গাজা থেকে শেষ ইসরাইলি বন্দীর লাশ উদ্ধার, রাফাহ ক্রসিং খোলার পথ সুগম
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
- লাশ উদ্ধারের নামে গোলাবর্ষণ ও কবর ধ্বংস
- রাফাহ ক্রসিংয়ের বন্ধ দরজায় গাজাবাসীর আশা ও আতঙ্ক
- দ্বিতীয় ধাপে পুনর্গঠন নেই- নেতানিয়াহুর দাবি ঘিরে বিভ্রান্তি
গাজা থেকে শেষ ইসরাইলি বন্দী র্যান গিভিলির লাশ উদ্ধার করেছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। সোমবার এক বিবৃতিতে জানানো হয়, ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে লাশটি শনাক্ত করা হয়েছে এবং দাফনের জন্য পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রস্তুতি চলছে। এর মধ্য দিয়ে গাজায় থাকা সব ইসরাইলি বন্দীকে ‘জীবিত বা মৃত’ ফিরিয়ে আনার প্রথম ধাপের শর্ত পূরণ হলো বলে দাবি করেছে ইসরাইল। খবর আলজাজিরার।
লাশ উদ্ধারের ঘটনাকে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু “রাষ্ট্রের জন্য অসাধারণ অর্জন” হিসেবে উল্লেখ করেন। এ ঘটনায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মুক্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সহায়তা করায় তিনি তার কর্মকর্তাদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। ট্রাম্প তার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোস্যালে লেখেন, ‘এইমাত্র গাজা থেকে শেষ বন্দীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ফলে জীবিত ২০ জন বন্দী এবং নিহত সবাইকে ফেরত আনা সম্ভব হয়েছে। অসাধারণ কাজ! বেশির ভাগ মানুষই এটিকে অসম্ভব বলে মনে করেছিল। আমার চ্যাম্পিয়ন দলকে অভিনন্দন!’
এই উদ্ধার অভিযানের ফলে গাজা ও মিসরের মধ্যকার রাফাহ সীমান্ত ক্রসিং সীমিত আকারে পুনরায় খোলার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত গাজা প্রশাসনের টেকনোক্র্যাট কমিটি জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহেই ক্রসিং খোলার প্রস্তুতি রয়েছে, যদিও ইসরাইলি পক্ষ এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। হামাস এক বিবৃতিতে জানায়, তারা যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রথম ধাপের প্রতি পূর্ণ অঙ্গীকারবদ্ধ এবং মধ্যস্থতাকারীদের প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে লাশ উদ্ধারে সহায়তা করেছে। একই সাথে তারা রাফাহ ক্রসিং উভয় দিক থেকে কোনো বিধিনিষেধ ছাড়াই খোলার আহ্বান জানায়।
লাশ উদ্ধারের নামে গোলাবর্ষণ ও কবর ধ্বংস
তবে গাজায় সর্বশেষ ইসরাইলি বন্দী রান গিভিলির লাশ উদ্ধারের সময় গাজা শহরে ব্যাপক গোলাবর্ষণ, বুলডোজার অভিযান এবং কবর ধ্বংসের খবর পাওয়া গেছে। ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফা জানায়, রোববার ভোরে গাজার পূর্বাঞ্চলে এই অভিযান শুরু হয়। ইসরাইলি সেনারা আল-সানাফুর এলাকা ও আল-বাতশ কবরস্থানের আশপাশে ব্যাপক বুলডোজিং চালায়। এতে একাধিক কবর ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ভারী গোলাবর্ষণ, সামরিক যান ও ড্রোন থেকে গুলির ফলে বহু হতাহত হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে। উত্তর-পূর্ব গাজার তুফ্ফাহ এলাকায় গোলার আঘাতে একাধিক তাঁবুতে আগুন ধরে যায়।
রাফাহ ক্রসিংয়ের বন্ধ দরজায় গাজাবাসীর আশা ও আতঙ্ক
ইসরাইলের অবরোধ ও নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা গাজার রাফাহ সীমান্ত ক্রসিং ঘিরে হাজারো ফিলিস্তিনির জীবন আজো অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে আছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও ক্রসিংটি কেবল সীমিত ও শর্তসাপেক্ষভাবে খোলার ঘোষণায় গাজায় তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। খবর আলজাজিরার। নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়া ছয় সন্তানের জননী খিতাম হামিদ জানান, রাফাহ খুললে তিনি স্বামীর সাথে পুনর্মিলিত হতে পারবেন এবং গুরুতর অসুস্থ ছেলে ইউসুফের চিকিৎসার সুযোগ মিলবে। ১৪ বছর বয়সী ইউসুফ বিরল জেনেটিক রোগ এহলার্স-ড্যানলস সিনড্রোমে আক্রান্ত। যুদ্ধের কারণে তার