যুদ্ধবিরতি উপেক্ষা করে গাজা ও পশ্চিমতীরে আরো ইসরাইলি হামলা
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
- গাজাজুড়ে ইসরাইলের বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণ
- পশ্চিমতীরে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা, ২০০ ভেড়া ও একটি গাড়ি লুট
- ঝড়ে বাস্তুচ্যুতদের হাজারো তাঁবু উড়ে গেছে
যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার পরও গাজা উপত্যকা ও অধিকৃত পশ্চিমতীরে ইসরাইলের সামরিক হামলা ও সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, ইসরাইলি বিমান ও গোলাবর্ষণে গাজায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭১ হাজার ৪০৯ জনে।
আলজাজিরাকে স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও চিকিৎসা সূত্র জানায়, গাজার বিভিন্ন এলাকায় ইসরাইলি বিমান ও কামান থেকে হামলা চালানো হয়। উত্তর গাজার গাজা সিটি, মধ্যাঞ্চলের বুরেইজ শরণার্থী শিবিরের পূর্বাংশ এবং দক্ষিণের খান ইউনুসের পূর্বাঞ্চল ছিল হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু। গাজা সিটির তুফ্ফাহ এলাকায় বিমান হামলার পাশাপাশি ভারী ড্রোন তৎপরতা ও গুলির শব্দ শোনা যায়। বুরেইজ শিবিরের কাছে কৃষিজমিতে অন্তত দু’টি বিমান হামলা চালানো হয়। খান ইউনুসের পূর্বাঞ্চলে টানা গোলাবর্ষণ ও বিস্ফোরণের শব্দে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
এ দিকে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, সাম্প্রতিক হামলায় নিহত আরো ১৪ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে এবং আহত হয়েছেন অন্তত ১৭ জন। যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর থেকে এখন পর্যন্ত ইসরাইলি হামলায় ৪৩৯ জন নিহত ও এক হাজার ২২৩ জন আহত হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে আরো ৬৮৮টি লাশ। অন্য দিকে অধিকৃত পশ্চিমতীরেও সহিংসতা বেড়েছে। নাবলুসের উত্তরে বাজরিয়া গ্রামে ইসরাইলি দখলদাররা পাঁচটি ফিলিস্তিনি যানবাহনে আগুন দিয়েছে এবং তারা একটি স্কুলে হামলা চালিয়ে শ্রেণিকক্ষ জ্বালিয়ে দেয় ও দেয়ালে বর্ণবাদী স্লোগান লেখে। একই সময়ে নাবলুস এলাকায় হামলা চালিয়ে ইসরাইলি সেনারা ইয়াহিয়া আল-আইয়াশের স্ত্রী হিয়াম আল-আইয়াশকে আটক করেছে। এ ছাড়া জেনিনের ইয়াবাদ গ্রামে ফিলিস্তিনি পরিবারের অন্তত ৯টি বাড়ি জোরপূর্বক দখল করে সামরিক ঘাঁটি বানিয়েছে ইসরাইলি সেনারা। বাসিন্দাদের কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘর ছাড়তে বাধ্য করা হয়। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো এখন চরম মানবিক সঙ্কটে দিন কাটাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতির পরও নিয়মিত হামলা পরিস্থিতিকে আরো অস্থির করে তুলছে এবং শান্তি প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
গাজাজুড়ে ইসরাইলের বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণ
গাজার বিভিন্ন এলাকায় ভোররাতে বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণ চালিয়েছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। স্থানীয় সূত্র জানায়, গাজা সিটির পূর্বাঞ্চলে আর্টিলারি শেল নিক্ষেপ করা হয়। একই সাথে উত্তর গাজায় একটি এলাকায় যুদ্ধবিমান থেকে বোমা হামলা চালানো হয় এবং জাবালিয়ার পূর্ব দিকে একটি হেলিকপ্টার থেকে নির্বিচারে গুলি ছোড়া হয়। দক্ষিণ গাজার রাফাহ শহরেও বিমান হামলার খবর পাওয়া গেছে। সেখানে ইসরাইলি সামরিক যান শহরের উত্তরাংশে গুলিবর্ষণ করে। এসব হামলার মধ্য দিয়ে ইসরায়েল ১০ অক্টোবর ২০২৫ থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি আবারো লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় খবরে বলা হয়, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরাইল শত শতবার চুক্তি ভঙ্গ করেছে। এতে এখন পর্যন্ত ৪৩৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং এক হাজার ২২৩ জন আহত হয়েছেন। ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর শুরু হওয়া ইসরাইলি হামলা টানা দুই বছর ধরে চলেছে। এতে ৭১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি (অধিকাংশই নারী ও শিশু) নিহত এবং প্রায় এক লাখ ৭১ হাজার মানুষ আহত হন। হামলায় গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে।
