সালমান-আনিসুলের মামলায় কিশোর আদহামের জবানবন্দী

‘সেনাকর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্ন ছিল, এখন দাঁড়াতেও পারি না’

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চাঞ্চল্যকর জবানবন্দী দিয়েছেন ১৭ বছর বয়সী কিশোর আদহাম বিন আমিন।

গতকাল মঙ্গলবার বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১-এ এই সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। মামলার এটি ছিল তৃতীয় সাক্ষী।

আদহাম বিন আমিন জবানবন্দীতে জানান, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় তিনি মিরপুর ন্যাশনাল বাংলা হাইস্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন। ১৬ জুলাই থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত তিনি মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯ জুলাই বিকেলে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অবস্থানকালে পুলিশ, বিজিবি ও আওয়ামী লীগের সশস্ত্র বাহিনী তাদের ওপর দফায় দফায় হামলা চালায়। এমনকি হেলিকপ্টার থেকেও গুলি বর্ষণ করা হয়। বিকেল ৫টার দিকে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা নিখিল, বন্দুক আয়নাল, কচি ও সাচ্চুর নেতৃত্বে সশস্ত্র হামলা চলাকালীন একটি গুলি তার বাম পায়ের হাঁটুর নিচ দিয়ে ঢুকে ডান পায়ের হাঁটুর মাংস নিয়ে বেরিয়ে যায়।

ট্রাইব্যুনালে দাঁড়ানো অবস্থায় আদহাম তার শরীরে থাকা সেই গুলির ক্ষতচিহ্ন প্রদর্শন করেন এবং কান্নায় ভেঙে পড়েন। এ সময় সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান মাথা নিচু করে বসে ছিলেন।

আহত হওয়ার পর বিভিন্ন হাসপাতালে দীর্ঘ কয়েক মাস চিকিৎসা নিলেও আদহাম এখনো স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন না। তিনি ট্রাইব্যুনালকে বলেন, ‘আমার স্বপ্ন ছিল একজন সেনাকর্মকর্তা হওয়ার, কিন্তু এখন আমি ঠিকমতো দাঁড়াতেও পারি না। এ বছর আমার এসএসসি পরীক্ষা, অথচ শারীরিক যন্ত্রণায় আমি পড়াশোনা করতে পারছি না।’ তিনি আরো অভিযোগ করেন, তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমান ফোনে কথোপকথনের মাধ্যমে কারফিউ দিয়ে আন্দোলনকারীদের ‘মেরে শেষ করে ফেলার’ নির্দেশ দিয়েছিলেন। এই ষড়যন্ত্রে শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের ও আসাদুজ্জামান খান কামালসহ আরো অনেকে জড়িত বলে তিনি দাবি করেন।

জবানবন্দীর শেষ পর্যায়ে আদহাম এক ভয়াবহ তথ্য তুলে ধরে জানান, এই মামলায় সাক্ষী হওয়ার কারণে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে স্থানীয় আওয়ামী লীগের লোকজন তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে পিটিয়ে গুরুতর আহত করেছে। এই ঘটনায় তিনি মিরপুর মডেল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন এবং পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। পঙ্গুত্বের অভিশাপ নিয়ে বেঁচে থাকা এই কিশোর তার জীবন ধ্বংসকারীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার প্রার্থনা করেছেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী এ সময় কিশোরের জবানবন্দী গ্রহণ করেন।

এই মামলায় পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হবে ১২ মার্চ।