মিরসরাইয়ে তুচ্ছ ঘটনায় বিএনপির ২ গ্রুপে সংঘর্ষ, ১ জনকে কুপিয়ে হত্যা
Printed Edition
মিরসরাই (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা
চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে ছুরিকাঘাতে তাহমিদ উল্যাহ (১৮) নামে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সদস্য নিহত হয়েছেন। গত বুধবার রাত ১টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এর আগে বুধবার সন্ধ্যায় বারইয়ারহাট পৌর বাজারে একটি দোকানে পায়ের উপর পা তুলে বসাকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সংঘর্ষের সময় তাকে ছুরিকাঘাত করা হয়। এ সময় সাত-আটজন আহত হয়।
তাহমিদ বারইয়ারহাট পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব হিঙ্গুলী এলাকার আলমগীর কোম্পানি বাড়ির বাসিন্দা বাসচালক আলমগীর হোসেন ও বিবি জহুরার একমাত্র ছেলে। তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সদস্য ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলন মিরসরাই উপজেলা শাখার যুগ্ম সদস্যসচিবের দায়িত্বে ছিলেন। এ ছাড়া দি রেড জুলাই মঞ্চের আহ্বায়ক, আপ বাংলাদেশ চট্টগ্রাম উত্তর জেলার সদস্য ও ধর্ষণ প্রতিরোধ মঞ্চের উদ্যোক্তা ছিলেন।
পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার সন্ধ্যায় হিঙ্গুলী ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব জুবায়ের বারইয়ারহাট পৌরসভার একটি দোকানে পায়ের উপর পা তুলে বসেছিলেন। এ সময় দোকানে আসেন বারইয়ারহাট পৌর বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম লিটন। তাকে দেখে জুবায়ের পা নামিয়ে না বসায় লিটন জুবায়েরকে লাথি মারেন। এরপর উভয়পক্ষের মধ্যে বাগি¦তণ্ডা শুরু হয়। পরে লিটন ও জুবায়ের নিজ নিজ এলাকা জামালপুর ও হিঙ্গুলীর লোকজন নিয়ে আসলে উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে তাহমিদসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। গুরুতর আহত তাহমিদকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে প্রথমে বারইয়ারহাট জেনারেল হাসপাতাল এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য চমেক হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ১টায় তার মৃত্যু হয়।
এ বিষয়ে মিরসরাই আসনে বিএনপির মনোনীত সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী নুরুল আমিন চেয়ারম্যান বলেন, তাহমিদের নিহত হওয়ার খবর শুনে আমরা সবাই শোকাহত। এই ন্যক্কারজনক হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানাই। হত্যার সাথে জড়িতদের কঠিন বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করাতে হবে। আমি নিশ্চিত করে বলছি একটা তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই গ্রামবাসীর মধ্যে সংঘর্ষের জেরে এই হত্যাকাণ্ড হয়েছে।
এদিকে একমাত্র ছেলে তাহমিদকে হারিয়ে তার মা বিবি জহুরা বিলাপ করে বলেন, ‘আমার পুতের খুনিরে আনি দে আমি তারে দেখতে চাই, জিজ্ঞাস করতে চাই। বিকেলে পরীক্ষা দিয়ে এসে ভাত খেয়ে ঘরে বসে মোবাইল টিপতেছে। বিকেল ৪টার দিকে একটা ছেলে তাকে ফোন দিয়ে বাইরে যাওয়ার জন্য ডাক দিলে সে বেরিয়ে যায়। আল্লাহ আজরাইল পাঠাইছে আমার ঘরে, আমার পুতেরে আমার থেকে লই যাইবেরগইরল্লাই।’ তিনি জানান, আহত হওয়ার পর অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেয়ার সময় তাহমিদকে অনেকবার জিজ্ঞেস করলেও কে মেরেছে সেটা সে বলতে পারেনি। এটাই ছিল শেষ কথা তার সাথে।
