সিয়াম সাধনার মাস
সৌন্দর্য বাড়ায় তারাবিহ
Printed Edition
লিয়াকত আলী
রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস রমজানুল মোবারকের আজ ১৬ তারিখ। রমজান মাসে প্রতিদিন সুবহি সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও কামাচার বর্জনের মাধ্যমে সিয়াম পালন করা হয়। এটাই এ মাসের প্রধান ও প্রথম পালনীয়। তবে সিয়াম পালনের পাশাপাশি আরেকটি ইবাদত অত্যন্ত নিবিড়ভাবে জড়িয়ে রয়েছে এ মাসের সাথে। অত্যন্ত আগ্রহের সাথে মুমিন বান্দারা এতে মশগুল থাকেন। পবিত্র রমজানের সাথে এটির ঘনিষ্ঠতর সম্পর্ক। সালাতুত তারাবিহ নামে পরিচিত ইবাদতটির কারণে পবিত্র মাসের গাম্ভীর্য ও প্রতিক্রিয়া বেড়ে যায় অনেক গুণ।
আল্লাহর প্রিয় বান্দারা দিনের বেলা রোজা রেখে ও রাতে এশার সালাতের পর দীর্ঘক্ষণ তারাবিহের নামাজের কষ্ট আনন্দের সাথে উপভোগ করেন। সারা দিনের কান্তি উপেক্ষা করে দীর্ঘ সময়ের এই সালাতে নিমগ্ন থাকা আল্লাহ তায়ালার প্রতি একান্ত আত্মনিবেদন ও তার পাক কালামের প্রতি তাদের উৎসাহ ও অনুরাগের প্রমাণ। তা ছাড়া প্রতিদিন এশার নামাজের পর মসজিদে মসজিদে যখন আল্লাহর পবিত্র বাণীর তিলাওয়াত চলতে থাকে, তখন পুরো পরিবেশে বিরাজ করে অনুপম আবহ। কুরআন মাজিদের তিলাওয়াতে বেহেশতি সুর মূর্ছনায় মুগ্ধ হন মুসল্লিরা। তাই সালাতুত তারাবিহ পরিবেশ ও প্রকৃতিতে সংযোজন ঘটায় মনোমুগ্ধকর এক বেহেশতি আবহ।
জামায়াতের সাথে সালাতুত তারাবিহের বর্তমান নিয়মটি চালু হয়েছে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর ফারুক রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময় থেকে। ইতঃপূর্বে অর্থাৎ রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর সিদ্দিক রাজিয়াল্লাহু আনহুর সময়ে এমনকি হজরত ওমর ফারুকের খেলাফতকালের প্রথমভাগেও মুসলমানরা রমজানের রাতগুলোতে এশার নামাজের পর অতিরিক্ত যে সালাত আদায় করতেন তা একাকী করতেন। এ জন্য জামায়াত বা সম্মিলিত রূপের আয়োজন ছিল না।
তবে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজানে কিয়ামুল লাইল বা রাত জেগে ইবাদত-বন্দেগির বিশেষ উৎসাহ দিয়েছেন এবং এ জন্য অশেষ পুরস্কারের সুসংবাদ দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে হজরত আবু হুরাইরা রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত একটি হাদিস উল্লেখ করা যায়। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: রমজানের রাতগুলোতে ইবাদত করার জন্য আমাদের উৎসাহ দিতেন। কিন্তু জোরালো আদেশ দিতেন না। তিনি বলতেন, যে ব্যক্তি রমজানে ঈমান ও ইহতিসাবের সাথে কিয়াম করবে, তার ইতঃপূর্বেকার সব গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে। এভাবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে রাতের ইবাদত করার নিয়ম চালু ছিল তার জীবদ্দশায়। হজরত আবু বকর সিদ্দিক রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময়ে একই নিয়ম চালু ছিল। এটাই বহাল ছিল হজরত ওমর ফারুকের খেলাফতকালের প্রথম ভাগেও। (বুখারি শরিফ)
হজরত ওমর ফারুক রা:-এর সময়ে জামায়াতের সাথে সালাতুত তারাবিহ চালু হওয়া সম্পর্কে একটি সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন আবদুর রহমান ইবনে সায়েব ইবনে আবদুল কারি নামে এক তাবেয়ি। তিনি বলেন, রমজানের এক রাতে হজরত ওমরের সাথে আমি মসজিদে নববীতে গেলাম। দেখলাম লোকেরা বিক্ষিপ্তভাবে ইবাদত করছে। কেউ একাকী আবার কারো সাথে কয়েকজন যোগ দিয়ে নফল নামাজ আদায় করছে। হজরত ওমর রা: বললেন, এদের সবাইকে একজন তিলাওয়াতকারীর পেছনে একত্র করে দিলে ভালো হতো। পরে হজরত উবাই ইবনে কা’বকে ইমাম নিযুক্ত করা হয়। কেননা হজরত উবাই রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন সাহাবিদের মধ্যে সবচেয়ে শুদ্ধ ও মধুর কণ্ঠে কুরআন মাজিদ তিলাওয়াতকারী। এরপর এক দিন আবারো বের হলেন হজরত ওমর। বর্ণনাকারী আবদুর রহমান বলেন, হজরত উবাই রা:-এর ইমামতিতে তখন এই নামাজ চলছে। পরিবেশটি দেখে হজরত ওমর মুগ্ধ হলেন এবং বললেন, চমৎকার আবিষ্কার এটি। এমন একটি বর্ণনাও পাওয়া যায় যে, হজরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু এ দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন হজরত ওমরের। এভাবে যে নামাজ চালু হয় তা তারাবিহ নামে আখ্যায়িত হওয়ার কারণ মাঝখানের বিরতিগুলো। ২০ রাকাত নামাজ আদায় করতে গিয়ে প্রতি চার রাকাতের পরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয়ার রীতি ছিল। আরবি তারবিহা অর্থ বিশ্রাম। আর তারবিহা শব্দের বহুবচন তারাবিহ।
সালাতুত তারাবিহ জামায়াতের সাথে আদায়ের আয়োজন থাকায় অনেক মানুষ একই সাথে কুরআন মাজিদ শুনতে শুনতে দীর্ঘ সময় ধরে নফল নামাজ আদায় করতে পারেন। তেমনি সম্মিলিত আকারে আদায়ের কারণে রোজাদার মুসলমানদের মধ্যে গড়ে উঠতে পারে ঐক্য ও সম্প্রীতির আরো দৃঢ়বন্ধন। এ জন্য হজরত ওমরের সময় থেকে এ পর্যন্ত সারা বিশ্বে মুসলমানদের মধ্যে রমজানুল মোবারকে সিয়াম সাধনার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে গেছে তারাবিহ সালাতের জামায়াত। শহর এলাকার বেশির ভাগ মসজিদে খতম তারাবিহ হয়ে থাকে। ফলে যারা নিয়মিত তারাবিহ নামাজে অংশ নেন, তাদের পক্ষে পুরো কুরআন মাজিদ একবার শোনার সুযোগ হয়। অতএব বিশেষ কোনো অসুবিধা না থাকলে রমজান মাসে সিয়াম পালনের পাশাপাশি সালাতুত তারাবিহে নিয়মিত যোগদানে সচেষ্ট থাকা উচিত।