ইরানে মার্কিন-ইসরাইল হামলার পর ইউরোপ কী ভাবছে
Printed Edition
মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন প্যারিস (ফ্রান্স) থেকে
সম্প্রতি ইরানে মার্কিন ও ইসরাইলি বিমান হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বেড়েছে এবং এর প্রতিক্রিয়া বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় দেশগুলো এ ঘটনার পর আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, কূটনৈতিক কাঠামো ও অর্থনৈতিক ফলাফল নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
সামরিক অভিযান বিস্তৃত হওয়ায় ইরানে মার্কিন-ইসরাইলি হামলা নিয়ে ইউরোপের প্রতিক্রিয়া শিরোনামে ইউরোপভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ইউরো নিউজ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এই হামলাকে যুদ্ধের বিস্ফোরণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং এটি আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিপদজনক বলে মন্তব্য করেছেন।
এ দিকে মঙ্গলবার ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে চলমান যুদ্ধের ইরানকে আংশিকভাবে দায়ী করলেও, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের অবস্থান আন্তর্জাতিক আইনের বাইরে বলে সমালোচনা করেছেন।
ফ্রান্স ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করেনি এবং তারা মার্কিন ও ইসরাইলি হামলার অংশীদারও নয়। ফ্রান্স এই হামলার সমর্থন করেনি এবং তা আন্তর্জাতিক আইনের বাইরে বলে সমালোচনা করেছে। যদিও দেশটির নৌ এবং সেনাবাহিনী কিছু সরঞ্জাম মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করছে।
ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ঘোষণা করেছেন তাদের বিমানবাহী রণতরী চার্লস দ্য গলকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠানো হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য মূলত ওই অঞ্চলের নিরাপত্তা ও নৌপরিবহন রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা নেয়া। বিশেষত হরমুজ প্রণালী, সুয়েজ চ্যানেল ও রেড সি সংলগ্ন পথগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
এ দিকে ইউরোপীয় কমিশন ও কাউন্সিলের নেতারা সবাইকে উত্তেজনা কমাতে, সর্বোচ্চ সংযম বজায় রাখতে এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান জানাতে আহ্বান জানিয়েছেন। ইইউর প্রধান কূটনীতিক কাজা ক্যালাস বলেন, পরিস্থিতি নাড়ি কাঁপানো ও অত্যন্ত বিপজ্জনক। কিন্তু সেই সাথে ইরানের নির্দিষ্ট কর্মসূচির নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগও উড়িয়ে দেয়া যায় না। তাই কূটনীতিকই সমাধানের একমাত্র পথ।
কঠোর সমালোচনা করল স্পেন
অপর দিকে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সাঞ্চেজ ইরানো মার্কিন-ইসরাইলি হামলার সরাসরি কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক আইনের সম্মান বজায় রাখা উচিত। সেই সাথে অচিরেই উত্তেজনা কমানোর জন্য সব পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন ও ইসরাইলি সামরিক কার্যক্রমের সময় স্পেন সরাসরি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি (রোটা ও মোরন) ব্যবহার করতে দেয়নি এবং ভবিষ্যতেও ব্যবহার অনুমোদন করবে না বলেও ঘোষণা দিয়েছে।
দেশটির এই ভূমিকার সমালোচনা করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, স্পেনের ভূমিকা খারাপ কারণ দেশটি যুক্তরাষ্ট্রকে তার সামরিক ঘাঁটিগুলো (রোটা ও মোরন) ইরানের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত অভিযানে ব্যবহার করতে দেয়নি। তিনি কড়া ভাষায় বলেছেন স্পেন খুব খারাপ/অপ্রতিষ্ঠিত সহযোগী এবং আমরা স্পেনের সাথে সব বাণিজ্য বন্ধ করে দেব; আমরা স্পেনের সাথে সম্পর্ক রাখতে চাই না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পেনকে ন্যাটোর রক্ষণশীল ব্যয় লক্ষ্য, বিশেষত তার নিজ ঘোষিত ৫% জিডিপি ব্যয় পূরণ না করার জন্যও সমালোচনা করেছেন।
এ দিকে ইরানে মার্কিন-ইসরাইল হামলা প্রসঙ্গে ইউরোপের নীতি ও কূটনৈতিক ভূমিকা সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইউরোপীয় দেশগুলোর ভূরাজনৈতিক ভূমিকা আগের তুলনায় অনেকটাই সীমিত হচ্ছে। ইইউ রাজনৈতিক ঐক্য কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হচ্ছে, যার ফলে তারা যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমা নীতির বিকল্প কণ্ঠস্বর তৈরি করতে পারছে না। এই দিকটি একটি শক্তি শূন্যতা বা কার্যকর প্রভাবের নিকৃষ্ট অবস্থার প্রতিফলন, যা আধুনিক বৈশ্বিক রাজনৈতিক ভারসাম্যে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
বিশ্বব্যাপী প্রতিক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্নে বিশ্বের বিভিন্ন অংশ থেকে এ হামলাকে মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসন বলে উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠছে। বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথভুক্ত (চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল, মালয়েশিয়া ইত্যাদি) অনেক দেশ এটিকে সাম্রাজ্যবাদী নীতির প্রতিফলন বলে আখ্যায়িত করেছে, যা কূটনৈতিক সমাধানকে উপেক্ষা করে একটি শক্তির দমনমূলক প্রবণতা প্রদর্শন করছে।
ইউরোপে অর্থনৈতিক প্রভাব ও ভাবনা বিষয়ে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই সঙ্ঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে ইউরোজোনে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি ও প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, বিশেষ করে তেল ও জ্বালানি সেক্টরে অস্থিতিশীলতার কারণে।
গ্লোবাল সাউথের সমালোচনাও বৃদ্ধির কারণে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠছে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এই নতুন অধ্যায়ে ইউরোপের ভূমিকা কিভাবে পরিবর্তিত হবে, তা বিশ্ব নজর রাখছে।