ভিন্নমত দমনে ভারতের কৌশল?
কাশ্মিরি নেত্রী আসিয়া আন্দ্রাবির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড
Printed Edition
আলজাজিরা
কাশ্মিরের প্রখ্যাত নেত্রী আসিয়া আন্দ্রাবিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়ার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন অধিকারকর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ৬৪ বছর বয়সী এই বৃদ্ধার বিরুদ্ধে এমন কঠোর রায় মূলত বিরোধপূর্ণ অঞ্চলে ভিন্নমত দমনে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি নীতিরই প্রতিফলন।
দুখতারান-এ-মিল্লাত (ডিইএম) নামক একটি নারী সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা আন্দ্রাবিকে ২৪ মার্চ নয়াদিল্লির একটি বিশেষ আদালত এই সাজা দেয়। তার দুই সহযোগী ৩৬ বছর বয়সী সোফি ফাহিমিদা এবং ৬১ বছর বয়সী নাহিদা নাসরিনকে ৩০ বছর করে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালে কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইন ইউএপিএ এবং রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে মামলা করা হয়েছিল। ভারতের ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ) আন্দ্রাবির বিরুদ্ধে ভারত সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা এবং সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নের অভিযোগ এনেছিল। তবে ২৯০ পৃষ্ঠার রায়ে বিচারক চান্দের জিৎ সিং স্বীকার করেছেন যে, সরাসরি সন্ত্রাসবাদ বা সশস্ত্র বিদ্রোহে যুক্ত থাকার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবুও তাকে ঘৃণা ছড়ানো, জাতীয় সংহতি বিনষ্ট এবং জনশৃঙ্খলা ভঙ্গের মতো অপোকৃত কম গুরুতর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
রায়ে আদালত উল্লেখ করেছে যে, আন্দ্রাবির বক্তব্য বা ভিডিওগুলোতে সরাসরি সহিংসতা উসকে দেয়ার প্রমাণ না থাকলেও কাশ্মির ভারতের অংশ নয় এবং এটি অবৈধভাবে দখল করা হয়েছে- এমন ধারণা তরুণদের মনে গেঁথে দেয়া বিপজ্জনক। এটি মানুষকে স্বাধীনতার জন্য যেকোনো পদ্ধতি বা সহিংসতা গ্রহণে প্ররোচিত করতে পারে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সাজা মূলত রাজনৈতিক বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে দেয়া হয়েছে। কাশ্মিরের একজন আইন গবেষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আদর্শ কোনো অপরাধ নয়, অপরাধ হলো কর্মকাণ্ড। কিন্তু বর্তমান সরকার ইউএপিএ আইনের পরিধি এতই বাড়িয়েছে যে এখন মানুষের চিন্তা বা আদর্শকেও অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। আন্দ্রাবির ছেলে আহমদ বিন কাসিম এই রায়কে তার মায়ের জন্য ‘মৃত্যুদণ্ড’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার বাবা আশিক হুসাইন ফাক্তও ১৯৯২ সাল থেকে বন্দী রয়েছেন। অন্য দিকে বিচারকের দাবি, বিচারে আসামিদের মধ্যে কোনো অনুশোচনা দেখা যায়নি, তাই তাদের প্রতি কোনো দয়া দেখানোর সুযোগ নেই।
আন্দ্রাবির ইতিহাস ও প্রোপট
১৯৬২ সালে শ্রীনগরে জন্ম নেয়া আন্দ্রাবি ১৯৮৭ সালে তার সংগঠন দুখতারান-এ-মিল্লাত গঠন করেন। শুরুতে এটি নারী অধিকার ও শিা নিয়ে কাজ করলেও পরে তা রাজনৈতিক সংগঠন হয়ে ওঠে। ১৯৮৭ সালের নির্বাচনের পর তিনি কাশ্মিরের পাকিস্তানের সাথে একীভূত হওয়ার কঠোর সমর্থক হয়ে ওঠেন। ২০১৯ সালে ভারত যখন কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন ও বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নেয়, তখন থেকে উপত্যকাটিতে ব্যাপক ধরপাকড় ও বিধিনিষেধ শুরু হয়। বিজেপি সমর্থিতরা বলছেন, আন্দ্রাবি দীর্ঘদিন ধরে দেশদ্রোহী কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিলেন এবং এই সাজা অনেক আগেই হওয়া উচিত ছিল।
তবে বিশ্লেষক আথার জিয়া মনে করেন, আন্দ্রাবির সামাজিক বা সাংস্কৃতিক রণশীলতার সমালোচনা করা যেতে পারে, কিন্তু তার রাজনৈতিক মতাদর্শের জন্য তাকে এভাবে অপরাধী সাব্যস্ত করা নাগরিক অধিকারের লঙ্ঘন। তিনি বলেন, কাশ্মিরে রাজনৈতিক প্রতিরোধকে দমন করার জন্য রাষ্ট্র একেক সময় একেক অজুহাত ব্যবহার করছে, যার সর্বশেষ শিকার আন্দ্রাবি ও তার সঙ্গীরা।