সাদা মেঘ আর কালো মিথ্যা
Printed Edition
মুহাম্মদ কামাল হোসেন
লামইয়া। ছোট্ট একটি মেয়ে। তার বয়স মাত্র সাত কি আট। বড় বড় দুটো চোখ আর রেশমের মতো কালো চুল। একেবারে পরিষ্কার আর স্বচ্ছ। সে ছবি আঁকতে ভীষণ ভালোবাসত। তার শোবার ঘরের দেয়ালগুলো রঙিন পেন্সিল আর জলরঙে আঁকা নানা রকম ছবিতে ভরা। কোনোটিতে ডানাওয়ালা পরী, কোনোটিতে কথা বলা সিংহ, আবার কোনোটিতে মেঘের ওপরে ছোট ছোট ঘরবাড়ি।
লামইয়ার মা নাসরিন সুলতানা খুব শৌখিন মানুষ ছিলেন। তাদের বাড়ির ড্রয়িংরুমটা তিনি খুব সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছিলেন। ঘরের এক কোণে একটি মেহগনি কাঠের টেবিল ছিল, যার ওপর রাখা ছিল একটি নীল রঙের কাচের প্রাচীন ফুলদানি। সেই ফুলদানিটি ছিল নাসরিন সুলতানার খুব প্রিয়। তিনি বলতেন, এটি লামইয়ার দাদী তাকে উপহার দিয়েছিলেন। লামইয়া জানত, ওই ফুলদানিটার আশপাশে সাবধানে ঘোরাফেরা করতে হয়।
দিনটি ছিল খুব তপ্ত এক শনিবার। বাইরে কাঠফাটা রোদ, আর ঘরের ভেতর ফ্যান চললেও একটি গুমোট ভাব। লামইয়ার মা তখন রান্নাঘরে দুপুরের খাবার তৈরিতে ব্যস্ত। লামইয়া ড্রয়িংরুমে বসে তার নতুন স্কেচবুক নিয়ে ছবি আঁকছিল। হঠাৎ তার মনে হলো, পাশের জানালার ওপর একটি কাঠবিড়ালি এসে বসেছে। সে জানালার দিকে দ্রুত দৌড় দিতে গিয়ে ড্রয়িংরুমের সেই মেহগনি টেবিলটায় ধাক্কা খেল।
এক মুহূর্তের স্তব্ধতা। তারপর ঝনঝন শব্দ!
লামইয়ার হৃদস্পন্দন যেন বন্ধ হয়ে গেল। সে দেখল, সেই সাধের নীল ফুলদানিটা মেঝেতে কয়েক শ’ টুকরো হয়ে পড়ে আছে। সূর্যের আলো সেই ভাঙা কাচের ওপর পড়ে ঝিকমিক করছিল, কিন্তু লামইয়ার কাছে সেই উজ্জ্বলতা যেন আগুনের মতো গরম মনে হলো। তার পা কাঁপতে শুরু করল। সে জানে মা এই ফুলদানিটা কতটা ভালো বাসতেন।
ভয়ে লামইয়া দ্রুত হাত দিয়ে ভাঙা কাচগুলো জড়ো করতে লাগল। কিন্তু তার আঙুলে একটি ছোট চিমটি কাটল কাচের কোনা। ছোট এক ফোঁটা রক্ত বের হলো; কিন্তু সেই ব্যথার চেয়েও বড় ব্যথা ছিল তার মনের ভেতর। সে বুঝতে পারল না কী করবে। হঠাৎ তার মাথায় একটি বুদ্ধি খেলল, একটি ‘কালো বুদ্ধি’। সে দ্রুত ভাঙা কাচগুলো সোফার পেছনের অন্ধকার অংশে ঝাড়ু দিয়ে সরিয়ে দিলো। তারপর এমনভাবে সোফায় বসে পড়ল যেন সে কিছুই জানে না।
রান্নাঘর থেকে মা দ্রুত পায়ে ড্রয়িংরুমে ঢুকলেন। আওয়াজটা তিনিও শুনেছিলেন।
‘লামইয়া, কিসের শব্দ হলো? কিছু কি ভেঙেছে?’ মা উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
লামইয়ার বুকটা ধড়ফড় করছিল। সে মায়ের চোখের দিকে তাকাতে পারল না। মাথা নিচু করে কাঁপাকাঁপা গলায় সে বলল, ‘না তো মা, আমি কিছু শুনিনি। হয়তো বাইরের কোনো শব্দ।’
মা টেবিলের দিকে তাকালেন। ‘ফুলদানিটা কোথায় গেল? এটা তো এখানেই ছিল!’