পশ্চিমতীরে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা, ২০০ ভেড়া ও একটি গাড়ি লুট
অধিকৃত পশ্চিমতীরের রামাল্লাহর কাছে একটি শহরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা হামলা চালিয়ে ফিলিস্তিনিদের ২০০টি ভেড়া ও একটি গাড়ি লুট করেছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় সূত্র। সূত্র জানায়, রামাল্লাহর উত্তর-পশ্চিমে কুবার শহরে বসতি স্থাপনকারীরা হামলা চালিয়ে ফিলিস্তিনি নাগরিক সায়ের আল-নাবালির একটি খামারে হামলা করে। হামলাকারীরা খামারের তত্ত্বাবধায়ককে মারধর করে, হাত বেঁধে আটকে রাখে। এরপর তারা খামার থেকে প্রায় ২০০টি ভেড়া এবং একটি পার্ক করা গাড়ি নিয়ে চলে যায়। ভুক্তভোগী ফিলিস্তিনিরা অভিযোগ করেছেন, এসব হামলার বিরুদ্ধে তারা কোনো ধরনের সুরক্ষা পান না এবং হামলাকারীরা শাস্তির মুখে পড়ে না। প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও)-এর অধিভুক্ত ‘সেপারেশন ওয়াল ও ইহুদি বসতি প্রতিরোধ কাউন্সিল’-এর তথ্যমতে, ২০২৫ সালে পশ্চিমতীরে বসতি স্থাপনকারীরা চার হাজার ৭২৩টি হামলা চালিয়েছে। এসব ঘটনায় ১৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং এক হাজার ৯০ জন বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যাদের বেশির ভাগই বেদুইন সম্প্রদায়ের।
ঝড়ে বাস্তুচ্যুতদের হাজারো তাঁবু উড়ে গেছে
গাজায় চলমান বৈরী আবহাওয়ায় বাস্তুচ্যুত মানুষের হাজার হাজার তাঁবু উড়ে গেছে ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে গাজার সিভিল ডিফেন্স ডিরেক্টরেট। সংস্থাটি বলেছে, নির্মাণসামগ্রী প্রবেশে ইসরাইলের নিষেধাজ্ঞা ও পুনর্গঠন বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণেই এই মানবিক সঙ্কট ভয়াবহ আকার নিয়েছে। সংস্থাটির মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল এক বিবৃতিতে জানান, বর্তমান নিম্নচাপের কারণে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলো ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায় বহু তাঁবু সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে। তিনি বলেন, এটি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; বরং নির্মাণসামগ্রী আটকে দেয়া ও পুনর্গঠন বন্ধ থাকার সরাসরি ফল। প্রতিটি নতুন নিম্নচাপ গাজায় একটি পূর্ণাঙ্গ মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত হচ্ছে। বাসাল জানান, শহরগুলো ব্যাপকভাবে ধ্বংস হওয়ায় অনেক ফিলিস্তিনি বাধ্য হয়ে সমুদ্রসৈকতে তাঁবু স্থাপন করেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, হাজারো ক্ষতিগ্রস্ত ঘর যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে, যা বাসিন্দাদের জীবনের জন্য হুমকি।
পশ্চিমতীরে রাজনৈতিক গ্রেফতার দখলদারিত্বের স্বার্থ রক্ষা করছে : হামাস
পশ্চিমতীরে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তাবাহিনীর রাজনৈতিক গ্রেফতার অভিযান দখলদার ইসরাইলের স্বার্থে কাজ করছে বলে অভিযোগ করেছে হামাস। এক বিবৃতিতে সংগঠনটি জানায়, এসব অভিযানে রাজনৈতিক নেতা, কর্মী, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষকে আটক করা হচ্ছে, যা ভয়াবহ দমনমূলক পরিবেশ তৈরি করছে। হামাস বলেছে, এমন সময়ে এসব গ্রেফতার চলছে যখন পশ্চিমতীর দখল, ইহুদিকরণ, সংযুক্তিকরণ ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির মুখে রয়েছে। তারা সতর্ক করে জানায়, এই ‘দমনমূলক ও জাতিবিরোধী’ নীতি অব্যাহত থাকলে এর গুরুতর পরিণতি হবে। বিবৃতিতে অবিলম্বে সব রাজনৈতিক গ্রেফতার বন্ধ এবং জাতীয় অবস্থানের কারণে আটক ব্যক্তিদের মুক্তির আহ্বান জানানো হয়।
