মার্কিন-ইরান দ্বিমুখী অবস্থানে দোহার বৈঠক নিয়ে ধোঁয়াশা

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • আজ মঙ্গলবার কাতারের রাজধানী দোহায় ইরানের সাথে বৈঠক : ট্রাম্প
  • এই সপ্তাহে দোহায় কোনো বৈঠক নেই : ইরানি কর্মকর্তা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল সোমবার দাবি করেছেন যে ইরান একটি বৈঠকের অনুরোধ জানিয়েছে এবং সেই অনুযায়ী আজ মঙ্গলবার কাতারের রাজধানী দোহায় দুই পক্ষ বৈঠকে বসতে যাচ্ছে। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেয়া একটি সংক্ষিপ্ত পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, ‘ইরান একটি বৈঠকের অনুরোধ করেছে। আগামীকাল দোহায় এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হবে।’

তবে সোমবার এর ঠিক আগেই ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলো প্রত্যাখ্যান করে ভিন্ন তথ্য দিয়েছিলেন। তিনি জানান যে, এই সপ্তাহে দোহায় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো ‘কারিগরি আলোচনা’ নির্ধারিত নেই। অবশ্য তিনি এ-ও যোগ করেন যে, মধ্যস্থতাকারীদের সাথে তাদের পরামর্শ ও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। এর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান হরমুজ প্রণালী নিয়ে তৈরি হওয়া মতবিরোধ নিরসনে একমত হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে হামলা চালানোর পর তেহরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি বন্ধ করে দিয়েছিল। হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট জানিয়েছেন, মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার এই সপ্তাহে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নিতে দোহায় যাবেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে আমরা যুদ্ধবিরতি মেনে চলছি। তবে যেকোনো সহিংসতার জবাব সহিংসতা দিয়েই দেয়া হবে।’

তবে কাতারের মাধ্যমে মধ্যস্থতা প্রক্রিয়া ও অন্যান্য আলোচনা যথারীতি চলছে। একটি জ্যেষ্ঠ ইরানি সূত্র জানিয়েছে, সুইজারল্যান্ডে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে হওয়া আগের কারিগরি আলোচনার চেয়ে মঙ্গলবারের দোহার এই বৈঠকের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। এবার মূল নজর থাকবে হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ এবং উত্তেজনা কমিয়ে আনার ওপর। গত ১৭ জুন চার মাসের সঙ্ঘাতের অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি ১৪ দফার সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। এর অধীনে দুই পক্ষই বৈরিতা বন্ধ করতে এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী আবার খুলে দিতে সম্মত হয়, যেখান দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়। এই নৌপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেলের দাম ব্যরেল প্রতি ১০০ ডলারের ওপরে চলে গিয়েছিল, যা বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি বাড়ায় এবং ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক অস্বস্তি তৈরি করে। এই চুক্তির ফলে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির মতো জটিল বিষয়গুলো নিয়ে আগামী ৬০ দিন আরও গভীর আলোচনার পথ সুগম হয়েছে।

ইরানের ফ্রিজ হওয়া তহবিল অবমুক্তির তোড়জোড়

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন যে, এই চুক্তির আওতায় কাতারে আটকে থাকা ১২ বিলিয়ন ডলারের সম্পদের মধ্যে প্রথম দফায় ৬ বিলিয়ন ডলার অবমুক্ত করে ইরানে ফেরত পাঠানো হবে। তিনি এই সমঝোতা স্মারককে ইরানের জনগণের জন্য একটি বড় বিজয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যার মধ্যে ইরানের তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল খাতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সূত্রমতে, এই অর্থ দু’টি কিস্তিতে ইরানকে দেয়া হবে।

বিশ্লেষক আব্বাস আসলানির মতে, চুক্তির অন্যান্য দিক স্থবির হয়ে পড়লেও কাতারের মধ্যস্থতায় ইরানের আটকে থাকা অর্থ ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়াটি দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে ধরে রাখতে বড় ভূমিকা পালন করছে। ২০২৩ সালেও দক্ষিণ কোরিয়ায় আটকে থাকা ৬ বিলিয়ন ডলারের ইরানি তহবিল কাতারের ব্যাংকে স্থানান্তরিত হয়েছিল; কিন্তু রাজনৈতিক জটিলতায় তেহরান তা পায়নি। এবার দোহা এই আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করার মাধ্যমে ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনা চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করছে।

হরমুজ প্রণালীতে সাম্প্রতিক সঙ্ঘাত

গত বৃহস্পতিবার হরমুজ প্রণালীতে একটি মালবাহী জাহাজে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর থেকে দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে বেশ কয়েক দফা হামলা ও পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছে। ইরান রোববার ভোরে কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এর কিছুক্ষণ আগেই ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানকে হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, ‘এমন একটা সময় আসতে পারে যখন আমরা আর যুক্তি দেখাব না এবং সামরিকভাবে কাজ শেষ করতে বাধ্য হব। তেমনটা হলে ইরান নামক কোনো রাষ্ট্রের অস্তিত্ব থাকবে না।’ ট্রাম্পের এই বার্তার পরপরই কুয়েতের সেনাবাহিনী জানায় যে তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মোকাবেলা করছে, অন্য দিকে বাহরাইনেও সতর্কসঙ্কেত বেজে ওঠে। ইরানের ইসলামি রেভ্যুলুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, মার্কিন হামলায় যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘিত হয়েছে এবং এই অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে আগামী দিনগুলোতে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।

লেবাননে যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়ে সংশয়

এ দিকে ইরানের সমর্থনপুষ্ট হিজবুল্লাহর অন্যতম সহযোগী ও লেবাননের পার্লামেন্ট স্পিকার নাবিহ বেরি লেবানন ও ইসরাইলের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া একটি চুক্তি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তিনি সতর্ক করেছেন যে এই চুক্তিটি লেবাননকে বিভক্ত করার চেষ্টা করতে পারে এবং এটি বাস্তবায়িত হবে না। হিজবুল্লাহ ইসরাইলে হামলা চালানোর পর এই সঙ্ঘাতের সূত্রপাত হয়েছিল। ইসরাইলের পাল্টা হামলায় লেবাননে ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি ঘটেছে এবং চার হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। তেহরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরাইলের মধ্যকার সঙ্ঘাতের জেরে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ বন্ধ করতে হলে লেবাননে সঙ্ঘাতের অবসান এবং দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার করা যেকোনো চুক্তির অপরিহার্য অংশ।