বেগম রোকেয়ার বাড়িতে একদিন

Printed Edition
Sahitto-3
বেগম রোকেয়ার বাড়িতে একদিন

অন্তর চন্দ্র

বিস্তীর্ণ সবুজের বুক ফেটে বেরিয়ে আসা রংপুরের পায়রাবন্দ গ্রাম। সেখানকার বিখ্যাত জমিদার পরিবারের সাবের বংশের কন্যা রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। তৎকালীন গোঁড়া মুসলিম সমাজের রক্তচক্ষু ও সামাজিক বাধাবিপত্তিকে উপেক্ষা করে কলকাতায় উপমহাদেশের প্রথম বালিকা বিদ্যালয় গড়ে তোলেন। নারী মুক্তির জন্য তিনি সারা জীবন কাজ করে গেছেন। তিনি নারী জাগরণের অগ্রদূত।

০৯ ডিসেম্বর ১৮৮০ সালে জন্ম নেয়া এই মহীয়সী নারীর জন্মভিটা অযতেœ ভগ্নস্তূপের শ্যাওলা ধরা মাটির সাথে মিশে যাচ্ছে; চারিদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ভগ্নস্তূপের ইটগুলো যেন সাক্ষী দিচ্ছে, এককালে এখানেই হেঁটে বেড়াতেন বাংলার এক অদম্য সাহসী নারী। রোকেয়ার জীবনী পাঠে জানা যায়, বড় ভাই ইবরাহিমের ঐকান্তিক ইচ্ছা এবং রোকেয়ার আগ্রহের কারণে বাংলা ইংরেজি শেখা সম্ভব হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে মেয়েদের লেখাপড়া করা পাপ বলে সমাজের কুসংস্কার ছিল। রোকেয়া সেই নীতিকে ভেঙে নারীদের নতুন পথচলা শুরু করেছিলেন।

রোকেয়ার জন্মের ১৪৫ বছর পর আমরা এসেছি, তার বাড়িটি সচক্ষে দেখতে, কোনো নারীর পূর্বাপর ইতিহাস খুঁজতে যাইনি; কিন্তু ভগ্নস্তূপের শ্যাওলা জমানো নির্জন জায়গাটি দেখে ভুতুড়ে বাড়ির কথা মনে আসে; হ্যাঁ! এই বাড়িতেই শিশুকালে নারী জাগরণের অগ্রদূত রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের জন্ম। এখন বাড়িটির সমস্ত জুড়ে ভগ্নস্তূপের ভয়াবহ আরতি, যেন কেউ কোথাও নেই; হরিতকি গাছের নিচে শ্যাওলা মাটির বুক চিড়ে পরগাছাদের হুল্লোড়, ঝাড়ুদার নেই, এক বৃদ্ধা সেখানটা দেখাশোনা করেন মাঝেমধ্যে পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করেন।

বাড়িটির নির্জনতা পাখির অনর্গল গুনগুন আমাদের উল্লসিত করে তোলে- পাশেই ‘বেগম রোকেয়া স্মৃতি পাঠাগার’ ভেতরে তিন-চার হাজার বই, পাঠকের বসার আসন, উপরে টাঙানো একটি ছবিতে রোকেয়ায় হাস্যোজ্জ্বল মুখ, উদ্দামী চেহারা আমাকে আরো আগ্রহী করে তোলে। রোকেয়ার স্মৃতিকে ধরে রাখতে তার জন্মভিটায় ১৯৯২ সালে পায়রাবন্দ সরকারি বেগম রোকেয়া স্মৃতি মহাবিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে এবং সরকারি উদ্যোগে ‘বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র’ স্থাপিত হয়েছে। এটি এখন সবার জন্য উন্মুক্ত ও পর্যটকদের আকর্ষণ করে। রংপুরের শতরঞ্জির কথা ভুলে গেলে চলে না, তৎকালীন সময়ে পাটশিল্পের কদর ছিল, পাটের তৈরি কারুশিল্পের জায়গা দখল করেছে আধুনিক শিল্প ব্যবস্থা; পাঠাগারের গা ঘেঁষে কারুশিল্পের দোকান, পাটের তৈরি জুতা, পাদানি, কাঠের চিরুনি, নানান তৈজসপত্র এক্কেবারে লোভনীয়।

নির্জন বাড়িটি নিয়ে আগ্রহ এখন আরো প্রবল! দু-একটি জায়গায় ইটের গাঁথুনি ছাড়া অবশিষ্ট আর কিছুই নেই। ‘বেগম রোকেয়া স্মৃতি অডিটোরিয়ামে’ রংপুর বিভাগীয় পাঠক সম্মেলনের আয়োজনে পাঁচ শতাধিক কবি-সাহিত্যিক ও পাঠকের আগমন ঘটেছিল এই বাড়িটিকে ঘিরে। হ্যাঁ! সেবার প্রথম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের জন্মভিটায় পা রাখার সুযোগ পেলাম।

জন্মভূমির প্রতি রোকেয়ার ছিল আলাদা মাতৃসুলভ টান ‘প্রবাসী রবিন ও তার জন্মভূমি’ কবিতাটি পড়লে মনে হয়, এটি যেন রোকেয়ার নিজস্ব স্মৃতিকে জড়িয়েই রচিত হয়েছে, তিনি বলেন...

‘জন্মভূমি রে হায়! সহজে কি ছাড়া যায়?

স্বর্গাধিক গরিয়সী তোমারে জেনেছি।’

রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রের ভেতরে ঢুকতেই রোকেয়ার একটি ভাস্কর্য দেখতে পাওয়া গেল পাশেই শান বাঁধানো পুকুর শাপলা ফুটে আছে। রোকেয়া স্মৃতিস্তম্ভে প্রতি বছর রোকেয়া দিবসে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। নারী মুক্তির অসামান্য অবদানের জন্য তাকে মুসলিম নারী জাগরণের অগ্রদূত বলা হয়ে থাকে। তিনিই হাজার হাজার নারীকে সুশিক্ষায় আলোকিত করেছিলেন। তার কাছে আমাদের ঋণ কখনো শোধ হওয়ার নয়!