গাজায় দুই বছরের বেশি সময়ে স্বাধীন সাংবাদিক প্রবেশে বাধা : ইসরাইল দুই বছরের বেশি সময় ধরে গাজায় স্বাধীন সাংবাদিক প্রবেশে বাধা দিয়ে আসছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ইসরাইল দাবি করে, সামরিক নিয়ন্ত্রণাধীন ‘মিডিয়া ট্যুর’-এর মাধ্যমে সাংবাদিকরা প্রবেশ করতে পারেন। গাজায় কর্মরত ফিলিস্তিনি সাংবাদিকরা জানান, তারা একই সাথে গণহত্যার সাক্ষী ও ভুক্তভোগী। প্যালেস্টাইন জার্নালিস্টস সিন্ডিকেটের তথ্য অনুযায়ী, ইসরাইলি হামলায় এখন পর্যন্ত ২৫৬ সাংবাদিক নিহত, ৪৯ জন আটক এবং ৫৩৫ জন আহত হয়েছেন। ধ্বংস হয়েছে ১৫০টি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া সাংবাদিকদের পরিবারের প্রায় ৭০৬ সদস্য নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
গাজা অবরোধ নীতিকে সমর্থনের অভিযোগে ইসরাইলি সুপ্রিম কোর্ট সমালোচিত : গাজায় গণমাধ্যম প্রবেশাধিকারের দাবিতে ফরেন প্রেস অ্যাসোসিয়েশন (এফপিএ) ইসরাইলি সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করলেও এখনো অনুমতি দেয়া হয়নি। এই বিলম্বকে ‘গণমাধ্যম অন্ধকার’ বজায় রাখার কৌশল বলে সমালোচনা করেছেন সাংবাদিক সুরক্ষা কমিটির (সিপিজে) আঞ্চলিক পরিচালক সারা কুদাহ। তিনি বলেন, গাজা ২১ শতকের সবচেয়ে ভয়াবহ সাংবাদিক নিধনের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
ঠাণ্ডায় গাজায় সাত দিনের শিশুর মৃত্যু
ইসরাইলি অবরোধের মধ্যে তীব্র শীতে গাজার দেইর আল-বালাহে সাত দিনের এক নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থার বরাতে জানা গেছে, শীতজনিত কারণে এখন পর্যন্ত ১৫ জনের বেশি মারা গেছেন, যাদের বেশির ভাগই শিশু। জ্বালানি ও ত্রাণ আটকে দেয়ায় গাজায় গরমের ব্যবস্থা নেই। অপর্যাপ্ত তাঁবু ও চিকিৎসা সঙ্কট শিশু ও অসুস্থদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।
গাজায় মানবিক সঙ্কট
অব্যাহত যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও গাজায় মানবিক সঙ্কটের কোনো দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি। সহায়তা প্রবেশে বিধিনিষেধের কারণে লক্ষাধিক মানুষ অস্থায়ী তাঁবুতে মানবেতর অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। ভারী বৃষ্টি ও ঝড়ে এসব তাঁবু বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে শিশুদের জীবন চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো।
গাজায় অপরাধের জন্য নেতানিয়াহুকে ‘অপহরণের’ আহ্বান
গাজায় যেভাবে গণহত্যা চালাচ্ছে ইসরাইল, এর ফলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ‘সবচেয়ে বড় মানবতাবিরোধী অপরাধী’ অভিহিত করে তাকে অপহরণ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ। বৃহস্পতিবার জিয়ো নিউজের হামিদ মিরকে এক সাক্ষাৎকারে এই আহ্বান জানান তিনি। সাক্ষাৎকারে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যেভাবে অহরণ করা হয়েছে সেই উদাহরণ টেনে খাজা আসিফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই মানবতায় বিশ্বাস করে, তবে তাদের উচিত নেতানিয়াহুকে অপহরণ করা। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, তুরস্কও এই পদক্ষেপ নিতে পারে। নেতানিয়াহুকে ‘সবচেয়ে বড় মানবতাবিরোধী অপরাধী’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ইতিহাসে ফিলিস্তিনের গাজায় সংঘটিত নৃশংসতার সমতুল্য আর কোনো ঘটনা নেই। তিনি বলেন, ‘গত চার-পাঁচ বছরে ফিলিস্তিনিদের সাথে ইসরাইল যা করেছে, তা কোনো সম্প্রদায় করেনি। নেতানিয়াহু মানবতার সবচেয়ে বড় শত্রু। বিশ্ব এর চেয়ে বড় অপরাধী আর দেখেনি।’ আসিফ জানান, পাকিস্তানিরা এই মুহূর্তটির জন্যই প্রার্থনা করছে। আলোচনার একপর্যায়ে তিনি নেতানিয়াহুর হাত শক্তিশালী করা ব্যক্তিদেরও শাস্তি দেয়ার দাবি তোলেন। তবে সঞ্চালক হামিদ মীর এই মন্তব্যকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি পরোক্ষ ইঙ্গিত হিসেবে নিয়ে সতর্কতাস্বরূপ অনুষ্ঠানটিতে বিরতি ঘোষণা করেন।