নতুন স্বপ্নের রাজনীতি : এক বছরে কতদূর এগোল এনসিপি
গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী অস্থির ও পরিবর্তনশীল সময়ে ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’র প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাত্রা শুরু করা দলটি স্বল্প সময়েই কর্মসূচি, সংগঠন বিস্তার ও নির্বাচনী অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিয়েছে। তবে এক বছর পর প্রশ্ন উঠছে- তারা কি সত্যিই প্রচলিত দ্বিমুখী রাজনীতির বাইরে কার্যকর বিকল্প হিসেবে দাঁড়াতে পেরেছে?
Printed Edition
এক বছর আগে তরুণদের উদ্যোগে আত্মপ্রকাশ করা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে পরিচিত এক নাম। গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী অস্থির ও পরিবর্তনশীল সময়ে ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’র প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাত্রা শুরু করা দলটি স্বল্প সময়েই কর্মসূচি, সংগঠন বিস্তার ও নির্বাচনী অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিয়েছে। তবে এক বছর পর প্রশ্ন উঠছে- তারা কি সত্যিই প্রচলিত দ্বিমুখী রাজনীতির বাইরে কার্যকর বিকল্প হিসেবে দাঁড়াতে পেরেছে?
আন্দোলন থেকে সংগঠন : আত্মপ্রকাশের সময় এনসিপি রাষ্ট্রব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কারের কথা বলেছিল। ‘সেকেন্ড রিপাবলিকে’র ধারণা সামনে এনে নতুন সংবিধান প্রণয়ন, গণপরিষদ নির্বাচন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তারা। কয়েক মাস পর ২৪ দফা ইশতেহার ঘোষণা করে দলটি, যেখানে বিচারব্যবস্থা সংস্কার, দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অবস্থান, সেবামুখী প্রশাসন ও স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর জোর দেয়া হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঘোষণাপত্রে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবায়নের পথরেখা স্পষ্ট করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন দল হিসেবে জনআকাক্সক্ষা ধরে রাখা এবং তা সাংগঠনিক শক্তিতে রূপ দেয়া, এই দুইয়ের সমন্বয়ই ছিল তাদের প্রথম বছরের প্রধান পরীক্ষা।
দেশব্যাপী সফর ও তৃণমূল প্রচেষ্টা : প্রতিষ্ঠার পর ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচির মাধ্যমে সারা দেশে সফর করে এনসিপি। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত জেলা সফরের মধ্য দিয়ে তারা স্থানীয়পর্যায়ে কমিটি গঠন ও সমর্থক সংগ্রহের চেষ্টা চালায়। তরুণদের অংশগ্রহণে এসব কর্মসূচি দৃশ্যমান হলেও সংগঠনকে স্থায়ী কাঠামোয় রূপ দেয়া এখনো প্রক্রিয়াধীন বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
দলটির দাবি, অল্প সময়েই তারা একটি কার্যকর নেটওয়ার্ক দাঁড় করাতে পেরেছে। তবে সমালোচকদের মতে, অনেক জায়গায় সংগঠন ব্যক্তিনির্ভর হয়ে পড়েছে; প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এখনো শক্ত ভিত পায়নি।
নির্বাচনে অংশগ্রহণ : শক্তির মাপকাঠি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০টি আসনে প্রার্থী দেয় এনসিপি। জোটগতভাবে ‘শাপলা কলি’ প্রতীক নিয়ে লড়াই করে তারা ছয়টি আসনে জয় পায়। মোট ভোটের ৩.২১ শতাংশ অর্জন নতুন দলের জন্য একধরনের সূচনা হলেও এটিকে বড় রাজনৈতিক সাফল্য বলা যায় কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, নির্বাচনে অংশ নেয়ার মধ্য দিয়ে এনসিপি নিজেদের কেবল আন্দোলনভিত্তিক দল হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখেনি। তবে জোটের অংশ হওয়ায় স্বতন্ত্র বিকল্প শক্তি হিসেবে আলাদা অবস্থান স্পষ্ট হয়নি। অনেক ভোটার এখনো তাদেরকে বৃহত্তর বিরোধী রাজনীতির পরিপূরক হিসেবেই দেখছেন।
নতুন রাজনৈতিক কৌশল : এনসিপি প্রচারণায় ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করেছে বলে দাবি করে। সীমিত ব্যয়ে নির্বাচন, ক্রাউডফান্ডিং, সাংস্কৃতিক কর্মসূচি এবং ট্রাকভিত্তিক জনসভা তাদের নতুনত্ব হিসেবে আলোচিত হয়েছে। দলটির নেতারা বলছেন, বড় বাজেট বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ওপর নির্ভর না করেও রাজনৈতিক লড়াই সম্ভব, এই বার্তা দিতে চেয়েছেন তারা।
তবে বাস্তবতা হলো, দীর্ঘমেয়াদি রাজনীতিতে টিকে থাকতে সাংগঠনিক স্থায়িত্ব, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা অপরিহার্য, যা এখনো পুরোপুরি পরীক্ষিত হয়নি।
সমালোচনা ও প্রত্যাশা : বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ও তরুণ কর্মীদের একটি অংশ মনে করেন, আন্দোলনের সময় যে আদর্শিক দৃঢ়তা দেখা গিয়েছিল, তা রাজনৈতিক বাস্তবতায় এসে কিছুটা ম্লান হয়েছে। অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অস্বচ্ছতার অভিযোগও শোনা যায়।
অন্য দিকে সমর্থকদের মতে, নতুন দল হিসেবে সীমাবদ্ধতা থাকা স্বাভাবিক। তারা মনে করেন, এক বছরে জনপরিসরে নিজেদের জায়গা তৈরি করা এবং সংসদে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা, এ দুটোই ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়।
বিকল্প শক্তি হওয়ার পথে : বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে দুই প্রধান শক্তির প্রভাব রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে তৃতীয় শক্তির জায়গা তৈরি করা সহজ নয়। এনসিপি সেই শূন্যতা পূরণের লক্ষ্য সামনে রেখেছে। কিন্তু কেবল তরুণ নেতৃত্ব বা নতুন স্লোগান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন অভিজ্ঞতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্ব এবং সুসংহত কৌশল।
পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, জেলা ও তৃণমূলপর্যায়ে কার্যকর সংগঠন, বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের সম্পৃক্ততা এবং নীতিগত অবস্থানে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারলে দলটি ভবিষ্যতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যথায় তারা সাময়িক আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
সামগ্রিক চিত্র : এক বছরে এনসিপি আন্দোলনের আবেগ থেকে নির্বাচনী রাজনীতির বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। জনসমর্থনের একটি ভিত্তি তারা গড়ে তুলেছে, সংসদে প্রতিনিধিত্বও পেয়েছে। তবে পূর্ণাঙ্গ বিকল্প শক্তি হয়ে ওঠার জন্য যে পরিপক্বতা ও সাংগঠনিক গভীরতা প্রয়োজন- তা এখনো নির্মাণাধীন।
আগামী সময়েই স্পষ্ট হবে, জাতীয় নাগরিক পার্টির রাজনৈতিক যাত্রা সাময়িক উত্থান ছিল, নাকি তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্থায়ী পরিবর্তনের সূচনা।