জুলাই জাদুঘরে প্রথম দিন

শহীদের রক্তস্নাত স্মৃতি ছুঁয়ে স্বজন জনতার কান্না

Printed Edition
first-4
গণভবনে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করছেন দর্শনার্থীরা : নয়া দিগন্ত

আবূল কামাল

খুলে দেয়ার প্রথম দিনেই জুলাই জাদুঘরের স্মৃতির দেয়ালে শহীদদের ক্ষতবিক্ষত রক্তস্নাত স্মৃতি ছুঁয়ে অঝোরে কাঁদলেন স্বজন ও দর্শনার্থীরা। দুই বছর পর রূপস্মৃতির ক্যানভাসে জুলাই অভ্যুত্থানে গণহত্যার রক্তভেজা চিত্রের মুখোমুখি হয়ে কেউ আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। জাদুঘরে প্রদর্শিত রক্তঝরা দিনগুলোর আলোকচিত্র পুরো গণভবন প্রাঙ্গণে অশ্রুসিক্ত বেদনাবিধুর পরিবেশ তৈরি হয়।

জাদুঘরের গ্যালারিতে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে জুলাই বিপ্লবের বীর শহীদ আবু সাঈদ, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধসহ অসংখ্য ছাত্র-জনতার ব্যবহৃত ব্যক্তিগত পোশাক, চশমা, ডায়েরি ও শেষ স্মৃতিচিহ্ন। এগুলো দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন উপস্থিত দর্শনার্থীরা। শহীদদের স্বজনদের অনেকেই তাদের প্রিয় মানুষের ছবির সামনে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, আবার কেউ কেউ প্রিয়জনের স্মৃতি ছুঁয়ে অঝোরে কাঁদতে থাকেন। সাধারণ দর্শনার্থীরাও এই শোকাবহ পরিবেশ দেখে নিজেদের আবেগ ধরে রাখতে পারেননি।

সরেজমিন দেখা যায়, জাদুঘরের ভেতরের দেয়ালে দেয়ালে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে উত্তাল আন্দোলনের গ্রাফিতি, ডিয়োরামা এবং গণহত্যার বিভিন্ন চিত্রাবলি। ডিজিটাল স্ক্রিনে প্রদর্শন করা হচ্ছে স্বৈরাচারী সরকারের দমন-পীড়ন, গুম-খুন এবং সাধারণ মানুষের প্রতিরোধের ভিডিও ফুটেজ। স্বৈরাচারী শাসনের নির্মম নির্যাতন, গুম-খুন ও গণহত্যার প্রতীকী নিদর্শনগুলো দেখে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে স্বৈরশাসক হাসিনা ও তার সহযোগীদের বিচার চান।

কয়েকজন সাধারণ দর্শনার্থীর ভাষ্য, এটি কেবল একটি জাদুঘর নয়, এটি দেশের মুক্তিকামী মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের এক জীবন্ত দলিল। শহীদদের এই আত্মত্যাগ নতুন প্রজন্মকে আজীবন অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার অনুপ্রেরণা জোগাবে বলে তারা মন্তব্য করেন।

গতকাল বেলা ১১টায় দর্শনার্থীদের জন্য গেট খুলে দেয়া হয়। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের সাবেক গণভবনে অবস্থিত এ জাদুঘরে প্রথম দিনে ছিল দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড়। প্রথম দিনের ৯০০ টিকিট অগেই বিক্রি হয়ে যায়। অন্য দিকে সর্বসাধারণের প্রবল আগ্রহে ইতোমধ্যে আগামী ১০ আগস্ট পর্যন্ত চার দিনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শেষ হয়ে গেছে।

গতকাল র্নির্ধারিত সময়ের আগেই শত শত দর্শনার্থী জাদুঘরের সামনে ভিড় করেন। অন্য দিকে টিকিট না পাওয়া উৎসুক জনতার ভিড় সামলাতে প্রচণ্ড বেগ পেতে হয়।

কর্তৃপক্ষ জানান, দর্শনার্থীদের ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং সুশৃঙ্খলভাবে প্রবেশ নিশ্চিত করতে সময়ভিত্তিক অনলাইন টিকিট ব্যবস্থাপনা চালু করা হয়েছে। অন্য দিকে দর্শনার্থী প্রবেশে প্রতিদিন তিনটি সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথম বেলা ১১টা থেকে বেলা ১টা, এরপর বেলা ১টা ৩০ মিনিট থেকে বেলা ৩টা ৩০ মিনিট এবং সর্বশেষ বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা। এই সময়ের মধ্যে যেকোনো দর্শনার্থী তার চাহিদা অনুযায়ী সময় বাছাই করে ‘জুলাই ৩৬’ ওয়েবসাইটে নিবন্ধন করে অনলাইন টিকিট সংগ্রহ করতে পারবেন।

জাদুঘরে প্রবেশের টিকিটের মূল্য প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ৫০ টাকা এবং শিশুদের জন্য ২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া সার্কভুক্ত দেশের নাগরিকদের জন্য টিকিটের মূল্য ৫০০ টাকা এবং অন্যান্য দেশের নাগরিকদের জন্য দুই হাজার টাকা।

গতকাল বিকেলে জাদুঘরের অনলাইন টিকিটিং ওয়েবসাইট ঘুরে দেখা যায়, ৭ থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত তিনটি সময়সূচির সব টিকিট ‘সোল্ড আউট’ দেখানো হচ্ছে। একইভাবে ১৪ ও ১৫ আগস্টের সব টিকিটও বিক্রি শেষ। এ ছাড়া ১১, ১২ ও ১৩ আগস্টের বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার সময়সূচির টিকিটও আর পাওয়া যাচ্ছে না।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ইতিহাস সংরক্ষণে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নির্দেশনায় গণভবনকে এই জাদুঘরে রূপান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়। গত ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সাথে নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের দিনটি বিশেষ অতিথি এবং জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত ছিল।