মার্কিন প্রযুক্তি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে হামলার হুমকি
Printed Edition
আহমেদ ইফতেখার
সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গুগল, মেটা, অ্যাপলসহ ১৮টির বেশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে হামলার হুমকি দিয়েছে ্ইরানের সামরিক বাহিনী। ইরান সরকারের দাবি, এ প্রতিষ্ঠানগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং উচ্চ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইরানের নেতাদের অবস্থান শনাক্ত ও গুপ্তহত্যায় সহযোগিতা করছে।
এর আগে এক বিবৃতিতে আইআরজিসি জানিয়েছিল, ১ এপ্রিল স্থানীয় সময় রাত ৮টা থেকে এই মার্কিন প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর হামলা শুরু হতে পারে। কোনো অনাকাক্সিক্ষত প্রাণহানি এড়াতে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের এবং সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত কার্যালয় খালি করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
ইরানের এই হুমকিকে দেশটির সামরিক কৌশলের এক বড় ধরনের পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। আগে যেখানে শুধু সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু করা হতো, এখন সেখানে সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করা হলো। আইআরজিসি জানিয়েছে, যেহেতু লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ ও শনাক্তের মূল উপাদানগুলো মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর তৈরি, তাই এখন থেকে এই প্রতিষ্ঠানগুলো বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হবে। ইরানের এ তালিকায় ১৮টির বেশি প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মেটা (ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মূল প্রতিষ্ঠান), গুগল, অ্যাপল, মাইক্রোসফট, ইন্টেল, ওরাকল, এনভিডিয়া, ডেটা অ্যানালিটিকস ফার্ম প্যালানটিয়ার, বোয়িং ও টেসলা। ইরানের অভিযোগ, ইসরাইল ও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে গত কয়েক সপ্তাহে ইরানের সর্বোচ্চ নেতাসহ ২৫০ জনের বেশি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। নতুন করে যদি আর কোনো ইরানের নেতাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়, তবে এই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিণাম ভোগ করতে হবে। আইআরজিসি জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো দেশে থাকা এসব প্রতিষ্ঠানের এক কিলোমিটারের মধ্যে থাকা বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়া উচিত। এরই মধ্যে বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অ্যামাজন এডব্লিউএসের ক্লাউড অবকাঠামো ড্রোন হামলার কারণে বিঘিœত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সাধারণত সামরিক বা কূটনৈতিক স্থাপনা হামলার লক্ষ্য হলেও, এবারই প্রথম সরাসরি বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে সামরিক হামলার আওতায় আনার কথা বলা হলো।
যুদ্ধে ইরানের তৈরি সস্তা ড্রোনের ব্যাপক সাফল্য গুগলের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এরিক শ্মিটের দেওয়া পুরোনো পরামর্শকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর শ্মিট বলেছিলেন, মার্কিন সেনাবাহিনী ট্যাংক বা বিমানবাহী রণতরির মতো বিশাল ও ব্যয়বহুল প্রচলিত যন্ত্রাংশে অতিরিক্ত বিনিয়োগ করছে। এর বদলে ড্রোন কেনায় মনোযোগ দেয়া উচিত। শ্মিট তখন স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ অতি ব্যয়বহুল অস্ত্রের মধ্যে নয়, গণহারে উৎপাদিত সস্তা ড্রোনের মধ্যে নিহিত। তিনি মার্কিন সামরিক বাহিনীকে তাদের অগ্রাধিকারগুলো পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি পড়েছি, যুক্তরাষ্ট্রের হাজার হাজার ট্যাংক কোথাও জমা করা আছে। সেগুলো বিলিয়ে দিন। তার বদলে ড্রোন কিনুন।’ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথ সামরিক আগ্রাসন শুরু করে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র। এমন এক সময়ে এই হুমকি এল যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে যুদ্ধ বন্ধের জন্য কূটনৈতিক তৎপরতার কথা বলছেন, আবার অন্যদিকে ইরানবিরোধী অভিযান আরো জোরদার করার হুমকি দিচ্ছেন। ইরান যুদ্ধে চলছে নতুন ধরনের সাইবার হামলা। ইরান-সংশ্লিষ্ট হ্যাকাররা গত কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে প্রায় ৫ হাজার ৮০০টি সাইবার হামলা চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নিরাপত্তা সংস্থা ডিজিসার্টের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫০টি ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠী এসব হামলার পেছনে কাজ করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হ্যাকারদের বিরুদ্ধেও সাইবার হামলার অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে ডিজিসার্টের ফিল্ড চিফ টেকনোলজি অফিসার মাইকেল স্মিথ বলেন, এগুলো আসলে একধরনের ভীতি প্রদর্শনের কৌশল।
এর মাধ্যমে তারা বোঝাতে চায় যে ভিন্ন মহাদেশে থাকলেও তারা আপনার নাগালের বাইরে নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই হ্যাকারদের কাজকে অনেক বেশি গতিশীল এবং স্বয়ংক্রিয় করে তুলেছে। বিশেষ করে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াতে এআইয়ের ভূমিকা এখন প্রশ্নাতীত। সম্প্রতি ইরানের হামলায় মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ডুবে যাওয়ার একটি ডিপফেক ছবি ছড়িয়ে পড়ে অনলাইনে। বাস্তবে না ঘটলেও ইতিমধ্যে ১০ কোটির বেশি মানুষ ছবিটি দেখেছে।