ধোঁয়াটে কুয়াশায় দৃশ্যমানতা কম সড়ক ও নৌপথে ঝুঁকি
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
সারা দেশে পড়েছে হাড় কাঁপানো শীত। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মতো শিশির ঝরছে। সেই সাথে ধোঁয়াটে কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়েছে প্রকৃতি। প্রচণ্ড কুয়াশায় দৃষ্টিসীমা বা দৃশ্যমানতা কমে গেছে। ফলে সড়ক ও নৌপথে চলাচলে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। দিনের বেলায়ও মহাসড়কগুলোতে হেডলাইট জ্বালিয়ে যানবাহন চালাতে হচ্ছে। এদিকে কনকনে ঠাণ্ডায় শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে কোথাও কোথাও রবিশস্য ক্ষতির মুখে পড়েছে। এ ছাড়াও নিম্নআয়ের মানুষ কাজে যেতে না পেরে আর্থিক সঙ্কটে পড়েছে। তবে শীতবস্ত্রের দোকানগুলোতে ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।
নীলফামারী প্রতিনিধি জানান, নীলফামারীতে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মতো পড়ছে কুয়াশাপাত। সেই সাথে হাড় কাঁপানো শীতে কাহিল হয়ে পড়েছে নীলফামারীর জনজীবন। এদিকে গত তিন দিন ধরে ঘন কুয়াশা আর কনকনে ঠাণ্ডার সাথে শুরু হয়েছে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ। এ অবস্থায় দরিদ্র, ছিন্নমূল ও খেটে খাওয়া মানুষজন পড়েছে চরম দুর্ভোগে। স্বাভাবিক কাজকর্মে নেমে এসেছে স্থবিরতা। সৈয়দপুর বিমানবন্দর আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ লোকমান হোসেন জানান গতকাল রোববার সকালে নীলফামারীর সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
দিনাজপুর প্রতিনিধি জানান, দিনাজপুরে জেঁকে বসেছে শীত। হিমেল হাওয়া ও শিশির বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জীবনযাত্রা। গতকাল দিনাজপুরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৩.০ডিগ্রি সেলসিয়াস দেখালেও অন্যান্য দিনের চেয়ে শীত বেশি অনুভূত হয়েছে। অথচ গত ২৫ ডিসেম্বর থেকে ১০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। কয়েকদিন থেকে শীতের তীব্রতা বাড়ছে। শীতের তীব্রতা অব্যাহত থাকায় খেটে খাওয়া মানুষদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। কয়েকদিন থেকে দিনাজপুরসহ ঠাকুরগাঁও পঞ্চগড়ে রোদ দেখা যায়নি। এতে খেটে খাওয়া মানুষের দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। বেলা আড়াইটার পর রোদের হালকা ঝলক দেখা দেয়। অন্যান্য দিনের চেয়ে আজকে মেঘলা আবহাওয়া থাকায় শীতের তীব্রতা বেড়েছে।
কুয়াকাটা (পটুয়াখালী) সংবাদদাতা জানান, পটুয়াখালীর কুয়াকাটাসহ উপকূলীয় অঞ্চলজুড়ে ঘন কুয়াশা ও তীব্র শীতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। গত দুই দিন ধরে ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মতো ঝরছে কুয়াশা। কোথাও কোথাও দৃশ্যমানতা নেমে এসেছে ৫০ মিটারের নিচে, ফলে সড়ক ও নৌপথে চলাচলে চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
কাউখালী (পিরোজপুর) সংবাদদাতা জানান, পিরোজপুরের কাউখালীতে হাড় কাঁপানো কনকনে শীতে জনজীবন বিপর্যস্ত। গতকাল সূর্যের মুখ দেখা যায়নি। কুয়াশার চাদরে ঢেকে ছিল সারাদিন। রাতে বৃষ্টির মতো কুয়াশা ও হিমেল হাওয়ায় শীতের মাত্রা আরো বেড়ে গেছে।
চরভদ্রাসন (ফরিদপুর) সংবাদদাতা জানান, ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলায় কয়েকদিন ধরে সূর্যের দেখা নেই। ঘন কুয়াশা আর হিমেল বাতাসে জেঁকে বসেছে তীব্র শীত। হাড়কাঁপানো এই শীতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্নআয়, দরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষ। প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্রের অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা। অথচ এখনো পর্যন্ত সরকারি কম্বল হাতে পাননি অনেক শীতার্ত মানুষ। চরভদ্রাসন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা: হাফিজুর রহমান বলেন, ‘শীতের প্রকোপ বাড়ার কারণে বর্তমানে ঠাণ্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক এবং হাঁপানি বা শ্বাসকষ্টে ভোগা রোগীদের ঝুঁকি বেশি থাকে। সবাইকে পর্যাপ্ত গরম কাপড় পরিধান করতে হবে এবং শিশু ও বয়স্কদের বাড়তি যতœ নিতে হবে।’
মির্জাগঞ্জ (পটুয়াখালী) সংবাদদাতা জানান, পটুয়খালীর মির্জাগঞ্জে ঘন কুয়াশার চাদর ভেদ করে উঁকি দিতে পারছে না সূর্য। পৌষের শীত যেন জেঁকে বসেছে সর্বত্র। এতে ব্যাহত হচ্ছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। গত তিন দিন ধরে আকাশ মেঘলা থাকলেও দুপুরের দিকে রোদের দেখা মেলে, কিন্তু গতকাল রোববার দুপুর গড়ালেও এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সূর্যের দেখা মেলেনি।
