পালপাড়ায় আগের মতো নেই পালদের বসবাস : এস আর শানু খান

Printed Edition
pas-3
পালপাড়ায় আগের মতো নেই পালদের বসবাস : এস আর শানু খান

গ্রামাঞ্চলের জীবন মাটির জিনিসপত্রের ব্যবহার ছাড়া ভাবাই যায় না। হাঁড়ি, কলস, মাড়সা, বিভিন্ন রকমের পিঠা বানানোর ছাঁচ, মুড়ি ভাজার খোলা, বাসন, ঢাকুন এসব জিনিসপত্র ছাড়া গ্রামাঞ্চলের জীবন একদম অচল। শুধু এগুলোই নয়, মাটির তৈরি বড় ছোট মাঝারি সাইজের চাড়ি, বাসি, কোলা ধান ভেজানো, গরুর খাবার দেয়া, মাচাই ধান উঠিয়ে রাখা ও বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়। এগুলো ছাড়াও কুমাররা শিশুদের জন্য বিভিন্ন রকমের মাটির খেলনা যেমন পুতুল, বিভিন্ন রকমের জীবজন্তু, পাখি, নৌকা, জাহাজ, মাটির ব্যাংক তৈরি করত। ঈদ, পূজা, গঙ্গাস্নানের মেলাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এসব খেলনার বিরাট চাহিদাও ছিল।

আমাদের আশপাশের কয়েক গ্রামের মানুষ দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত সব ধরনের মাটির তৈরি জিনিসের জন্য সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল ছিল সিঙ্গিয়া পালপাড়ার ওপর।

যশোর জেলার সিঙ্গিয়া পালপাড়ায় প্রায় ৩০ ঘর পালের বাস ছিল। নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করে জিনিসপত্র তৈরি করত। ছোটবেলায় সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখিছি পালরা ভাঙাচোরা ভ্যান নিয়ে হাজির হতো কারো ভ্যানের ছিট নেই, কারো বা টায়ার নেই, কারো বা বডি ভাঙাচোরা। সুপারির পাতা, নারকেলের পাতা, বিভিন্ন জ্বালানি কিনতে আসতেন; মাটির জিনিস পোড়ানোর জন্য। তখন প্রায় বিকেলেই মা, কাকীদের সাথে পালপাড়ায় যেতাম। মা, কাকীরা বিভিন্ন জিনিস কিনতে যেত আর পেছন ধরতাম। পালদের চাকা ঘুরিয়ে হাঁড়ি, পাতিল বানানো দেখতে খুব শখ করত। তখন দেখতাম পালপাড়া সব সময় ব্যস্ত থাকত। পালেরা মাটি কাদা নিয়ে ব্যস্ত থাকত সব সময়। মাটির তৈরি জিনিস একটার পর একটা সাজিয়ে সাজিয়ে ভরে রাখত পুরো পালপাড়া। রাস্তার ওপর, বাগানের ভেতর কোনো জায়গায় ফাঁকা থাকত না বিকেল হলেই রাস্তা দিয়ে সারি বেঁধে বেঁধে মহিলারা যেত পালবাড়ি। আর খানেক সময় বাদেই এক একজন দু-তিনটা, কেউবা চারটা করে মাটির জিনিসপত্র নিয়ে ফিরত। মুড়ি ভাজার কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিস আঞ্চলিক ভাষার সেগুলো ঝাঁঝর, সাবনা, খোলা বলা হয়ে থাকে। এসব জিনিসের জন্য সিঙ্গিয়া পালপাড়ার খুব সুনাম ছিল। কেননা ওনাদের বানানো জিনিসগুলোর নকশা ও ধরন খুব সুন্দর ছিল। শীতের মৌসুমে খেজুর রসের জন্য খেজুরগাছ কাটা গাছিরা, গরমের সময় তালগাছ কাটা গাছিরা দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসতেন। কাঁধে বাগ বাঁধিয়ে দুই পাশে ঝুলিয়ে ছোট-বড় নানা আকারের ঠিলা নিয়ে যেতেন। এ ছাড়াও আর কিছু কিছু জিনিস যেগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ যেমন টয়লেটের রিং, জেলেদের জালের রকমারি চাড়া ইত্যাদির জন্য পালদের বিকল্প নেই। পালপাড়ার শুক্লা আমার খুব ভালো একজন বান্ধবী ছিল। স্কুলে পড়ার সময় অনেকবার গেছি ওদের বাড়িতে। সেই সুবাদে ওদের বিভিন্ন কার্যবিধি নিজ চোখে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। মাটি দিয়ে কাদা বানিয়ে সেটি দিয়ে হাতের সুনিপুণ স্পর্শ ও মনের মাধুরী মিশিয়ে প্রতিটি জিনিস তৈরি করত পালরা। পালপাড়ার মহিলাদের মধ্যে শুক্লার মা ছিলেন নামকরা কারিগর। শুক্লার মা সুন্দর সুন্দর পুতুল বানাতে পারতেন। যেগুলো অন্য মহিলারা পারতেন না। আর এই সুবাদে অল্প দিনের মধ্যেই শুক্লাদের অর্থনৈতিক অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছিল। মাটির তৈরি জিনিসপত্রগুলো পোড়ানোর জন্য প্রতিটি পালবাড়িতে একটি করে মাটি পোড়ানোর ঘর আছে, যেটায় মাটির তৈরি জিনিসগুলো সুন্দরভাবে সাজিয়ে বিভিন্ন জ্বালানি দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হতো। কাঁচা গাছ-গাছড়াও দেয়া হতো। যার জন্য ওইটায় আগুন দিলে ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় পুরো পালপাড়া ছেয়ে যেত। আমাদের গ্রাম থেকেই বোঝা যেত পালরা মাটির জিনিস পোড়াচ্ছে। জেলেপাড়া আর পালপাড়া পাশাপাশি। ৪০-৪৫ ঘর জেলে সম্প্রদায়ের বসবাস।