চিকিৎসা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। চিকিৎসা সঙ্কট শুধু ইউসুফের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় হিসাব অনুযায়ী, ২২ হাজারের বেশি রোগী ও আহত ব্যক্তি। এর মধ্যে পাঁচ হাজারের বেশি শিশু চিকিৎসার জন্য গাজার বাইরে যেতে পারছেন না। নবজাতক হুর কেশতার মতো অনেক শিশুর জীবন রাফাহ খোলার ওপর নির্ভর করছে। এ দিকে ক্রসিং বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনও থমকে গেছে। গাজা সিটির শিক্ষার্থী রানা বানার মতো শত শত মেধাবী তরুণ-তরুণী বিদেশে পড়াশোনার সুযোগ পেয়েও ক্রসিং বন্ধ থাকায় যেতে পারছেন না। অনেক ফিলিস্তিনি আশঙ্কা করছেন, রাফাহ দিয়ে বের হওয়া একমুখী যাত্রা হয়ে যেতে পারে। তাদের মতে, চলাচলের স্বাধীনতা কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি একটি মৌলিক অধিকার।
দ্বিতীয় ধাপে পুনর্গঠন নেই- নেতানিয়াহুর দাবি ঘিরে বিভ্রান্তি
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত গাজা পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে পুনর্গঠনের কোনো বিষয় অন্তর্ভুক্ত নেই। সোমবার ইসরাইলি পার্লামেন্টে দেয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, গাজায় সর্বশেষ ইসরাইলি বন্দীর লাশ উদ্ধারের পর সরকার এখন পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নে মনোযোগ দিচ্ছে। খবর আনাদোলু এজেন্সির। নেতানিয়াহুর ভাষ্য অনুযায়ী, এই ধাপের মূল লক্ষ্য হলো হামাসকে নিরস্ত্র করা এবং গাজাকে সামরিকভাবে নিষ্ক্রিয় করা। তিনি বলেন, হামাস এতে সম্মত না হলে শক্তি প্রয়োগ করা হবে। একই সাথে তিনি দাবি করেন, অক্টোবর ২০২৩ সালের তুলনায় ইরান ও তার মিত্ররা এখন দুর্বল অবস্থানে রয়েছে এবং ইরান ইসরাইলে হামলা চালালে “কঠোর জবাব” দেয়া হবে। তবে নেতানিয়াহুর এই বক্তব্যের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের স্পষ্ট অমিল দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ১৪ জানুয়ারি জানান, ২০ দফা গাজা পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে নিরস্ত্রীকরণ, টেকনোক্র্যাট সরকারব্যবস্থা এবং পুনর্গঠন- তিনটিই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এরই মধ্যে গাজার প্রশাসনের জন্য ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটদের নিয়ে একটি জাতীয় কমিটি গঠন এবং ট্রাম্পের নেতৃত্বে একটি ‘পিস কাউন্সিল’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণাও এসেছে। ফলে গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে।
রাফাহ খোলা হলেও সাংবাদিকদের গাজায় প্রবেশের নিশ্চয়তা নেই : ইসরাইল
রাফাহ সীমান্ত খোলার সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও বিদেশী সাংবাদিকদের গাজায় প্রবেশের অনুমতি দেয়া হবে না বলে জানিয়েছে ইসরাইল সরকার। সোমবার দেশটির সুপ্রিম কোর্টে এক শুনানিতে সরকারের প্রতিনিধি বলেন, সাংবাদিকদের প্রবেশ এখনো “নিরাপত্তা ঝুঁকি” সৃষ্টি করতে পারে। খবর মিডলিস্ট মনিটরের। এই শুনানি হয় ইসরাইলে কর্মরত বিদেশী সংবাদমাধ্যমগুলোর সংগঠন ফরেন প্রেস অ্যাসোসিয়েশনের (এফপিএ) করা এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে। আবেদনে গাজায় স্বাধীনভাবে সংবাদ সংগ্রহের অনুমতি চাওয়া হয়। ইসরাইলি দৈনিক হারেৎজ জানায়, সরকার ঝুঁকির কথা বললেও তা নির্দিষ্ট করে ব্যাখ্যা করেনি।
বিচারপতি রুথ রোনেন এ সময় বলেন, “শুধু নিরাপত্তার কথা বললেই চলবে না, এর স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন।” তিনি উল্লেখ করেন যে, মাঠের বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন এসেছে। আদালত পরবর্তী পর্যায়ে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর বক্তব্য গোপন শুনানিতে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেয়। উল্লেখ্য, যুদ্ধ শুরুর পর এটিই দ্বিতীয়বারের মতো এমন আবেদন। প্রথমটি প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। চলতি আবেদনটি দাখিল করা হয়েছিল এক বছর চার মাস আগে, তবে সরকার বারবার সময় চেয়ে শুনানি বিলম্বিত করে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বলছে, এই নিষেধাজ্ঞা গাজায় মানবিক পরিস্থিতি সম্পর্কে স্বাধীন তথ্যপ্রবাহকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে।
