পাকিস্তানে বাঙালি : চোখে স্বপ্ন; মনে হতাশা

Printed Edition

বাঙালি চাঁদেও বুঝি পাততাড়ি গেড়েছে! হাস্যরসে ভরা উক্তি হলেও বিষয়টি হয়তো একেবারে উড়িয়ে দেয়ার নয়। সেই আদিকাল থেকে বঙ্গোপসাগরের তটভূমিতে জড়ো হয়েছে সুদূর আফ্রিকার কালা আদমি। একে একে অস্ট্রিক, অনার্য, আর্য, দ্রাবিড়, মঙ্গোলিয়সহ আরো অনেকে আপসে মিশে গেছে, গড়েছে আবাসস্থল এ মাটিতে। এরা তাই শর্করা; মেধাবী। এরাই বাঙালি।

বিশ্বময় ছিটিয়ে এরা। তবে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে এরা সংখ্যায় অধিক। পাকিস্তানের ভুখণ্ডেও সংখ্যায় ৩০ লাখের কম নয়। শুধু করাচিতেই আছে ১৩২টি কলোনি ওদের। বাকি ৬৮টির মতো সিন্ধুর বাদিনে, হায়দ্রাবাদে, টান্ডু আদমে, এমনকি লাহোরেও।

’৭১-পূর্ব সময়ে প্রচুর শিক্ষিত বাঙালির উপস্থিতি থাকলেও বর্তমানে তা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। অনেকে হয়ত পরিচয়ের আড়ালে গা ঢাকা দিয়েছে। এখন যারা দৃশ্যমান তারা নিতান্ত গায়ে খাটা মানুষ। প্রত্যুষে নিয়ত বউ-ঝিরা বাসাবাড়িতে কর্ম দিতে দৌড়ে চলে- এ যেন পরান্ন পালিত মেয়েদের উদ্বিগ্নতায় ছুটন্ত মিছিল। আরো স্যাঁতসেঁতে পচা গলিপথ পেরিয়ে পুরুষরা অগ্রে ধায়। সে এক দৃশ্য। যেন সম্পূর্ণ বাঙালি হাওয়ায় পুষ্ট। সে বাতাসে যেন সুর মেলে দূর বাংলাভূমির আত্মীয়দের আনন্দ উচ্ছ্বাসের।

উল্লিখিত মিছিলে যারা পদাতিক সৈনিক ওদেরকে বলা হয় ’মাসি’। শরীর ঘামিয়ে কাজ করে ওরা পর ঘরে। ঠুনকো কাজের বাহানায় ফেরে ঘর থেকে ঘরে। ওতেই ওরা যেন খুশি। ওতেই নাকি ভালো পড়তা হয়। দিনে সাত-আট ঘরে কাজ করা নাকি কোনো বিষয় নয়। ওদের কাজ হলো মাজাঘষা, ঝাড়পোছ, কাপড়কাচা ও ডাস্টিং করা। কেউ কেউ আবার হেঁসেল সামলায়। দিন শেষে কেউ কেউ উচ্ছিষ্ট খাবারের ঠোঙা হাতে ঘরে ফেরে। তা দিয়েই সারে নৈশভোজের প্রয়োজন। আর ব্যাটারা পর ঘরে খানসামা বনে। বাগিচায় মালির কাজ করে অথবা বাংলোতে ড্রাইভারি। সমাজের উচ্চ ঘরে খানসামার কাজে ওদের কদর অনেক। বাঙালি খানসামা রাখা যেন একটা ফ্যাশন। খোঁজখবরে বেরিয়ে এসেছে- মন্ত্রী, সেক্রেটারি বা উচ্চ সরকারি কর্মকর্তাদের প্রায় ঘরেই বাঙালি কুক। এ ছাড়া মিল-কারখানাতেও ওরা কাজ করে, তবে কম বেতনে। শহরের আখের মেশিনগুলো প্রায় ওদের কব্জায়। রাস্তার ধারে টং দোকানে ওরা পান-সিগারেট, বিস্কুট নিয়ে বসে। ব্যবসা মন্দ নয়। আবার সাগরে মাছ ধরতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তাইতো লঞ্চে ছোটে। সপ্তাহ কাটিয়ে দেয় অথৈ পাথারে। বিশাল জলরাশির সাথে যেন ওদের যুগযুগান্তরের আত্মীয়তা। জলতরঙ্গে রাতদিন ওদের এক হয়ে যায়। জলধারার ভয়ঙ্কর ডিগবাজিও চেয়ে চেয়ে দেখে। হয়ত ক্ষণিকের জন্যে হারিয়ে যায় ওরা। ঘরণীর মায়াভরা মুখখানিও বুঝি মনে পড়ে না আর!

