১৬ বছরের দলীয় প্রশাসন দিয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়
‘আগামী জাতীয় নির্বাচন ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণœ রাখা, টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ- এমন অভিমত ব্যক্ত করেছেন বিশিষ্টজনেরা। তারা বলেন- অবাধ, স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্র, সুশাসন ও উন্নয়নের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। একই সাথে আধিপত্যবাদবিরোধী একটি দেশপ্রেমিক গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের জন্যও এই নির্বাচন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
সভায় বলা হয় যে, সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে সিভিল-মিলিটারি প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গত ১৬ বছরে দলীয় প্রশাসন গড়ে তোলা হয়েছে, যা দিয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়।
গতকাল শনিবার সকাল ১০টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে ইলেকশন ওয়ার্কিং অ্যালায়েন্স ও ফেয়ার ইলেকশন অ্যাডভাইজরি কমিটির যৌথ উদ্যোগে ‘আগামী জাতীয় নির্বাচন ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন বক্তারা।
গোলটেবিল আলোচনায় সাবেক সচিব ও ইলেকশন ওয়ার্কিং অ্যালায়েন্সের চেয়ারপারসন প্রফেসর ড. মো: শরিফুল আলমের সভাপতিত্বে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. এ কে এম ওয়ারেসুল করিম। সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান। প্যানেল আলোচক হিসেবে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর ড. দিলারা চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ডাকসু নির্বাচন-২০২৫ এর চিফ রিটার্নিং অফিসার প্রফেসর ড. মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন, চাকসুর সাবেক ভিপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট জসীম উদ্দিন, খেলাফত মজলিসের সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক কাজী মিনহাজুল আলম, সরকারের সাবেক সিনিয়র সচিব ড. খ ম কবিরুল ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক আশরাফ আলী আকন, সাবেক সচিব ও রাষ্ট্রদূত মো: আবদুল মোতালেব সরকার, এবি পার্টির যুগ্মসাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসরীন সুলতানা মিলি, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মো: শহিদুল ইসলাম, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ড. গোলাম রহমান ভূঞা, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক প্রকৌশলী মারদিয়া মমতাজ, রিসডা-বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. মো: হেমায়েত হোসেন, আপ বাংলাদেশের প্রধান সংগঠক নাঈম আহমাদ প্রমুখ।
ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, ২০০১ সালের পর দেশে আর কোনো ভালো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। ২০০৮ সালের ফখরুদ্দিন সরকারের সময় থেকেই বাংলাদেশে ভারতের রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্প্রসারণ সুদৃঢ় করা হয়েছে। তিনি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে সিভিল-মিলিটারি প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গত ১৬ বছরে দলীয় প্রশাসন গড়ে তোলা হয়েছে, যা দিয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, গত দেড় বছরে সরকার চাইলে ১০ হাজার পুলিশ নিয়োগ দিয়ে স্বল্প প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নির্বাচনী নিরাপত্তায় ব্যবহার করতে পারত। বিগত সরকারের অনুগত ব্যক্তিরাও আগামী নির্বাচনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
শহীদ ওসমান হাদির হত্যার প্রসঙ্গ টেনে ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক হত্যাকারীরা নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করছে। আধিপত্যবাদী শক্তি টার্গেট কিলিংয়ে নেমেছে। দক্ষিণ এশিয়ার একটি আধিপত্যবাদী রাষ্ট্র সব সময় বাংলাদেশে অস্থিরতা চায়। তিনি ভারতের সংখ্যালঘু ইস্যুতে দ্বিচারিতার উদাহরণ দিয়ে বলেন, ভারতে নিয়মিত মুসলমান ও খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন হলেও বাংলাদেশের গণমাধ্যম সেসব তুলে ধরে না; বরং অনেক গণমাধ্যম ভারতের স্বার্থে বয়ান তৈরি করে।
বর্তমান সরকারের সিদ্ধান্তহীনতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, এই অবস্থায় সরকার কতটা সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে পারবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো দলীয় সংকীর্ণতার বাইরে আসতে পারছে না; এখানে নাগরিক সমাজকে এগিয়ে এসে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে ভোট ডাকাতি না করার অঙ্গীকার আদায় করতে হবে।
