সংবিধান সংশোধনের নামে মূল সংস্কার এড়ানোর চেষ্টা চলছে : মিয়া গোলাম পরওয়ার
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমতকে (নোট অব ডিসেন্ট) অজুহাত বানিয়ে জুলাই সনদের মূল রূপরেখা ও গণভোটের রায়কে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে। আংশিক কোনো ‘সংবিধান সংশোধন’ দিয়ে শাসন কাঠামোর গুণগত বা রাজনৈতিক পরিবর্তন আনা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ যে আমূল প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের রায় দিয়েছে, তা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
গতকাল বুধবার সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির শহীদ শফিউর রহমান মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ : উত্তরণে আইনজীবীদের ভূমিকা’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ লইয়ার্স কাউন্সিল এই সেমিনারের আয়োজন করে।
সেমিনারে গোলাম পরওয়ার সরকারের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রীরা সংসদে দাঁড়িয়ে এবং বাইরে প্রকাশ্য জনসভায় জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে মানার কথা বলছেন। তবে বাস্তবে তা বাস্তবায়নে কৌশলগত গড়িমসি ও রাজনৈতিক ফাঁকি দেয়া হচ্ছে। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর স্বাক্ষরিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ : ভবিষ্যতের পথরেখা’তে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়ে ৮৪টি বিষয়ে সংস্কারের প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু এর মধ্যে মূল দল হিসেবে বিএনপি ১৪ থেকে ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বিষয়ে ভিন্নমত (নোট অব ডিসেন্ট) প্রকাশ করে।
তিনি অভিযোগ করেন, ঐকমত্যের ভিত্তিতে তৈরি এই ভিন্নমতগুলোই ছিল সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও মৌলিক সংস্কারের জায়গা। যার মধ্যে অন্যতম হলো একই ব্যক্তির একই সাথে প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান না থাকা, উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (প্রপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন) পদ্ধতি চালু করা এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগ, পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) মতো সব গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদ প্রধানমন্ত্রীর একক ইচ্ছায় পূরণ না করে সরকারি ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে গঠিত নিরপেক্ষ কমিশনের মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া।
পরওয়ার উল্লেখ করেন, বিগত দিনের একদলীয় ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের মূল উৎস ছিল এই প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পদগুলোতে দলীয় ক্যাডার ও আস্থাভাজনদের বসানো। এসব মৌলিক জায়গাতেই নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে রাখা হয়েছে। সরকার যখন বলে তারা জুলাই সনদ মানবে, তার আড়ালে আসলে ওই গুরুত্বপূর্ণ ভিন্নমতগুলো বাদ দিয়ে বাকি অগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো মানার কৌশল করা হচ্ছে। অথচ ১৩ নভেম্বর ও ২৫ নভেম্বরের রাষ্ট্রপতির আদেশ ও অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে যে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেখানকার ব্যালটে দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ কোনো প্রকার ‘নোট অব ডিসেন্ট’ ছাড়াই ৮৪টি মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে একছত্র ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে। ফলে রাজনৈতিক দলীয় ভিন্নমতের চেয়ে পাঁচ কোটি মানুষের গণভোটের রায়ের আইনি ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকার বেশি।