বলা বাহুল্য ’৭১-পূর্ব সময়ে করাচি থেকে বাংলায় খবর হতো। অফিস আদালতে বাঙালিদের উপস্থিতি ছিল। ইস্ট পাকিস্তান অ্যাসোসিয়েশন ও নজরুল একাডেমির চালক ছিল শিক্ষিত বাঙালিরাই। মর্যাদায় সংস্থা দুটো ছিল শীর্ষে। ওতে মেম্বারশিপ নেয়া ছেলেখেলার বিষয় ছিল না। করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ সগর্বে পতাকা উড়াত। যশোরের কৃতী সন্তান ড. আলী আহসান ছিলেন সেখানে শীর্ষে। তারই ভাই ড. আলী আশরাফ ছিলেন ইংরেজি বিভাগের প্রধান। তার নামই ছিল যথেষ্ট পরিচিত।

ঘটনাপ্রবাহে আজ আর সরকার কবীরউদ্দিনের সে সুমধুর স্বর রেডিওতে ধ্বনিত হয় না। ইস্ট পাকিস্তান অ্যাসোসিয়েশনের নামনিশানা মিটে গেছে কোনো বুড়িভাদরে। নজরুল একাডেমির সরকারি জীর্ণ ঘরের দরজার তালায় মরিচাধরা। নামীদামি জলসিক্ত বইগুলো উইপোকারা সদব্যবহার করেছে। একাডেমির চত্বরে হারমোনিয়ামের সুর আর রাঙারঙে আল্পনা আঁকা পায়ে ঘুঙুরের কিংকিনি চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেছে। ঘনশ্যাম পরিচালিত রিদমিক আর্ট সেন্টার আর নেই। ওখানে নাচতে গাইতে দেখা যেত সোসাইটির সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়ে বউদের। ইয়োগা শিখতেও আসতেন ওরা। অনিবার্য কারণে জেনারেল জিয়াউল হকের আমলে ঘনশ্যাম পরিবার চিরতরে হারিয়ে যায়। ঘনশ্যাম পরে আমেরিকায় মারা যান।

অন্য দিকে বাংলাদেশের অর্থনীতির খাস্তা হালকে উপাদ্য করে নানা অপবাদ ও কুৎসা রটেছে। পাকিস্তানের অনেকে তাতে তাল দিয়েছে। কিন্তু আজ পট পালটিয়েছে। বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াতে শিখেছে। পাক জনগোষ্ঠীর মানসিকতায় তাই নতুন মোড় এসেছে। বসবাসরত ৩০ লাখ বাঙালির প্রতি বহমান ঈর্ষা হঠাৎ প্রেমজলে পবিত্র হয়ে উঠছে। পিছে সঙ্গত কারণও আছে। এখন যা বাকি তার সাথে দেশের চালকদেরই সম্পৃক্ততা। ভবিষ্যতেই এর জবাব মিলবে।

এটা সর্বজনজাত যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা লগ্নে বাঙালি জনগোষ্ঠী সদলবলে করাচি বিমানবন্দর হয়ে স্বদেশে ফেরে। কিন্তু ’৭৫-উত্তর দিনগুলোতে অনিবার্য কারণে আবারো তাদের ঢল নামে। বাগানপথে ভারত পেরিয়ে সে ঢল করাচি গিয়ে থামে। এর পর কেটে গেছে অনেক বছর। পদ্মার পানি যেন উল্টোরথে চেপে সিন্ধুতে নেমেছে। কখনো বা তারা পুলিশি হয়রানির শিকার হয়; কখনো বা যুবতী বিক্রির হিড়িক চলে। মোদ্দা কথায় তারা বিদেশী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়। অবস্থার কোনো পরিবর্তন নেই আজও; যদিও ইমরান খানের আশার বাণীতে বুক বেঁধেছিল তারা। যা হোক, বাঙালি এ’জনগোষ্ঠী নিজেদেরকে পাকিস্তানি হিসেবে ভাবে। এখানকার গণমানবের কিন্তু তাতে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। শুধু সিন্ধুভিত্তিক পিপলস পার্টিতে যত ক্ষোভ, যত রোষ। কারণ সিন্ধিরা করাচিতে সংখ্যালঘিষ্ঠ। তারপর বাঙালিদের সংযোজন পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে করবে, এটা তারা বোঝে। নিজ প্রাদেশিক রাজধানীতে কর্তৃত্ব হারাবে। তাই তো বেনজির সরকারের আমলে বাঙালি খেদাও অভিযান চলে; কিন্তু বিশেষ মহলের হস্তক্ষেপে শেষমেশ সরকার সিদ্ধান্ত বাতিল করতে বাধ্য হয়।