রাঙ্গাবালী (পটুয়াখালী) সংবাদদাতা জানান, টানা চার দিন ধরে ঘন কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহে জনজীবন কার্যত অচল হয়ে পরেছে উপকূলীয় উপজেলা রাঙ্গাবালীর মানুষের। হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডা ও চারদিক ঢেকে রাখা ঘন কুয়াশার কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন শিশু ও খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। কলাপাড়া আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, শনিবার এলাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। চলমান শৈত্যপ্রবাহ ও ঘন কুয়াশার এই পরিস্থিতি আরো চার থেকে পাঁচ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে বলেও পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে।
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, কনকনে ঠাণ্ডায় কাবু কিশোরগঞ্জ শহরের কর্মচঞ্চলতা নেই। রাস্তাঘাটে মানুষ নেই। তবে শ্রমজীবী মানুষের কিছু আনাগোনা ছিল। আবহাওয়া অফিস বলছে, গতকাল রোববার সকাল ৯টায় কিশোরগঞ্জের নিকলীতে দেশের সর্বনিম্ন ৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। এ সময় বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ১০০ শতাংশ।
চিতলমারী (বাগেরহাট) সংবাদদাতা জানান, বাগেরহাটের চিতলমারীতে গত চার দিনের তীব্র শীতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। নিম্নআয়ের কর্মজীবী মানুষ চরম বিপাকে পড়েছেন। হিমেল হাওয়া আর ঘন কুয়াশায় হাড় কাঁপানো শীতে জবুথবু হয়ে পড়েছে এ উপজেলার সাধারণ মানুষ। সর্দি, কাশি ও হাঁপানিজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। শিশু ও বৃদ্ধরা ঠাণ্ডাজনিত রোগে বেশী আক্রান্ত হচ্ছেন। চার দিনের শীতে আক্রান্ত হয়ে শুধুমাত্র উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫৫০ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এখানে ঠাণ্ডাজনিত রোগে গুরুতর অসুস্থ হয়ে ১৬ জন ভর্তি হয়েছেন। এদের মধ্যে বৌদ্ধ নাথ মণ্ডল (৭৫) নামে এক বৃদ্ধ মারা গেছেন।
শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) সংবাদদাতা জানান, হাওর ও চা-বাগান পরিবেষ্টিত দেশের অন্যতম পর্যটন এলাকা মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে জেঁকে বসেছে শীত। হিমেল বাতাস আর ঘন কুয়াশার কারণে বেলা বেড়ে দুপুর গড়ালেও সূর্যের দেখা মেলেনি। শ্রীমঙ্গলস্থ আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের সিনিয়র সহকারী পর্যবেক্ষক মো: আনিসুর রহমান জানান, শ্রীমঙ্গলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে রোববার সকাল ৬টা ও ৯টায় ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগের দিন সোমবার তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ১৩ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
সৈয়দপুর, (নীলফামারী) সংবাদদাতা জানান, হঠাৎ করে শীতের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় নীলফামারী সৈয়দপুরে ফুটপাথের শীতের পোশাকের দোকানগুলোতে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় দেখা যাচ্ছে। দিনের পাশাপাশি রাতেও জমে উঠেছে কেনাবেচা। কম দামে উষ্ণ পোশাকের খোঁজে নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ ভিড় করছেন ফুটপাথের এসব দোকানে। গতকাল সকালে সৈয়দপুর রেললাইন ঘেঁষে ওঠা লণ্ডা বাজারের বিভিন্ন ফুটপাথ ঘুরে দেখা যায়, জ্যাকেট, সোয়েটার, হুডি ও শাল বিক্রির দোকানগুলোতে ক্রেতাদের সমাগম। অনেক দোকানি রাত গভীর হওয়া পর্যন্ত দোকান খোলা রেখে ক্রেতাদের চাহিদা পূরণ করছেন। সৈয়দপুর বিমানবন্দর আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লোকমান হাকিম বলেন, কয়েক দিন থেকে তাপমাত্রা ওঠা নামা করছে। আজ সকাল ৯টায় তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস সকাল ৬টায় দৃষ্টিসীমা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়া অফিস।
ঝালকাঠি থেকে প্রতিনিধি জানান, ঝালকাঠির মাঠজুড়ে চলছে রবিশস্যের আবাদ। সরিষা, টমেটো, শিম, লাউ, শালগম, বাঁধাকপি, আলু, সরিষা থেকে শুরু করে একাধিক রবি ফসল চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। অনেক ফসল ঘরে তোলার সময়ও হয়েছে। কিন্তু কয়েকদিন ধরে টানা কুয়াশায় অনেক ফসলেই বেড়েছে রোগ-বালাইয়ের আক্রমণ। এ কুয়াশা দীর্ঘস্থায়ী হলে রবিশস্যের ক্ষতির আশঙ্কা করছে স্থানীয় কৃষক ও কৃষিবিভাগ। কৃষি তথ্য সূত্র জানায়, কুয়াশার কারণে ধানের চারা হলদে হয়ে যেতে পারে। সরিষায় বিভিন্ন পোকামাকড়ের আক্রমণ বেড়ে যেতে পারে। আলুর পাতায় মড়ক লাগার আশঙ্কা আছে। সাধারণত এ সময় আম গাছে মুকুল আসে। তাই ভালো ফলন পেতে এ সময় বাড়তি যতœ নিতে হবে। এসব বিষয়ে সমাধান পেতে নিকটস্থ কৃষি অফিসে যোগাযোগ করে সমাধান নেয়ার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ঝালকাঠিতে এবার ২২ হাজার ১৬ হেক্টর জমিতে রবি শস্যের আবাদ হয়েছে। জেলার কৃষকদের মধ্যে সরকারি প্রণোদনার সার-বীজ ও নিয়মিত কৃষি বিভাগের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি কৃষকদের পরিশ্রমের কারণে ভালো ফসল হয়েছে। এই ঘন কুয়াশা দীর্ঘ সময় থাকলে রবি শস্যের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।