প্রায় ১০ বছর পর সে দিন বিকেলে হঠাৎ মনে হলো পালপাড়া দেখতে যাই। লোকে মুখে শুনেছি পালরা নাকি সবাই চলে গেছে ভারতে। গিয়ে দেখি অদ্ভুত কাণ্ড। যে পালপাড়ায় ঘরের সাথে ঘর। রাস্তা বাগান ভর্তি থাকত মাটির জিনিসে। হাঁটার জায়গা থাকত না; সেই পালপাড়া প্রায় মানুষশূন্য। মাত্র তিনঘর পাল রয়েছে। অন্য সবাই ভারতে চলে গেছে ভিটাবাড়ি বিক্রি করে। বাড়িঘরগুলো শ্মশানের মতো দেখাচ্ছে। কাঁচা ঘরের মাটি খসে পড়েছে। মাটির জিনিসপত্র তৈরির কাজে ব্যবহৃত সব যন্ত্রপাতি পড়ে রয়েছে এখানে-সেখানে। এক বাড়িতে মানুষের কথার আওয়াজ শুনে ঢুকে পড়লাম। বাড়ি কোথায় জিজ্ঞেস করতেই আমি আব্বুর নাম বলে দিলাম। চিনে ফেললেন। দেখলাম দু’জন মহিলা কিছু বানাচ্ছে। আর পুরুষ লোকটি এগিয়ে এলেন। ওনার মুখে শুনতে চেষ্টা করলাম কেন এমন করে হঠাৎ সবাই ভারত চলে যেতে শুরু করল। কেন-ই-বা আপনারা বাপ-দাদার ব্যবসা, ঐহিত্যকে ফেলে ভিটাবাড়ি ছেড়ে চলে যেতে চাইছেন। প্রথম যে কারণটা উনি দেখালেন সেটি হলো দিন দিন মাটির জিনিসের চাহিদা কমে যাচ্ছে। সিলভার, পাতিল ও কারখানায় তৈরি বিভিন্ন অ্যালুমিনিয়াম সামগ্রীর প্রভাবে মাটির জিনিস কদর হারিয়েছে। অবশ্য এটাও তেমন জোরালো কারণ নয়। কেননা আমাদের মাটির জিনিসের দামও আগের থেকে অনেক বাড়তি। আগে যেসব জিনিস দু-তিন টাকায় বিক্রি করতাম, এখন সেগুলো ৪০-৪৫ কিংবা তারও বেশি বিক্রি করি। অবশেষে অনেকটা আফসোস করেই বললেন মহিলা পুরুষ সবাই নিজেদের জন্যই নিজেরা, এমন কঠিন সময় পার করছি। তার কারণ যে নিজের ভাই, চাচাতো, জ্যাঠাতো ভাই সবাই চলে গেছে। এ জন্য আমরাও চলে যাচ্ছি। তা ছাড়া ওখানে যাওয়ার আরো একটা কারণ হলো বেশির ভাগ পালের ছেলেদের আগে থেকেই ওখানে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। ওখানে কেউ পড়াশোনা করে আবার কেউ বা ডাক্তারি করে। মেয়েগুলোর বেশির ভাগই বিয়ে দেয়া হয়েছে ভারতে। সে জন্য ছেলেমেয়েরা যেহেতু ওখানে, সেহেতু আমাদের এখানে থেকে কী লাভ। আমি জানতে চাইলাম আপনারাও কী চলে যাবেন। বারবার এটা-ওটা করে বের করলাম উনি বললেন এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে যদিও যাই পরে, এখন না। ওনার কথায় বুঝলাম বেশিদিন নয়, খুব শিগগিরই বুঝি ওনারাও চলে যাবেন।

