ইসলামী শাসনব্যবস্থা : সামাজিক পরিবেশ
Printed Edition
জাফর আহমাদ
ইসলামী শাসনব্যবস্থা মানে আল কুরআনের শাসনব্যবস্থাকে বলে। পৃথিবীতে কুরআন এসেছিল মানুষকে শাসন করার জন্য; কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে, কুরআন অনুযায়ী আমরা আমাদের ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনা করার চেষ্টা করিনি। ফলে কুরআনের সুফল থেকে আমরা বরাবরই বঞ্চিত হয়ে এসেছি। আল কুরআন পৃথিবীর এমন একটি নিয়ামত যা অবিকৃত ও কোনো প্রকার পরিবর্ধন ও পরিমার্জন ছাড়াই হুবহু আজও আমাদের কাছে আছে। কিন্তু এ থেকে কোনো শিক্ষা আমরা গ্রহণ করি না। ফলে আল্লাহর এ বাণীর কার্যকর ফলাফল আমরা স্বচক্ষে দেখতে পাই না। এই কারণেই আমাদের বিশ^াস হয় না যে, কুরআন অনুযায়ী সমাজ ও রাষ্ট্র চলতে পারে। চলুন, আল কুরআনের কিছু বাস্তব ফলাফল দেখে আসি।
যারা হজে গিয়েছেন তারা সৌদি আরবে দেখে এসেছেন আল কুরআনের দু-তিনটি আইনের কার্যকারিতা। সেখানকার শাসকগোষ্ঠী ব্যক্তিগত জীবন যেমনই হোক; কিন্তু ইসলামের কিছু আইন বাস্তবে প্রয়োগ থাকায় সেখানকার সামাজিক অবস্থা এতটাই উন্নত যে, বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় তা অধিক উত্তম।
১. চুরির শাস্তি আইন : আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘চোর পুরুষ বা নারী যেই হোক না কেন, উভয়ের হাত কেটে দাও। এটি তাদের কর্মফল এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। আল্লাহর শক্তি সবার ওপর বিজয়ী এবং তিনি জ্ঞানী ও সর্বজ্ঞ’ (সূরা মায়িদা-৩৮)। সৌদি আরবে এই আইন বাস্তবে প্রয়োগ আছে বলেই সেখানে চুরি হয় না। তাই বলে সৌদি সমাজের রাস্তায় বের হলে এমনটি দেখা যায় না যে, অধিকাংশ মানুষের হাত নেই, চুরির কারণে রাস্তায় অহরহ এক হাতওয়ালা মানুষের দেখা মেলে; বরং এর সুফল হলো-কোটি কোটি টাকার গাড়ি রাস্তায়, মাঠে-ময়দানে খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে। উল্লেখ্য, সৌদিতে কারো বাড়িতে ব্যক্তিগত বা বাণিজ্যিক কোনো গ্যারেজ নেই, চোরের ভয়ে গ্যারেজ দরকার পড়ে। অরক্ষিত গাড়িগুলোর ছোট্ট একটি যন্ত্রাংশও চুরি হয় না। কোনো প্রকার পকেটমার ও ছিনতাই নেই। এমনটিও পাবেন না যে দেশের কোটি কোটি টাকা চুরি করে বিদেশে পাচার করে দেয়।
মনে রাখতে হবে, চুরির আইনটি বাস্তবায়নের আগে সরকারকে অবশ্যই প্রতিটি নাগরিকের খাদ্য চাহিদা পূরণ করতে হবে। এর পরও যদি কোনো মানুষ তার পেটের ক্ষুধা নিবারণ হওয়ার পর চুরি করে, তার ওপর এই আইন কার্যকর হবে। হজরত আয়েশা রা: একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। তাতে বলা হয়েছে-‘তুচ্ছ ও নগণ্য বস্তু চুরির অপরাধে নবী সা:-এর আমলে হাতকাটা হতো না।’ হজরত উমর ও আলী রা: বায়তুল মাল থেকে কেউ কোনো বস্তু চুরি করলে তার হাত কাটেননি। এ ব্যাপারে কোথাও সাহাবায়ে কেরামের কোনো মতবিরোধের উল্লেখ নেই। এসব মৌল উৎসের ভিত্তিতে ফিকাহর বিভিন্ন ইমাম কিছু নির্দিষ্ট বস্তু চুরি করার অপরাধে হাত কাটার দণ্ড না দেয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। ইমাম আবু হানিফা রহ:-এর মতে, শাকসবজি, ফল, গোশত, রান্না করা খাবার, যে শস্য এখনো স্তূপীকৃত করা হয়নি এবং খেলার সরঞ্জাম ও বাদ্যযন্ত্র চুরি করলে হাত কাটার শাস্তি দেয়া হবে না। এ ছাড়াও তিনি বিচরণকারী পশু ও বায়তুল মালের জিনিস চুরি করলে তাতে হাত কাটার শাস্তি নেই বলে ঘোষণা করেছেন। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, এসব চুরির অপরাধে তার ওপর সাধারণ শাস্তি কার্যকর হবে না; বরং এর অর্থ হচ্ছে- এ অপরাধগুলোর কারণে হাত কাটা হবে না।