নিহতের বড় বোন ফারিহা আক্তার বলেন, আমার ভাই ছিল জুলাই যোদ্ধা। ২৪ সালের ৪ আগস্ট আন্দোলন করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছিল। সে সমাজের মানুষের উপকার করত। ২০২৪ সালে ফেনীতে ভয়াবহ বন্যার সময়ও সে কাজ করেছে। আমার ভাইটাকে নোংরা রাজনীতির লোকজন মেরে ফেলেছে। আমার ভাই একজন কুরআনের হাফেজ ছিল। আমাদের একমাত্র ভাইকে আমরা হারিয়ে ফেললাম। আমরা এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই।
তাহমিদের বাবা আলমগীর বলেন, ‘আমার একমাত্র ছেলেকে এভাবে মেরে ফেলল? ও তো কোনো দোষ করেনি। যদি দোষ করে থাকে, তাহলে আমি বিচার করতাম। শেষ করে দিতে হবে? আমি এখন কী নিয়ে বাঁচব। আমি ছেলে হত্যার বিচার চাই।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের চট্টগ্রাম উত্তর জেলার সংগঠক মোহাম্মদ সাইফুল হাওলাদার বলেন, তাহমিদ খান জুলাই যোদ্ধা এবং আন্দোলনের সামনের সারির সদস্য ছিল। ফেনী জেলা শহরে ছাত্র আন্দোলনের সময় তার পেটে পুলিশের গুলি লেগেছিল। তিনি দি রেড জুলাই মিরসরাই উপজেলার আহ্বায়ক ছিলেন এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ইউনাইটেড পিপলস বাংলাদেশের (আপ বাংলাদেশ) চট্টগ্রাম উত্তর জেলার সদস্য ছিলেন। তাকে এভাবে কুপিয়ে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানাচ্ছি আমরা।
বারইয়ারহাট পৌরসভা ছাত্রদলের সদস্যসচিব মোহন দে বলেন, তাহমিদ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সক্রিয় সদস্য ছিল। পরবর্তীতে বিভিন্ন সংগঠনে সে কাজ করেছে। কিছুদিন আগ থেকে সে আমার সাথে চলাফেরা করছে। ছাত্রদলের রাজনীতি করার মনস্থির করেছে। যারা এই হত্যার সাথে যুক্ত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।
এদিকে তাহমিদ খুনের ঘটনায় শোক জানিয়ে দেশব্যাপী বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দিয়েছে আপ বাংলাদেশ। সংগঠনের মুখপাত্র শাহরিন সুলতানা ইরা স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে খুনিদের শনাক্ত করে অবিলম্বে গ্রেফতারের জোর দাবি জানান।
এ বিষয়ে বারইয়ারহাট পৌর বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম লিটন বলেন, ‘ঘটনার আগে এলাকায় ছেলেদের মধ্যে সামান্য কথা কাটাকাটি হয়। এ সময় জুবায়েরের সাথে আমার হাতাহাতি হয়। এরপর তারা বারইয়ারহাট চলে যায়। সেখানে আমার কোনো সম্প্রক্ততা নেই। এরপর কী হয়েছে আমার জানা নেই। পূর্ব-শত্রুতার জেরে এমনটা ঘটতে পারে।’
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার (মিরসরাই সার্কেল) নাদিম হায়দার চৌধুরী বলেন, তাহমিদ হত্যার পেছনে কারা জড়িত, কারা তাকে গুরুতর আঘাত করেছে যার ফলে তার মৃত্যু হয় এ ব্যাপারে বিস্তারিত তদন্ত ও ফুটেজ বিশ্লেষণ করছি। পরবর্তীতে আমরা তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেব। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঘটনার সূত্রপাত যা থেকে বড় সংঘর্ষের রূপ নেয়। তিনি বলেন, ময়নাতদন্ত শেষে লাশ তাদের বাড়িতে নেয়া হবে।