পুরো পালপাড়া ঘুরে দেখলাম। চার বাড়ির মধ্যে মাত্র দু’জন টুকটাক মাটির কাজ করেন আর অন্য দু’জন কখন যেন পাড়ি জমায়- এমন অবস্থা। বাড়িতে কোনো জিনিস নেই বললেই চলে। সব কিছুই বিক্রি করে গুটিয়ে নিয়েছেন। মাটির জিনিসপত্র তৈরির চাকা যেটা ঘুরিয়ে বিভিন্ন জিনিস তৈরি হতো, সেই জিনিসটা দেখলাম খুব অযতেœ পড়ে রয়েছে এখানে সেখানে। এক বাড়িতে দেখলাম চাকা বেড়ার সাথে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। অনেক দিন তার কোনো কাজ নেই। অথচ এক দিন একসময় দিন-রাত এই চাকা বিরামহীনভাবে ঘুরতে হতো।

পালদের এ অবস্থা নিয়ে জেলেপাড়ার কয়েকজনের সাথে কথা বললে ওনারা জানালেন, আমরা জেলেরা আর পালরা এক সমাজে চললাম। বিভিন্ন পারিবারিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান একসাথেই করতাম। খুব শান্তিতেই ছিলাম;, কিন্তু ওদের এমন চলে যাওয়ায় আমরা সামাজিকভাবে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি; অন্য দিক থেকে আমরা বিভিন্ন প্রয়োজনীয় মাটির জিনিসের অভাবে পড়ছি। হাঁড়ি, কলস- এগুলো নেই মাটির, তার পরিবর্তে লোহা অ্যালুমিনিয়াম ব্যবহার করলাম কিন্তু জালের চাড়াসহ বিভিন্ন উপকরণ আমরা কোথায় পাবো।

গ্রামের অন্যান্য মানুষের সাথে এ বিষয় নিয়ে কথা হলে তারা বলেন, পালদের এমন চলে যাওয়ায় আমাদের মাটির জিনিসের বিরাট অভাব দেখা দিয়েছে। আগে তো হাতের কাছে ছিল, মন চাইলেই বিভিন্ন জিনিস কিনে নিয়ে এসেছি; টের পাইনি। এখন বিরাট সমস্যায় ভুগতে হয়।