তিনি বলেন, বিদেশী শক্তির ওপর রাজনৈতিক দলগুলোর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়। ভবিষ্যতে কেউই দিল্লি বা অন্য কোনো দেশের ‘ব্ল্যাঙ্ক চেক’ পাবে না। নির্বাচন কমিশনকে মাঠে দৃশ্যমান হতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, গণতন্ত্র সংহত করতে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনকালে এক্সিট পোল প্রচারে গণমাধ্যমকে সতর্ক থাকতে হবে। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখনো নিষ্ক্রিয়; ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা থাকার পরও মাঠে তার প্রতিফলন নেই।
তিনি নির্বাচন কমিশনের কাজের গতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, কমিশন ঢিমেতালে কাজ করছে। এআই ব্যবহারের মাধ্যমে ফলাফল বদলের অপচেষ্টার আশঙ্কা থাকলেও কমিশনকে এ বিষয়ে উদাসীন মনে হচ্ছে।
তারেক রহমান দেশে আসার পর নির্বাচন নিয়ে আশঙ্কা কেটে গেছে বলে মন্তব্য করেন এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তবে সরকারের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, সরকার তারেক রহমানকে যেই সংবর্ধনা দিয়েছে তাতে আমার মনে হয় না লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হবে। সরকারকে এ রূপ আচরণ থেকে বেরিয়ে দ্রুত লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো শুধুমাত্র ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য রাজনীতি করে বলে তাদের সমালোচনা করেন তিনি। তিনি বলেন, বিদেশী শক্তি তাদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য তাদের পছন্দের দলকে ক্ষমতায় বসাতে চাইবে। তাই বাংলাদেশের রাজনীতি যেন বিদেশী শক্তিদের কাছে চলে না যায় সে জন্য একতাবদ্ধ থাকতে হবে।
মূল প্রবন্ধে প্রফেসর ড. এ কে এম ওয়ারেসুল করিম বলেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তরের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। নির্বাচন কমিশনের প্রকৃত স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও সক্ষমতা নিয়ে জনআস্থা তৈরি করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কমিশনকে শুধু নিরপেক্ষ হলেই চলবে না, দৃশ্যতও নিরপেক্ষ হতে হবে।
তিনি বলেন, প্রতিযোগিতামূলক ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ছাড়া ভোটারদের আস্থা ফিরবে না। ভোটের ফল আগেই নির্ধারিত- এই ধারণা ভাঙতে না পারলে ভোটার অংশগ্রহণ কমে যাবে। এ জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
তিনি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের মুক্ত ভূমিকা, সমাবেশের অধিকার এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তরুণ প্রজন্মের ন্যায়বিচার, কর্মসংস্থান ও সংস্কারের দাবি পূরণ না হলে সামাজিক অস্থিরতা বাড়বে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন সরকার বলেন, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে সব ভোটকেন্দ্র সিসিটিভির আওতায় আনতে হবে। কালো টাকা ও সন্ত্রাস ঠেকাতে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং অর্থের অপব্যবহার রোধ জরুরি। বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও তাদের দোসরদের কোনোভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া যাবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক আশরাফ আলী আকন বলেন, গণতন্ত্রের নামে গণতন্ত্র হত্যা করা হয়েছে। দলীয় দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও সহিংসতা এখনো বন্ধ হয়নি। রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনতে হবে।
সাবেক সিনিয়র সচিব ড. খ ম কবিরুল ইসলাম বলেন, সিভিল-মিলিটারি প্রশাসনকে অবশ্যই নিরপেক্ষ থাকতে হবে; অন্যথায় প্রশাসনের প্রাসঙ্গিকতা থাকবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, কালো টাকা ও মাসল পাওয়ার সুষ্ঠু নির্বাচনের বড় বাধা। ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি স্থাপন সহিংসতা ও কারচুপি রোধে কার্যকর হতে পারে।
খেলাফত মজলিসের সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক কাজী মিনহাজুল আলম বলেন, দেশে এখনো নির্বাচনের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়নি। নির্বাচন কমিশনকে অভিভাবকত্ব গ্রহণ করে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যান্য বক্তারা বলেন, শহীদ শরিফ ওসমান হাদি ছিলেন দেশের মানুষের কণ্ঠস্বর। তার হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। টেকসই গণতন্ত্র ও উন্নয়নের জন্য অবাধ, স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই।
বক্তারা প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, সন্ত্রাস বন্ধ, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, বডিক্যাম ও সিসিটিভি স্থাপন, কালো টাকার প্রভাব রোধসহ প্রয়োজনীয় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তারা বলেন, নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, নাগরিক সমাজ ও পর্যবেক্ষক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।