যুদ্ধবিরতির মধ্যেও গাজায় ইসরাইলি গোলাবর্ষণ ও বিমান হামলা
যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার পরও গাজা উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায় ইসরাইলি সেনাবাহিনীর গোলাবর্ষণ ও বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের বরাতে আনাদোলু এজেন্সি জানায়, দক্ষিণ গাজার খান ইউনুসের পূর্বাঞ্চলের একাধিক এলাকায় ইসরাইলি আর্টিলারি ইউনিট গোলাবর্ষণ করেছে। একই সাথে দক্ষিণ গাজার রাফাহ শহরের ওপর ইসরাইলি যুদ্ধবিমান হামলা চালায়, যা শহরের পশ্চিমাঞ্চলের হামলার সাথেও সমন্বিত ছিল। এ দিকে গাজা সিটির পূর্বাঞ্চলের তুফ্ফাহ মহল্লার বিভিন্ন স্থানে ইসরাইলি কামানের গোলা আঘাত হানে। সামরিক যান ও হেলিকপ্টার থেকেও নির্বিচারে গুলি ছোড়া হয় বলে জানা গেছে। মধ্য গাজার বুরেইজ শরণার্থী শিবিরের পূর্বাঞ্চলেও ইসরাইলি হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণের খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, তুফ্ফাহ এলাকায় ইসরাইলি ড্রোন হামলায় অন্তত তিন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ওই হামলায় আরো তিনজন আহত হন। এসব ঘটনাকে যুদ্ধবিরতির সরাসরি লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করছে ফিলিস্তিনি পক্ষ। এমন পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও গাজায় ১০০-এর বেশি শিশু নিহত হয়েছে। ইউনিসেফের এক কর্মকর্তা চায়বান জানান, যুদ্ধবিরতির ফলে ১০ লাখের বেশি শিশুর জীবনে কিছুটা উন্নতি এলেও মানবিক সহায়তা এখনো প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। বর্তমানে গাজায় এক লাখ শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে এবং শীত শুরুর পর অন্তত ১০ শিশু হাইপোথার্মিয়ায় মারা গেছে। ইউনিসেফ জানায়, ১৩ লাখ মানুষ এখনও নিরাপদ আশ্রয় থেকে বঞ্চিত এবং সাত লাখের বেশি স্কুলগামী শিশু ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে রয়েছে। সংস্থাটি জোর দিয়ে বলেছে, যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়ন মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত জরুরি।
ইসরাইলের দাবিতে এমএসএফের কর্মী তথ্য হস্তান্তর : মানবিক মহলে ক্ষোভ
গাজায় কাজ চালিয়ে নিতে ইসরাইলের ‘অযৌক্তিক’ শর্ত মেনে নেয়ায় চিকিৎসা সহায়তাকারী সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস (এমএসএফ) তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, তারা গাজা ও অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে কর্মরত কিছু ফিলিস্তিনি ও আন্তর্জাতিক কর্মীর ব্যক্তিগত তথ্য ইসরাইলি কর্তৃপক্ষকে দেবে। খবর আলজাজিরার। সমালোচকদের আশঙ্কা, এই তথ্য ব্যবহার করে ইসরাইল আরো মানবিক কর্মীকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। গাজায় চলমান গণহত্যার সময় ইসরাইলি হামলায় ১,৭০০-এর বেশি স্বাস্থ্যকর্মী নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে এমএসএফের অন্তত ১৫ কর্মী রয়েছেন। ইসরাইল জানায়, নতুন ‘নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা’ নীতির আওতায় কর্মীদের পাসপোর্ট, জীবনবৃত্তান্ত এবং পারিবারিক তথ্য দিতে হবে। এসব শর্ত মানতে অস্বীকৃতি জানানোয় ৩৭টি এনজিওর লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। এমএসএফ বলছে, তথ্য দেয়া অথবা কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করা ছিল ‘অসম্ভব এক সিদ্ধান্ত’। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, দখলদার শক্তির চাপে কর্মীদের তথাকথিত সম্মতি প্রকৃত অর্থে স্বাধীন নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু এমএসএফ নয়, পুরো মানবিক সহায়তা ব্যবস্থার নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর প্রশ্ন তুলে ধরেছে।