সূচকের বড় পতনে হঠাৎ উল্টো পথে পুঁজিবাজার
দরপতনের শিকার ৮০ ভাগ কোম্পানি ও ফান্ড
Printed Edition
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেলেও নতুন সপ্তাহের শুরুতেই হঠাৎ বড় ধরনের পতনের মুখে পড়েছে দেশের পুঁজিবাজার। সুনির্দিষ্ট কোনো অভ্যন্তরীণ কারণ না থাকলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান এবং দক্ষিণ আমেরিকার ভেনিজুয়েলায় মার্কিন চাপকে ঘিরে তৈরি হওয়া উত্তেজনা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ।
গতকাল রোববার দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৫৮ দশমিক ৯৫ পয়েন্ট কমে চার হাজার ৯৩৯ দশমিক ৫৯ পয়েন্টে নেমে আসে। আগের দিন সূচকটি ছিল চার হাজার ৯৯৮ দশমিক ৫৪ পয়েন্টে। ফলে গত এক সপ্তাহে অর্জিত ৮৭ দশমিক ৯৪ পয়েন্ট বৃদ্ধির বড় একটি অংশ একদিনেই হারিয়েছে বাজার। লেনদেনের শুরু থেকেই বিক্রয়চাপের মুখে পড়ে সূচকটি বিভিন্ন সময়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত পতন ঠেকানো যায়নি। দিন শেষে ডিএসই-৩০ সূচক কমেছে ১৮ দশমিক ৭৪ পয়েন্ট এবং ডিএসই শরিয়াহ সূচক কমেছে ১১ দশমিক ৯১ পয়েন্ট।
দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) একই প্রবণতা দেখা গেছে। সিএসইর প্রধান সূচক সিএএসপিআই ১২০ দশমিক ৫৫ পয়েন্ট কমে যায়। পাশাপাশি সিএসই-৩০ সূচক কমেছে ১২২ দশমিক ৭১ পয়েন্ট এবং সিএসসিএক্স সূচক কমেছে ৭৫ দশমিক ৫২ পয়েন্ট।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত কয়েক দিনে যেসব কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়েছিল, সেগুলোর বড় অংশই গতকাল দরপতনের শিকার হয়েছে। এ তালিকায় ছিল ব্যাংক, মৌল ভিত্তিসম্পন্ন ও বহুজাতিক কোম্পানিও। আগের কর্মদিবসে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বড় উত্থান হলেও গতকাল সেগুলোর বেশির ভাগেই দর কমেছে।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যাংকিং খাত দিয়ে পতন শুরু হয়ে পরে বিমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য খাতেও ছড়িয়ে পড়ে। সিমেন্ট, সিরামিকস, প্রকৌশল ও জ্বালানি খাতে প্রায় ৯০ শতাংশ কোম্পানির দর কমেছে। পাট, কাগজ, সেবা, টেলিযোগাযোগ ও বিবিধ খাতের সব কোম্পানিই দরপতনের শিকার হয়েছে। ঢাকা শেয়ারবাজারে লেনদেনে অংশ নেয়া ৩৯২টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে মাত্র ৩৮টির দর বেড়েছে, বিপরীতে ৩১৩টির দর কমেছে, যা মোটের প্রায় ৮০ শতাংশ।
বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রথম প্রজন্মের একটি বেসরকারি ব্যাংকের একটি ব্রোকারেজ হাউসের শীর্ষ নির্বাহী নয়া দিগন্তকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের খবরদারিতে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায় যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধ যেমন এক সময় বিশ্ব অর্থনীতিকে নাড়া দিয়েছিল, তেমনি এ পরিস্থিতিও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়িয়েছে। পুঁজিবাজার অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতির যেকোনো অস্থিরতার প্রভাব এখানেও পড়ে। তবে তিনি মনে করেন, এ ধরনের সময়ে শেয়ার বিক্রি করে দেয়া কোনো সমাধান নয়; বরং ধৈর্য ধরাই বিনিয়োগকারীদের জন্য শ্রেয়।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেনের শীর্ষে ছিল ওরিয়ন ইনফিউশন। কোম্পানিটির পাঁচ লাখ ২২ হাজার শেয়ার ১৮ কোটি ৭২ লাখ টাকায় লেনদেন হয়। দ্বিতীয় স্থানে ছিল ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস, যার শেয়ার লেনদেন হয়েছে ১৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকার। এরপর ছিল সিটি ব্যাংক, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, উত্তরা ব্যাংক, সিভিও পেট্রোকেমিক্যাল রিফাইনারি, ফাইন ফুডস, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন, সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট ও জিকিউ বলপেন ইন্ডাস্ট্রিজ।
দর বৃদ্ধির শীর্ষে ছিল শাইনপুকুর সিরামিকস, যার দাম বেড়েছে ৯ দশমিক ৬২ শতাংশ। ফাইন ফুডস ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ বেড়ে দ্বিতীয় স্থানে ছিল। অন্য শীর্ষ দর বৃদ্ধিকারীদের মধ্যে ছিল আইসিবি এএমসিএল সেকেন্ড মিউচুয়াল ফান্ড, মার্কেন্টাইল ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, সিভিও পেট্রোকেমিক্যাল রিফাইনারি, এনসিসিবি ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস, সিলভা ফার্মাসিউটিক্যালস ও শিকদার ইন্স্যুরেন্স।
দরপতনের শীর্ষে ছিল ফারইস্ট ফিন্যান্স ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং- উভয় কোম্পানিই ১০ দশমিক ৮৬ শতাংশ করে কমেছে। প্রাইম ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ১০ শতাংশ দর হারিয়েছে। এ ছাড়া এফএএস ফিন্যান্স, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, প্রিমিয়ার লিজিং, খুলনা পেপার অ্যান্ড প্রিন্টিং, বিআইএফসি, জিএসপি ফিন্যান্স ও ওরিয়ন ইনফিউশনও বড় দরপতনের শিকার হয়েছে।