ফিট করে না, তারা ‘সাব-হিউম্যান’ বা উপ-মানব। এমনকি রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদেরও তারা তাদের হাড়ের গঠন বা ‘ফেসিয়াল রেশিও’ দিয়ে বিচার করেন। ক্ল্যাভিকুলার যখন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে তার শারীরিক গঠনের জন্য তুচ্ছজ্ঞান করেন এবং ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউজমকে একজন ‘চ্যাড’ বা আদর্শ পুরুষ হিসেবে অভিহিত করেন, তখন তা কেবল ব্যক্তিগত পছন্দ থাকে না, বরং এক বিষাক্ত সামাজিক বিভাজনকে উসকে দেয়। এই প্রক্রিয়ায় প্রেম বা সম্পর্ককেও দেখা হয় একটি পুঁজিবাদী ‘সেক্সুয়াল মার্কেট প্লেস’ হিসেবে, যেখানে মানুষের মানবিক গুণাবলীর চেয়ে তার বাহ্যিক আকর্ষণই প্রধান।

ক্ল্যাভিকুলারের এই উল্কাসম উত্থান কেবল তার রূপচর্চার জন্য নয়, বরং তার পরিকল্পিত ‘কন্টেন্টম্যাক্সিং’ বা ভাইরালিটির নেশার ফল। তিনি অত্যন্ত সুকৌশলে ‘ক্লিপ ফার্মিং’ করেন অর্থাৎ লাইভ স্ট্রিমে এমন কিছু চরম আপত্তিকর বা উগ্র কাজ করেন, যা মুহূর্তেই ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে। টেসলা সাইবারট্রাক দিয়ে দুর্ঘটনার মহড়া দেওয়া কিংবা উগ্র জাতীয়তাবাদী সঙ্গীতের তালে পার্টি করা সবই তার ডিজিটাল প্রচারণার অংশ। কিউরেটেড পারফেকশনের এই যুগে ক্ল্যাভিকুলার এমন এক প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করছেন, যারা আয়না এবং ক্যামেরার সামনে নিজের অস্তিত্ব বিলীন করে দিচ্ছে। এটি কেবল একটি ফ্যাশন বা ট্রেন্ড নয়, বরং এটি একটি গভীর মানসিক সঙ্কট ও বিষাক্ত পুরুষত্বের বহিঃপ্রকাশ। সৌন্দর্যের এই অন্তহীন এবং অবাস্তব দৌড় তরুণদের মধ্যে হীনম্মন্যতা, বডি ডিসমোরফিয়া এবং আত্মঘাতী প্রবণতা বাড়িয়ে তুলছে। ক্ল্যাভিকুলার ও তার প্রচার করা এই ‘লুকসম্যাক্সিং’ সংস্কৃতি শেষ পর্যন্ত সমাজকে কোন পরিণতির দিকে নিয়ে যাবে, তা নিয়ে বর্তমানে সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিদদের মধ্যে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।