লামইয়া এবার বড় একটি মিথ্যে বলে বসল। ‘মা, আমি দেখছিলাম একটি বড় হুলো বিড়াল জানালার গ্রিল দিয়ে ঢুকেছিল। হয়তো বিড়ালটা ফুলদানিটা ফেলে পালিয়েছে।’
মা অবাক হলেন। ‘বিড়াল? কিন্তু সব জানালা তো বন্ধ ছিল!’
লামইয়া জেদ ধরে বলল, ‘হ্যাঁ মা, আমি নিজের চোখে দেখেছি। বিড়ালটা লেজ দিয়ে ধাক্কা দিয়ে জানালা দিয়ে লাফ দিলো।’
মা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তার চোখে একটি বিষণœতা ফুটে উঠল। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘খুবই প্রিয় ছিল আমার ওটা। কিন্তু কী আর করা, বিড়াল তো অবুঝ প্রাণী।’
মা চলে গেলেন; কিন্তু লামইয়া লক্ষ করল অদ্ভুত একটি বিষয়। ড্রয়িংরুমের জানালা দিয়ে বাইরে যে ঝকঝকে সাদা মেঘগুলো দেখা যাচ্ছিল, সেগুলোর রঙ যেন হঠাৎ করে একটু ধূসর হয়ে গেল। লামইয়ার মনে হলো, তার বুকের ভেতরটা যেন লোহার মতো ভারী হয়ে গেছে।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল। লামইয়া পড়ার টেবিলে বসেছিল; কিন্তু বইয়ের পাতায় মন বসাতে পারছিল না। সে যখনই চোখ বন্ধ করছিল, দেখছিল সেই নীল ফুলদানিটার ভাঙা টুকরোগুলো। আর যখনই সে মনে করছিল সে মাকে মিথ্যে বলেছে, তখনই তার মনে হচ্ছিল তার পেটের ভেতর যেন একটি ঠাণ্ডা পাথর বসে আছে।
রাতে খাওয়ার সময় মা তার প্রিয় ইলিশ মাছ রেঁধেছিলেন। কিন্তু লামইয়ার কাছে মাছের স্বাদ যেন বালির মতো মনে হলো। তার মা তাকে আদর করে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী হয়েছে মামণি? শরীর খারাপ?’
লামইয়া আবার মিথ্যে বলল, ‘না মা, ক্ষুধা নেই’।
সেদিন রাতে যখন সে তার নিজের ঘরে ঘুমাতে গেল, ঘরটা যেন একটু বেশিই অন্ধকার মনে হলো। জানালার পর্দা দিয়ে চাঁদের আলো ঢুকছিল; কিন্তু সেই আলোতেও যেন কোনো উজ্জ্বলতা ছিল না। লামইয়ার বারবার মনে হচ্ছিল, সে যে মিথ্যে বলেছে, তা এই ঘরের দেয়ালগুলো, তার আঁকা ছবিগুলো সব জানে।
লামইয়া গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হলো; কিন্তু সেই ঘুম ছিল দুঃস্বপ্নে ভরা। স্বপ্নে সে নিজেকে এক বিশাল সাদা মেঘের রাজ্যে আবিষ্কার করল। সেই মেঘগুলো তুলোর মতো নরম, যেখানে সে পা ফেললেই যেন লাফিয়ে উঠছে। আকাশটা একদম নীল, ঠিক সেই ভাঙা ফুলদানির মতো নীল।
হঠাৎ করেই আকাশটা অন্ধকার হয়ে যেতে লাগল। লামইয়া দেখল, দূর থেকে একটি বিশাল কালো মেঘ ঝড়ের বেগে তার দিকে এগিয়ে আসছে। সেই কালো মেঘ থেকে কর্কশ গলায় একটি শব্দ বের হচ্ছে, ‘মিথ্যে! মিথ্যে! মিথ্যে!’
লামইয়া ভয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘কে তুমি?’
