ট্রাম্পের শুল্ক ক্ষমতা হ্রাসে বিশ্ব বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা

Printed Edition
onno-1
ট্রাম্পের শুল্ক ক্ষমতা হ্রাসে বিশ্ব বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা

আলজাজিরা ও রয়টার্স

  • রায়কে স্বাগত জানালেও অর্থনৈতিক প্রভাব খতিয়ে দেখছে কিছু দেশ
  • রায়ে চটেছেন ট্রাম্প, বিচারপতিদের ‘ব্যক্তিগত আক্রমণ’

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের ক্ষমতা সীমিত করার ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে। আদালত বলেছে, প্রেসিডেন্ট তার সাংবিধানিক ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছেন। রায়ের পরপরই ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ ঘোষণা দেন যে তিনি একটি নির্বাহী আদেশে বিশ্বব্যাপী ১০ শতাংশ নতুন শুল্ক আরোপ করেছেন, যা ‘প্রায় সাথে সাথে’ কার্যকর হবে।

এই সিদ্ধান্তে বিশ্বজুড়ে নতুন করে বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন দেশ তাদের বিদ্যমান বাণিজ্য চুক্তি, বিনিয়োগ পরিকল্পনা ও শিল্প খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনি কাঠামো স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত বৈশ্বিক বাজারে অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকতে পারে।

দক্ষিণ কোরিয়া জানিয়েছে, তারা সম্প্রতি স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তি পুনর্বিবেচনা করবে। ওই চুক্তিতে শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছিল, বিনিময়ে দক্ষিণ কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রে ৩৫০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কেমিক্যাল, ফার্মাসিউটিক্যাল ও সেমিকন্ডাক্টর খাতে নতুন রায় ইতিবাচক হলেও গাড়ি ও ইস্পাত রফতানিতে উচ্চ শুল্ক বহাল থাকায় উদ্বেগ রয়ে গেছে।

ভারত ট্রাম্প প্রশাসনের পূর্ববর্তী শুল্কনীতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ভারতীয় পণ্যে ২৫ শতাংশ এবং রাশিয়ান তেল আমদানিতে অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে মোট ৫০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছিল। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত একটি অন্তর্বতী চুক্তি করেছে, যেখানে ভারতীয় রফতানিতে শুল্ক কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হয়েছে। তবে সমালোচকরা বলছেন, সুপ্রিম কোর্টের রায় আসার আগে চুক্তি করা ভারতের জন্য তাড়াহুড়া ছিল। এখন রায়ের ফলে চুক্তির আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

চীন তুলনামূলকভাবে সংযত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। বেইজিং বলেছে, ‘বাণিজ্য যুদ্ধ কারো জন্যই লাভজনক নয়।’ গত বছর থেকে চীন একাধিক স্তরের শুল্কের মুখে পড়েছে- কেমিক্যালে ১০ শতাংশ, বৈদ্যুতিক গাড়িতে ১০০ শতাংশ। নতুন রায়ের ফলে সামগ্রিক শুল্কহার প্রায় ৩৬ শতাংশ থেকে কমে ২১ শতাংশে নামতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। চীন ইতোমধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে বাণিজ্য বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এপ্রিল মাসে ট্রাম্পের সম্ভাব্য বেইজিং সফরকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

কানাডা সুপ্রিম কোর্টের রায়কে স্বাগত জানিয়েছে। তবে দেশটির বাণিজ্যমন্ত্রী ডমিনিক লেব্ল্যাঙ্ক বলেছেন, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও গাড়ির ওপর আরোপিত সেকশন ২৩২ শুল্ক বহাল থাকায় কাজ এখনো বাকি। আঞ্চলিক নেতারা আশাবাদী হলেও ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউডিয়া শেইনবাম জানিয়েছেন, তার সরকার রায়ের প্রভাব খতিয়ে দেখছে। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার হওয়ায় মেক্সিকো তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। উত্তর আমেরিকার যৌথ বাণিজ্য চুক্তি অনেক পণ্যকে শুল্কমুক্ত রেখেছে। তবে ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও গাড়ির যন্ত্রাংশে শুল্ক বহাল থাকায় মেক্সিকো সতর্কভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

এ দিকে সুপ্রিম কোর্টের রায় ঘোষণার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নজিরবিহীনভাবে ছয় বিচারপতির ওপর ব্যক্তিগত আক্রমণ চালান। তিনি বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ মত দেয়া বিচারপতিদের ‘চরমভাবে লজ্জিত’ হওয়া উচিত। হোয়াইট হাউজে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প অভিযোগ করেন, আদালত বিদেশী স্বার্থে প্রভাবিত হয়ে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি বিচারপতিদের পরিবারের প্রসঙ্গ টেনে এনে তাদের ভোটকে ‘লজ্জাজনক’ আখ্যা দেন।

ট্রাম্পের আক্রমণ রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় মনোনীত বিচারপতিদের লক্ষ্য করে ছিল। এমনকি তার নিজের মেয়াদে নিযুক্ত বিচারপতি নিল গোরসাচ ও অ্যামি কোনি ব্যারেটকেও ছাড় দেননি। তবে শুল্ক বহাল রাখার পক্ষে মত দেয়া তিন বিচারপতির প্রশংসা করেন তিনি।

মার্কিন আইন বিশেষজ্ঞ ফ্র্যাঙ্ক বোম্যান বলেছেন, এই রায় অর্থনৈতিক নীতির চেয়ে সাংবিধানিক সীমারেখা নিয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, ট্রাম্প গত এক বছরে আইন অমান্য করে শুল্ক আরোপ করেছিলেন। সুপ্রিম কোর্ট এবার স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, প্রেসিডেন্ট তার সাংবিধানিক ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছেন।

সুপ্রিম কোর্টের এই রায় বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন অধ্যায় খুলে দিয়েছে। এক দিকে দেশগুলো স্বস্তি পাচ্ছে অতিরিক্ত শুল্ক কমায়, অন্য দিকে ট্রাম্পের নতুন ১০ শতাংশ বিশ্বব্যাপী শুল্ক আবারো অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। একই সাথে বিচারপতিদের বিরুদ্ধে তার নজিরবিহীন আক্রমণ যুক্তরাষ্ট্রে আইনের শাসন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার ও কূটনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও আগামী মাসগুলোতে বড় ধরনের পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে।