স্থানীয় সরকার নির্বাচন

স্বতন্ত্রের আড়ালে জোরালো প্রস্তুতি নিচ্ছে পতিত আ’লীগ

Printed Edition

মনিরুল ইসলাম রোহান

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর পরই স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে তৎপরতা শুরু হয়েছে। নতুন সরকার গঠনের পর বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। যদিও আইনি মারপ্যাঁচে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ গ্রহণ করার সুযোগ আপাতত পাচ্ছে না ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে বিতাড়িত আওয়ামী লীগ। তার পরও বসে নেই পতিত দলটির সম্ভাব্য প্রার্থীরা। ইতোমধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থীর আড়ালে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে জোরালো প্রস্তুতি গ্রহণ করার জন্য দলটির প্রধান শেখ হাসিনা দিল্লিতে বসেই নির্দেশনা দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।

দলটির শীর্ষ নেতাদের মতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার গঠন হয়েছে। নির্বাচনের মাধ্যমে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদায় হয়েছে- জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করতে পারলেও সেখানে আওয়ামী লীগের জন্য কিছুটা হলেও একটা স্বস্তির জায়গা তৈরি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নেতাকর্মীরা জামিন না পেলেও নতুন সরকারের আমলে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা জামিন লাভ করছেন, কারাগার থেকে অনেকেই মুক্ত হয়েছেন। নির্বাচনের পর পরই কয়েকটি জেলা-উপজেলায় আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় খুলতে দেখা গেছে। এভাবে রাজনীতিতে ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগের জন্য একটা স্পেস তৈরি হচ্ছে।

এ ছাড়াও দলটির নেতারা মনে করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তী সরকার এক আদেশে আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে রেখেছে। যদিও আওয়ামী লীগ সেটা মানেনি। কিন্তু এটাও তো একটা আইনি প্রক্রিয়ার বিষয় রয়েছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করার দরুন গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দলীয়ভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। গেল নির্বাচনের ব্যালট পেপারে নৌকা প্রতীকও ছিল না।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনও প্রতীকে অংশগ্রহণ করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নৌকা প্রতীক ব্যালটে থাকবে না। সে ক্ষেত্রে আইনি জটিলতার মারপ্যাঁচে পড়ে এমনিতেই আওয়ামী লীগ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। এ জন্য দীর্ঘদিন থেকে দলের যারা ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিয়ে চেয়ারম্যান ও মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন তাদের স্থানীয় পর্যায়ে আগেভাগেই দলীয় প্রধানের তরফ থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য জোরালোভাবে প্রস্তুতি নিতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। যেসব জায়গায় মামলার কারণে আওয়ামী আমলে নির্বাচিতদের কেউ প্রার্থী হতে পারবে না সেসব জায়গায় বিকল্প প্রার্থীও দাঁড় করানোর চিন্তাভাবনা রয়েছে বলে জানা গেছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের নজিরবিহীন পতন ঘটে। ক্ষমতাচ্যুত হয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিবেশী দেশ ভারতে পালিয়ে গিয়ে নিরাপদ আশ্রয় নেন। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের মন্ত্রিপরিষদ, দলীয় এমপি ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ কেউ দেশ ছাড়েন এবং কেউ কেউ আত্মগোপনে চলে যান। এর পর থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীরা দুয়েকটা ঝটিকা মিছিল ছাড়া প্রকাশ্যে কাউকেই দেখা যায়নি। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয়ভাবে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেনি বলে জানা গেছে।

এ দিকে নির্বাচনের পর পরই জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়, কক্সবাজারের উখিয়া, হবিগঞ্জ, রাজবাড়ী, পাবনা, রাজশাহী ও যশোরের বাঘাইছড়ি, পঞ্চগড় সদরের চাকলাহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ কার্যালয়সহ বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় আওয়ামী লীগের কার্যালয় খুলে দেয়ার খবর পাওয়া গেছে। যদিও এসব কার্যালয় খোলাটা রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের জন্য ছিল এসিড টেস্ট। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষ, রাজনীতিক, পেশাজীবী ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলে আওয়ামী লীগ সম্পর্কে ধারণার কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি না বা দেশের মানুষ নতুন করে আওয়ামী লীগকে কিভাবে গ্রহণ করে বা আদৌ গ্রহণ করে কি না এসব বিষয়ে মতামত বোঝার পদক্ষেপ হিসেবে নিয়েছে পতিত দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব। অবশ্য রাজনৈতিক অঙ্গনে আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলা নিয়ে নানা প্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে। বিশেষ করে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ও ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্রদের নিয়ে গঠিত নতুন দল এনসিপির মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। গত ৭ মার্চের শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ চালাতে গিয়ে তোপের মুখে পড়েন আওয়ামী সমর্থিতরা। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, এমন প্রেক্ষাপট অব্যাহত থাকলে এক দিকে আইনি মারপ্যাঁচে পড়ে দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ আওয়ামী লীগের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। অন্য দিকে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা স্বতন্ত্র প্রার্থীর ব্যানারে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে গেলেও নতুন সরকারের তরফ থেকে রাজনৈতিক সহনশীল বার্তা থাকতে হবে। অন্যথায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও কোনোভাবেই টিকতে পারবে না পতিত দলটি। অবশ্য দলটির প্রধানের পক্ষ থেকে আগেভাগেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার লক্ষ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান ও পরবর্তী সময়ে সরকার গঠনের পর পরই দলীয় প্রার্থীদের প্রস্তুতি নেয়ার জন্য চূড়ান্ত বার্তা দিয়ে রেখেছেন বলে জানা গেছে।