বর্তমান নব্য বাঙালি প্রজন্ম এখানে ঠিকমতো বাংলা বলতেও পারে না। তারা বলে, বাংলাদেশের সাথে তাদের কোনো লেনদেন নেই। করাচির মাটিতে জন্মে তারা বড় হয়েছে। তবুও বিদেশী তমঘা তাদের বুকে ঝুলছে। এ নিয়েই তাদের চলাফেরা।

করাচির যেসব বস্তিতে তাদের পদচারণা তাদের মধ্যে কয়েকটি সুপরিচিত নামের তালিকায় প্রথম সারিতে রয়েছে মুছা কলোনি। এটি পুরনো এক জনবসতি। সেই কবে পাকিস্তান আমলে লতাপাতা আদৃত ঘরবাড়ি নিয়ে তৈরি হয়েছিল এ আবাসস্থল। ’৭১-এর এর টেনশনের শিকারে তা ভস্মীভূত হয়েছিল। আজ সেখানে আধাপাকা ঘরবাড়ির সমারোহ। বাঙালিদের সাথে অবাঙালিদেরও বসবাস সেখানে। এখানে মাছ, শাকসবজির বড় বাজার বসে। দূর-দূরান্ত থেকে ক্রেতাদের ঢল নামে, বিশেষ করে রোববার ছুটির দিনে। বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনের লোকজনকেও দেখা যায় সেখানে। এখানে দেখা মেলে সবজি ব্যবসায়ী আমিরের সাথে। তিন ভাই মিলে কাঁচামাল বেচে ওরা। বাবা রাতে সবজিমণ্ডি ভাজে, তাই রাতের ঘুম দিনে পুষিয়ে নেয়। ওদের ভাষ্যমতে, জিনিসের দাম চড়া, কমবার কোনো লক্ষণ নেই। গ্রাহক হিমশিম খায়। দামাদামি করে, বুঝেসুজে কেনে। লাভের অঙ্ক তাই আগের মতো নেই।

দোকানে ওদের থরে থরে সাজানো কাঁচকলা, কচুরলতি, বাংলাদেশী লাউ, মুখিকচু, বরবটি, পুঁই, উস্তে আরো কত কী। ক্রেতাদের ভিড়ও চোখে পড়ার মতো। পাশের দোকানে দেখি সিদ্ধচাল। এটি শুধু এখানেই মেলে।

নিকটেই দেখা পেলাম আলম ভাই মসলাওয়ালার। দোকানে তার থরে থরে সাজানো শুধুই বাংলাদেশী পণ্য। উত্তরে সে জানায়, বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা মধ্যপ্রাচ্য হয়ে বয়ে এনে সরবরাহ দেয় ৪০টি ভিন্ন দেশের মালামাল। সাবান, স্নো, পাউডার, কদুর তেল, গুড়, মুড়ি, লুঙ্গি, গামছাসহ রকমারি আইটেম। সেগুলো চড়াদামে বিক্রি হয় এখানে। কারণ যাতায়াত বাবদ খরচা প্রচুর। পথে কাস্টমের আড়াআড়ি, ব্যবসায়ীর লভ্যাংশ; তদুপরি তারও আয়ের বিষয় জড়িত। তবে তার বিশ্বাস সরাসরি বিমান চালু হলে দ্রব্যমূল্য কমবে। তার মতে, বাংলাদেশী খুশবুমাখা সামগ্রীর মানই আলাদা। তাই বাড়তি মূল্যের বিষয়টি কাউকে তেমন উত্ত্যক্ত করে না।

চলার পথে আরো কথা হয় মাছের দোকানে। নাম তার মোহাম্মদ আলি। মাছের ব্যবসা তার। সিন্ধুর থাট্টা থেকে মাছ আনে, বেচে লোকাল মার্কেটে। মিষ্টি পানির মাছ। বেশ জমজমাট ব্যবসা তার। রুই, কাতলা, ঝাটি ইলিশসহ পাবদা, টেংরা, চিংড়ি, তেলাপিয়া আরো রকমারি মাছের সমাহার। মুহূর্তে আঁচড়িয়ে, কেটেকুটে গ্রাহকদের হাতে ধরিয়ে দেয় সে। চেষ্টা করে আঙিনা সাফ রাখতে; কিন্তু বরফগলা পানি আর আঁশ্টের ঢের ঠেলে কতটাই বা সম্ভব সেটি। এক প্রশ্নের জবাবে রফিক মিয়া জানায়, ১০-১৫ শতাংশ লাভে তারা কেনাবেচা করে। তবে অন্য সূত্রের দাবি- ৫০ শতাংশের কম মুনাফায় কেউ ব্যবসা করে না।