ধানের শীষের পাশাপাশি হ্যাঁ ভোট দিতে হবে

রংপুরে তারেক রহমান

Printed Edition
first-1
বগুড়া থেকে রংপুর যাওয়ার সময় পথসভায় বক্তব্য রাখছেন তারেক রহমান : নয়া দিগন্ত

রংপুর ব্যুরো ও বগুড়া অফিস

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, সময় এসেছে শহীদ আবু সাঈদ ও শহীদ ওয়াসিমসহ জুলাই বিপ্লবে যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার। সেই স্বপ্ন পূরণে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে। সেজন্য ১২ তারিখে ধানের শীষে ভোট দেয়ার পাশাপাশি হ্যাঁ ভোটে টিক চিহ্ন দিতে হবে।

গতকাল শুক্রবার রাত ৯টায় রংপুরে কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠে বিভাগীয় নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন তিনি।

মহানগর আহ্বায়ক ও রংপুর-৩ আসনের প্রার্থী সামসুজ্জামান সামুর সভাপতিত্বে এ সময় বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা: এ জেড এম জাহিদ হোসেন, রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবিব দুলুসহ রংপুর বিভাগের ৩৩ আসনের এমপি প্রার্থীরা।

এ দিকে সমাবেশে যোগ দেওয়ার আগে এদিন সন্ধ্যায় পীরগঞ্জে আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করেন তারেক রহমান। এরপর আবু সাঈদের পরিবারের সাথে সাক্ষাৎ করে কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠের উদ্দেশে রওনা হন তিনি। পথে পথে নেতাকর্মীদের ভিড় ডিঙিয়ে সমাবেশস্থলে আসতে তার প্রায় পৌনে দুই ঘণ্টা লেগে যায়।

তারেক রহমান মঞ্চে ওঠেন রাত সাড়ে ৮টায়; বক্তব্য শুরু করেন পৌনে ৯টার দিকে। প্রায় ২৫ মিনিটের বক্তব্যে তিনি বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে যেসব কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ রয়েছে, সেগুলো সুদসহ সরকার পরিশোধ করে দেবে। কৃষকদের এই ঋণ পরিশোধ করতে হবে না। বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, “অনেক মানুষ বলেন, রংপুর গরিব অঞ্চল। কিন্তু আমি মনে করি, এই অঞ্চল সবচেয়ে সম্ভাবনাময়। কিন্তু সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়ন করতে হলে দরকার সঠিক নেতৃত্ব।” কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশ করে তিনি বলেন, “ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের দিন ধানের শীষের পাশাপাশি দয়া করে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে ভোট দেবেন।”

জনসভায় বক্তব্যে তারেক রহমান বিএনপি রাজনৈতিক দল হিসেবে ‘খারাপ হলে’ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কেন পাঁচ বছর জোটসঙ্গী হিসেবে ছিল, সেই প্রশ্ন তুলেন। জামায়াতে ইসলামীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, “একটি দল আছে, যার বিএনপির বিরুদ্ধে গত কয়েক দিন ধরে মিথ্যা বলে যাচ্ছে; আজো বলেছে।”

উত্তরাঞ্চলের সফরের দ্বিতীয় দিন শুক্রবার দুপুরে বগুড়া থেকে সড়কপথে রংপুর আসেন তারেক রহমান। তার আগমন উপলক্ষে দুপুর থেকে কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠে নেতাকর্মীর আসতে শুরু করেন। ছোট ছোট মিছিল নিয়ে আসা নেতাকর্মীদের হাতে দেখা যায় ধানের ছড়া ও প্রার্থীদের ছবি সংবলিত প্ল্যাকার্ড। বিকেল সাড়ে ৪টায় পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে সমাবেশের কার্যক্রম শুরু হয়।

রংপুর জেলা আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘‘গোটা রংপুর বিভাগের ৮ জেলার ৩৩ জন প্রার্থী তাদের কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে সমাবেশে এসেছেন। ‘‘আপনার দেখছেন, পুরো ঈদগাহ মাঠ ও আশপাশের এলাকা জনসমুদ্রে রূপ নিয়েছে।”