কালো মেঘটা লামইয়ার সামনে এসে স্থির হলো। মেঘের ভেতর থেকে দুটো জ্বলজ্বলে চোখের মতো আলো দেখা গেল। মেঘটা বলল, ‘আমি তোমার বলা সেই মিথ্যে। তুমি যখনই মিথ্যে বলবে, আমি তোমার মনের এই সুন্দর সাদা মেঘের রাজ্যটাকে গ্রাস করব।’
লামইয়া দেখল, তার পায়ের নিচের সেই সুন্দর সাদা মেঘগুলো কালো কালির মতো কুৎসিত হয়ে যাচ্ছে। তার আঁকা সব সুন্দর ছবিগুলো ছাই হয়ে উড়ে যাচ্ছে। সেই মেঘের রাজা বলল, ‘সত্যি হলো সাদা মেঘের মতো হালকা, যা তোমাকে স্বস্তি দেয়। আর মিথ্যে হলো কালো মেঘের মতো ভারী, যা তোমার শান্তি মুহূর্তে কেড়ে নেয়। এখন বলো লামইয়া, তুমি কি অন্ধকারে থাকতে চাও নাকি আলোতে?’
লামইয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘আমি আলো চাই! আমি আমার সাদা মেঘ ফিরে পেতে চাই!’
গভীর রাতে লামইয়ার ঘুম ভেঙে গেল। সে দেখল তার বালিশ চোখের জলে ভিজে একাকার। তার বুকটা তখনো টিপটিপ করছে। সে বুঝতে পারল, এই অস্বস্তি, এই ভয়- সব কিছুর মূল কারণ ওই একটি মিথ্যা কথা। সে বুঝতে পারল, মা হয়তো তাকে বকবেন, হয়তো সে শাস্তি পাবে; কিন্তু এই মিথ্যের বোঝা বয়ে বেড়ানোর চেয়ে শাস্তি পাওয়াটা অনেক অনেক ভালো।
সে অন্ধকারেই বিছানা থেকে নামল। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল পাশের রুমে, যেখানে মা অঘোরে ঘুমাচ্ছেন। লামইয়া মায়ের হাতটা ধরল। নাসরিন সুলতানা জেগে উঠলেন। অন্ধকারে মেয়ের মুখ দেখে তিনি ঘাবড়ে গেলেন।
‘কী হয়েছে মামণি? কোনো খারাপ স্বপ্ন দেখেছ?’
লামইয়া ডুকরে কেঁদে উঠল। সে মায়ের কোলে মুখ লুকিয়ে বলতে শুরু করল- ‘মা, আমাকে ক্ষমা করে দাও। কোনো বিড়াল আসেনি। আমি যখন কাঠবিড়ালি দেখতে গিয়েছিলাম, তখনই আমার ধাক্কা লেগে ফুলদানিটা ভেঙে গেছে। আমি ভয়ে মিথ্যে বলেছি মা। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে!’
লামইয়া কাঁদতে কাঁদতে সবটা বলে দিলো। সে কীভাবে কাচগুলো সোফার নিচে লুকিয়েছে, কীভাবে ভয়ে বিড়ালের গল্প বানিয়েছে, কোনো কিছুই আর গোপন করল না। মা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। তারপর তিনি খুব ধীরে লামইয়াকে জড়িয়ে ধরলেন। লামইয়া ভাবছিল মা হয়তো খুব রাগ করবেন; কিন্তু মা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন।
মা বললেন, ‘লামইয়া, ফুলদানিটা ভেঙেছে বলে আমার কষ্ট লেগেছে সত্যি; কিন্তু তুমি আমাকে মিথ্যে বলেছ জেনে আমার তার চেয়েও অনেক বেশি কষ্ট হচ্ছিল। আমি জানতাম বিড়াল আসেনি, কারণ সব জানালা লক করা ছিল। আমি শুধু অপেক্ষা করছিলাম আমার মেয়েটি কখন নিজে থেকে এসে আমাকে সত্যিটা বলবে।’
লামইয়া অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকাল। ‘তুমি জানতে মা?’
মা হাসলেন। ‘মায়েরা সব বোঝে মামণি। মনে রাখবে, একটি মিথ্যে ঢাকতে তোমাকে আরো ১০০টি মিথ্যে বলতে হবে। আর প্রতিটি মিথ্যে তোমার মনের ওপর একটি করে কালো পাথর বসিয়ে দেবে। আজ তুমি সত্যি বলে সেই পাথরগুলো সরিয়ে ফেলেছ।’
লামইয়া এক অদ্ভুত স্বস্তি অনুভব করল। মনে হলো, তার শরীরের সব ভার নেমে গেছে। সে যখন জানালার দিকে তাকাল, দেখল বাইরে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। রাতের সেই কালো অন্ধকার আকাশটা ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হচ্ছে।