১. কিসাস বা হত্যার আইন : আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের হত্যার ব্যাপারে কিসাসের বিধান দেয়া হয়েছে। স্বাধীন ব্যক্তি হত্যা করে থাকলে তার বদলায় ওই স্বাধীন ব্যক্তিকেই হত্যা করা হবে, দাস হত্যাকারী হলে ওই দাসকেই হত্যা করা হবে, আর নারী এই এই অপরাধ সংঘটিত করলে সেই নারীকে হত্যা করেই এর কিসাস নেয়া হবে। তবে কোনো হত্যাকারীর সাথে তার ভাই যদি কিছু কোমল ব্যবহার করতে প্রস্তুত হয় তাহলে প্রচলিত পদ্ধতি অনুযায়ী রক্তপণ দানের ব্যবস্থা হওয়া উচিত এবং সততার সাথে রক্তপণ আদায় করা হত্যাকারীর জন্য অপরিহার্য। এটি তোমাদের রবের পক্ষ থেকে দণ্ড হ্রাস ও অনুগ্রহ। এরপরও যে ব্যক্তি বাড়াবাড়ি করবে তার জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি’ (সূরা মায়িদা-১৭৮)। আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, ‘হে বুদ্ধি-বিবেকসম্পন্ন লোকেরা! তোমাদের জন্য কিসাসের মধ্যে জীবন রয়েছে। আশা করা যায়, তোমরা এই আইনের বিরুদ্ধাচরণ করার ব্যাপারে সতর্ক হবে’ (সূরা মায়িদা-১৭৯)।
আপাত দৃষ্টিতে হত্যার পরিবর্তে হত্যা একটি অমানবিক বিষয় মনে হয়; কিন্তু একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, এতে বহু মানুষের জীবন রক্ষার মহৌষধ রয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে খুনাখুনিতে নিহতের হার সৌদির সাথে তুলনা করলে অনেক বেশি। সৌদিতে এ সংখ্যা খুবই নগণ্য। কারণ সৌদিতে আজও কুরআনের কিসাস আইনটি বলবৎ রয়েছে। যারা এই আইনের বিরোধিতা করেন তারা জাহেলি চিন্তা ও কর্মের মধ্যে ডুবে আছে। জাহেলিয়াতপন্থীদের একটি দল যেমন প্রতিশোধ গ্রহণের প্রশ্নে এক প্রান্তিকতায় চলে গেছে, তেমনি আরেকটি দল ক্ষমার প্রশ্নে আর অন্য এক প্রান্তিকতায় চলে গেছে এবং প্রাণদণ্ডের বিরুদ্ধে তারা এমন জবরদস্তি প্রচারণা চালিয়েছে, যার ফলে অনেক লোক একে একটি ঘৃণ্য ব্যাপার মনে করতে শুরু করেছে এবং দুনিয়ার বহু দেশ প্রাণদণ্ড রহিত করে দিয়েছে। ফলে সে সব দেশে মানুষের জীবন বেশি সস্তা হয়ে গেছে। কুরআন এ প্রসঙ্গে বুদ্ধি-বিবেকসম্পন্ন ব্যক্তিদের সম্বোধন করে তাদেরকে এই মর্মে সতর্ক করে দিচ্ছে, কিসাস বা প্রাণ হত্যার শাস্তিস্বরূপ প্রাণদণ্ডাদেশ ওপর সমাজের জীবন নির্ভর করছে। মানুষের প্রাণের প্রতি যারা মর্যাদা প্রদর্শন করে না তাদের প্রাণের প্রতি যারা মর্যাদা প্রদর্শন করে সে মূলত জামার আস্তিনে সাপের লালন করছে। তারা মূলত একজন হত্যাকারীর প্রাণ রক্ষা করে অসংখ্য নিরপরাধ মানুষের প্রাণ সঙ্কটাপন্ন করে তুলেছে। কিসাস আইন বাস্তবায়ন হলে সমাজ থেকে খুনখারাবি সম্পূর্ণ উঠে যাবে। ফলে হাজার হাজার মানুষের প্রাণ বেঁচে যাবে। সামাজিক নিরাপত্তা বহুলাংশে বেড়ে যাবে।