সমাবেশে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ রংপুর বিভাগের বিভিন্ন আসনে ধানের প্রার্থীরা বক্তব্য দেন। রংপুর-১ আসনে মোকাররম হোসেন, রংপুর-২ আসনে মোহাম্মদ আলী সরকার, রংপুর-৩ আসনে সামসুজ্জামান সামু, রংপুর-৪ আসনে মোহাম্মদ এমদাদুল হক, রংপুর-৫ আসনে গোলাম রাব্বানী ও রংপুর-৬ আসনের সাইফুল ইসলামও সমাবেশে ছিলেন।

অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- পঞ্চগড়-১ আসনের নওশাদ জমির, পঞ্চগড়-২ আসনের ফরহাদ হোসেন আজাদ, ঠাকুরগাঁও-২ আসনের আব্দুস ছালাম, ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের মো: জাহিদুর রহমান, দিনাজপুর-১ আসনের মনজুরুল ইসলাম, দিনাজপুর-২ আসনের সাদিক রিয়াজ চৌধুরী পিনাক, দিনাজপুর-৩ আসনের সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম, দিনাজপুর-৪ আসনের আক্তারুজ্জামান মিয়া, দিনাজপুর-৫ আসনের এ কে এম কামরুজ্জামান, নীলফামারী-১ আসনের মঞ্জুরুল ইসলাম আফ্রিদি (জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম), নীলফামারী-২ আসনের মো: সৈয়দ আলী, নীলফামারী-৩ আসনের শাহরিন, নীলফামারী-৪ আসনের আব্দুল গফুর সরকার, লালমনিরহাট-১ আসনের হাসান রাজিব প্রধান, লালমনিরহাট-২ আসনের রোকন উদ্দিন বাবুল, কুড়িগ্রাম-১ আসনের সাইফুল রহমান রানা, কুড়িগ্রাম-২ আসনের সোহেল হোসাইন কায়কোবাদ, কুড়িগ্রাম-৩ আসনের তাজভীর উল ইসলাম, কুড়িগ্রাম-৪ আসনের আজিজুল ইসলাম, গাইবান্ধা-১ আসনের খন্দকার জিয়াউল ইসলাম মোহাম্মদ আলী, গাইবান্ধা-২ আসনের আনিসুজ্জামান খান বাবু, গাইবান্ধা-৩ আসনের সৈয়দ মঈনুল হাসান সাদিক, গাইবান্ধা-৪ আসনের মো: শামিম কায়সার লিঙ্কন ও গাইবান্ধা-৫ আসনের মো: ফারুক আলম সরকারও কর্মী-সমর্থক নিয়ে সমাবেশে যোগ দিয়েছেন।

শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত, বাবা-মায়ের সাথে সাক্ষাৎ

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান জুলাই বিপ্লবে পুলিশের গুলিতে প্রথম শহীদ রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করেছেন। পরে তাদের বাড়িতে গিয়ে তিনি তার বাবা-মায়ের সাথে কথা বলেন। শুক্রবার সন্ধ্যা ৫টা ৫৫ মিনিটে তিনি রংপুরের পীরগঞ্জের বাবনপুরে শহীদ আবু সাঈদের বাড়িতে যান। সেখানে তার বাবা মকবুল হোসেন এবং নেতাকর্মীদের নিয়ে আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করেন। পরে তিনি দোয়া মুনাজাতে অংশ নেন। এরপর তিনি যান বাড়িতে। সেখানে বাবা মকবুল হোসেন ও মা মনোয়ারা, ভাই রমজান আলী, আবু হোসেনসহ পরিবারের সদস্যদের কাছে একসাথে বসেন, খোঁজখবর নেন। তাদের কথা শোনেন এবং পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন।

এ সময় আবু সাঈদের বাবা তারেক রহমানকে বলেন, ‘আল্লাহ যদি আপনাকে ক্ষমতায় আনেন, তাহলে প্রথমেই আবু সাঈদসহ জুলাই বিপ্লবে সব শহীদ হত্যার বিচার করবেন। আহতদের সুচিকিৎসাসহ পুনর্বাসন করবেন। পীরগঞ্জসহ সারা বাংলাদেশের মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবেন।

এ সময় তারেক রহমান তাকে প্রতিশ্রুতি দেন শহীদ আবু সাঈদসহ সব হত্যাকাণ্ডের ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা হবে এবং দেশের সব ক্ষেত্রে উন্নয়ন করবেন।