তিনি আরো বলেন, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের বদলে সংসদে বিশেষ কমিটি গঠনের মাধ্যমে কেবল সামান্য ‘সংবিধান সংশোধন’ (অ্যামেন্ডমেন্ট) করে কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে বিএনপি ও ক্ষমতাসীন অংশ। কিন্তু দেশের মানুষ চেয়েছে আমূল ‘সংস্কার’ (রিফর্ম) যা পুরো ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার প্রশাসনিক ও ফিলোসফিক্যাল কাঠামোকে উপড়ে ফেলে নতুন রাজনীতির জন্ম দেবে। গণভোটের এই রায়কে এড়িয়ে আংশিক পথ বেছে নিলে তা জুলাই অভ্যুত্থানের হাজারো শহীদের রক্তের সাথে প্রতারণা করা হবে বলে তিনি সতর্ক করেন।
আইনি বিশ্লেষণ ও মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন
অনুষ্ঠানের শুরুতে ‘গণভোটের ফলাফল : আইনি বাধ্যবাধকতা, বাস্তবায়ন রূপরেখা, সঙ্কট ও আইনজীবী সমাজের ভূমিকা’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট ব্যারিস্টার মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন।
আইনি বিশ্লেষণে ব্যারিস্টার বেলায়েত হোসেন স্পষ্ট করেন যে, গণ-অভ্যুত্থান ও জুলাই আদেশের আইনি ও রাজনৈতিক ভিত্তি হলো জনগণের অভিপ্রায়। তিনি বলেন, সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের আলোকে আপিল বিভাগের পরামর্শমূলক এখতিয়ারের সাথে এটিকে গুলিয়ে ফেলা ভুল। এটি কোনো বিশুদ্ধ আইনি প্রশ্ন নয়, বরং একটি রাজনৈতিক সমঝোতা। তাই ১০৬ অনুচ্ছেদের প্রয়োগ এখানে অবান্তর।
তিনি আরো উল্লেখ করেন, সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদের সংজ্ঞা অনুযায়ী আইনসম্মত কর্তৃপক্ষ বা রাষ্ট্রপতির যেকোনো ‘আদেশ’ আইনের মর্যাদা বহন করে। ফলে রাষ্ট্রপতির ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫’ আইনত সংবিধিবদ্ধ এবং এর সাংবিধানিক বৈধতা স্বতঃসিদ্ধ। উপরন্তু হাইকোর্ট বিভাগে রিট পেন্ডিং থাকা সত্ত্বেও আইনের সাংবিধানিক বৈধতার অনুমান বহাল থাকে। তাই বর্তমান সংসদ ও সরকার গণভোটের রায় ও এই আদেশ মানতে আইনত বাধ্য।
প্রবন্ধে আক্ষেপ প্রকাশ করে বলা হয়, সম্প্রতি জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি কর্তৃক অন্তর্বর্তী সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো বিলুপ্ত করা একটি চরম দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। বিশেষ করে ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ-২০২৫’, ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ-২০২৫’, ‘দুর্নীতি দমন কমিশন অধ্যাদেশ’ এবং ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ’ বাতিল করে পুরনো নিয়ন্ত্রণমূলক শাসনব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের বিষয়ে তিনি বলেন, যদিও সংসদ সচিবালয় সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল করেছে, তথাপি সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক প্রদত্ত ১২৫ পৃষ্ঠার ঐতিহাসিক রায়ে ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করা হয়েছে। অর্থাৎ অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত করা এবং তিন মাসের মধ্যে স্বাধীন সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা সরকারের জন্য আইনত বাধ্যবাধকতা। ব্যারিস্টার বেলায়েত আরো বলেন, জুলাই আদেশের আলোকে ১৮০ দিনের জন্য ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন না করে সাধারণ সংসদে বিশেষ সংশোধন কমিটি করা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তিনি আইনজীবীদের সমাজ বিনির্মাণের প্রকৌশলী হিসেবে ন্যায়বিচার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন সরকারের সভাপতিত্বে সেমিনারে জুলাই অভ্যুত্থানে হতাহতদের বিচার প্রক্রিয়া ধীরগতিতে চলায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। লইয়ার্স কাউন্সিলের সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ বিচার বিভাগ ও রাজস্ব খাতের প্রয়োজনীয় সংস্কার না করে আইন বাতিল করার তীব্র সমালোচনা করেন।
সেমিনারে অন্যান্যের মধ্যে আরো বক্তব্য রাখেন সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাসেম (আরমান), ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান, সিনিয়র অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির ও অ্যাডভোকেট ড. গোলাম রহমান ভূঁইয়াসহ সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।