৩. রজম আইন বা পাথর নিক্ষেপে মৃত্যুদণ্ড : কোনো সমাজে রজম এই আইনটি বাস্তবায়িত হলে সে সমাজ থেকে জিনা, ব্যভিচার, নারী হাইজ্যাকের মতো কোনো ঘটনা সমূলে নির্মূল হবে। সৌদি আরবে এই আইনটি বাস্তবায়িত থাকায় সেখানে নারী হাইজ্যাক হয় না এবং জিনা-ব্যভিচার নেই বললেই চলে। এটি ইসলামী শরিয়তে নির্ধারিত একটি ফৌজদারি দণ্ডবিধি। যা কোনো বিবাহিত নারী বা পুরুষের ওপর প্রযোজ্য হয়, যখন বিচারক বা আদালতের সামনে যথাযথ প্রমাণসহ উভয়ের ব্যভিচার প্রমাণিত হয়। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা: থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, যেখানে হজরত উমার ইবনে খাত্তাব রা: উল্লেখ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সা:-কে সত্য দ্বীনসহ পাঠিয়েছেন এবং তার উপর কিতাব (কুরআন) অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহর নাজিলকৃত বিষয়ের মধ্যে আয়াতুর রজম রয়েছে। তা আমরা পাঠ করেছি, স্মরণ রেখেছি এবং হৃদয়ঙ্গম করেছি। সুতরাং রাসূলুল্লাহ সা: ব্যভিচারের জন্য রজম করার হুকুম বাস্তবায়ন করেছেন। তার পরবর্তী সময়ে আমরাও রজমের হুকুম বাস্তবায়িত করেছি। আমি ভয় করছি, দীর্ঘদিন অতিক্রান্ত হওয়ার পর কেউ এ কথা হয়তো বলবে, আমরা আল্লাহর কিতাবে রজমের নির্দেশ পাই না। তখন আল্লাহ কর্তৃক নাজিলকৃত এ ফরজ কাজটি পরিত্যাগ করে তারা মানুষদেরকে পথভ্রষ্ট করে ফেলবে। নিশ্চয়ই আল্লাহর কিতাবে বিবাহিত নর-নারীর ব্যভিচারের শাস্তি (রজম)-এর হুকুম সাব্যস্ত। যখন সাক্ষ্য দ্বারা তা প্রমাণিত হয়, কিংবা গর্ভবতী হয় অথবা সে নিজে স্বীকার করে (মুসলিম-৪৩১০, আন্ত, নাম্বার-১৬৯১ কিতাবুল হুদুদ, বাবু রজবু ছাইয়েবি ফিজ জিনা, ই. ফা:-৪২৭১, ই. সে:-৪২৭১, হাদিসটি সহিহ, হাদিসে উল্লিখিত কুরআনের আয়াতটি তিলাওয়াত মনসুখ বা রহিত হয়ে গেছে; কিন্তু আয়াতটির হুকম বলবৎ রয়েছে)।
৪. সালাত প্রতিষ্ঠা : আল কুরআন বলছে, ‘নিশ্চয় সালাত মানুষকে ফাহেশা ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে।’ সমাজে সালাত কায়েম হলে, খারাপ ও ফাহেশা কাজ কমে যাবে। সালাত যখন কায়েম হয়, তখন সালাতের আজান হওয়ার সাথে সাথে সব দোকানপাট বন্ধ হয়ে যাবে। সবাই সালাতের পানে ছুটে চলে যাবে। সৌদি আরবে এই আইনটি বলবৎ থাকায় আজান হওয়ার সাথে সাথে সালাতে ছুটে চলে। অর্থাৎ- সেখানে এখনো সালাত কায়েম রয়েছে। ফলে রাস্তাঘাটে, বাজার ও মার্কেটে আমাদের দেশের মতো বেলেল্লাপনা নেই, দোকান বা কোনো প্রতিষ্ঠানে আমাদের দেশের মতো কোনো গান-বাজনা বাজছে না। দু-একজন নারী রাস্তাঘাটে পাওয়া গেলেও অত্যন্ত শালীনতার সাথে পথ চলছে, কেউ তাদের উত্ত্যক্ত করছে না।
এ ছাড়া সেখানে সামাজিক পরিবেশ আমাদের তুলনায় অনেক সুস্থ। রাস্তাঘাটে সন্ত্রাস, বেলেল্লাপনা, ছিনতাই ও খুনখারাবি নেই বললে চলে। কারণ হলো- ক্রমাগত আল্লাহর দু-একটি হুকুম বলবৎ থাকায় সেখানে অন্যান্য অপকর্ম থেকে মানুষ পবিত্র থাকে। যেহেতু সালাত মানুষকে ফাহেশা কাজ থেকে বিরত রাখে; সেহেতু সেখানকার মানুষ খারাপকে ঘৃণা করে। কারণ সেখানে সালাত পুরোপুরি কায়েম আছে। এটি সালাতের সুফল। সুতরাং হে আমার জাতি! রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা হলে একটি সুন্দর সমাজ উপহার পাবো।
লেখক : প্রাবন্ধিক