সন্ধ্যা ৬টা ২৬ মিনিটে তিনি শহীদ আবু সাঈদের বাড়ি থেকে বের হয়ে রংপুরের কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠের জনসভার উদ্দেশে রওনা দেন। এর আগে বগুড়া থেকে রংপুরের উদ্দেশে রওনা দিলে পথে পথে দুই পাশে দাঁড়িয়ে তাকে অভিনন্দন জানান দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। এর আগে বৃহস্পতিবার রাজশাহী, নওগাঁ ও মধ্যরাতে বগুড়ায় জনসমাবেশে বক্তব্য রাখেন তিনি।

ক্ষমতায় এলে দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরব : বগুড়ায় তারেক রহমান

বগুড়া অফিস জানায়, বিএনপির চেয়ারম্যান ও বগুড়া-৬ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী তারেক রহমান বলেছেন, আগামী নির্বাচনে দেশে জবাবদিহির সরকার হবে, না কী ধরনের সরকার হবে তা আপনাদের ভোটে নির্ধারিত হবে। তাই এবারের নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। আগে এ আসনে আম্মা এমপি ছিলেন। তখন আমি অনেক কাজ করেছি। বিশেষ করে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সরকারে থাকাকালে আমি বগুড়ার উন্নয়নে বিশেষভাবে কাজ করেছি। তখন বগুড়ায় গ্যাস সরবরাহ, মেডিক্যাল কলেজ, রাস্তা সম্প্রসারণসহ অনেক কাজ করেছি; কিন্তু আগামীতে হয়তো সেভাবে দেখা সম্ভব হবে না। তিনি বলেন, এমন কাজ করা যাবে না যে কারণে অন্য জেলা বঞ্চিত হয়। এতদিন শুধু বগুড়া নয় সারা দেশ বঞ্চিত ছিল। শুধু মেগা প্রকল্পের নামে মেগা দুর্নীতি করা হয়েছে। আমরা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেলে দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরব।

বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে নিজ আসন বগুড়া-৬ আসনের আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে জেলা বিএনপির বিশাল নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। মঞ্চে তার স্ত্রী ডা: জুবাইদা রহমান উপস্থিত ছিলেন।

জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশার সভাপতিত্বে জনসভায় আরো বক্তব্য দেন- চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট এ কে এম মাহবুবার রহমান ও হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু, বগুড়া-১ আসনের প্রার্থী কাজী রফিকুল ইসলাম, বগুড়া-২ আসনের মীর শাহে আলম, বগুড়া-৩ আসনের আব্দুল মহিত তালুকদার, বগুড়া-৪ আসনের মোশারফ হোসেন, বগুড়া-৫ আসনের গোলাম মো: সিরাজ, বগুড়া-৭ আসনের মোরশেদ মিল্টনসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।

তারেক রহমান দলের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে তাদের হাতে ধানের শীষ তুলে দিয়ে বিজয়ী করার আহ্বান জানান। এর আগে তিনি সড়কপথে রাজশাহী ও নওগাঁ থেকে বগুড়ায় পৌঁছান। তিনি শহরতলির ছিলিমপুর এলাকায় অবস্থিত চার তারকা হোটেল নাজ গার্ডেনে রাত্রিযাপন করেন। শুক্রবার সকালে তারেক রহমান বগুড়া শহরের তিনমাথা, চারমাথা, বারপুর এলাকায় গণসংযোগ ও পথসভায় বক্তব্য প্রদান শেষে শিবগঞ্জের মহাস্থানগড়ের হজরত শাহ সুলতান বলখির (রহ:) মাজার জিয়ারত করেন।

এ দিকে বিএনপির চেয়ারম্যান শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে শহরের হোটেল নাজ গার্ডেনে তার সহধর্মিণী ডা: জুবাইদা রহমানের উদ্যোগে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু-কিশোরদের মধ্যে হুইলচেয়ার বিতরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। সিএসএফ গ্লোবালের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানে তারা উপস্থিত শিশু-কিশোর ও তাদের অভিভাবকদের সাথে মতবিনিময় করেন। এ সময় ১০ শিশুকে হুইলচেয়ার উপহার দেয়া হয়। পরে তারেক রহমান তার গড়া বগুড়া বায়তুর রহমান সেন্ট্রাল মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করেন।