যানজট-জলাবদ্ধতা-দূষণ
বহুমুখী সঙ্কটে রাজধানী
Printed Edition
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ব্যস্ত ও ঘনবসতিপূর্ণ মহানগরী ঢাকা। প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র হওয়ায় প্রতিদিনই বাড়ছে এ নগরীর জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। কিন্তু একই সাথে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নানা ধরনের অনিয়ম এবং সমন্বিত ব্যবস্থাপনার অভাবে ঢাকা আজ এক চরম ভোগান্তির নগরীতে পরিণত হয়েছে। তীব্র যানজট, সামান্য বৃষ্টিতেই রেকর্ড জলাবদ্ধতা, ফুটপাথ দখল, বাতাসে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বহুগুণ বেশি ধুলাবালু, রাস্তায় যত্রতত্র ফেলা ময়লা-আবর্জনা, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় আবর্জনা স্থানান্তর কেন্দ্র (এসটিএস) এবং লাইসেন্স ও রুট পারমিটহীন বেআইনি গাড়ি চলাচল নগর জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। এক সময়ের সবুজ ও সুন্দর ঢাকা আজ বায়ুদূষণ এবং বাসযোগ্যতার আন্তর্জাতিক সূচকে প্রতিনিয়ত তলানীতে অবস্থান করছে। এ নগরীর অনিয়ম ও দৈনন্দিন সঙ্কটের পেছনের নেপথ্য কারণ এবং উত্তরণের বাস্তবসম্মত উপায়গুলো বিশ্লেষণ আজ জরুরি হয়ে পড়েছে।
ঢাকায় চলমান মূল অনিয়ম ও নাগরিক সঙ্কটের চিত্র
তীব্র যানজট ও গণপরিবহনে বিশৃঙ্খলা : ঢাকার রাজপথ থেকে অলিগলি সর্বত্রই যানজটের স্বাভাবিক দৃশ্য। একদিকে যেমন গণপরিবহনের সঙ্কট, অন্য দিকে শৃঙ্খলাহীন চলাচলের কারণে অল্প দূরত্বের পথ অতিক্রম করতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় অপচয় হচ্ছে। বাসগুলোর মধ্যে ওভারটেকিংয়ের প্রতিযোগিতা, নির্দিষ্ট স্টপেজ ছাড়া যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানো-নামানো এবং অপ্রতুল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এর অন্যতম প্রধান কারণ।
সামান্য বৃষ্টিতেই তীব্র জলাবদ্ধতা : বর্ষা মৌসুম তো বটেই, বছরের অন্য সময়েও সামান্য বৃষ্টিতে তলিয়ে যায় ঢাকার প্রধান সড়ক ও অলিগলি। ড্রেনেজ ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনা, নালা-নর্দমায় পলিথিন ও বর্জ্য আটকে থাকা এবং প্রাকৃতিক খালগুলো দখলের কারণে পানি নিষ্কাশন পথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে।
ফুটপাথ দখল ও পথচারীর ভোগান্তি : নগরীর বেশির ভাগ ফুটপাথ পথচারীদের চলাচলের অনুপযোগী। হকারদের স্থায়ী-অস্থায়ী দোকান, গাড়ি পার্কিং, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালামাল রাখা এবং নানা ধরনের অবৈধ দখলের কারণে পথচারীদের বাধ্য হয়ে মূল সড়ক দিয়ে হাঁটতে হয়। এতে একদিকে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে, অন্যদিকে মূল সড়কে গাড়ির গতি কমে গিয়ে যানজট সৃষ্টি হয়।
ধূলিদূষণ ও বায়ুমণ্ডলের বিষাক্ততা : ঢাকার বাতাস বছরের অধিকাংশ সময় অস্বাস্থ্যকর ও বিপজ্জনক পর্যায়ে থাকে। খোলা ট্রাকে উন্মুক্ত অবস্থায় মাটি, বালু ও নির্মাণসামগ্রী পরিবহন, রাস্তার পাশে কখনো হালকা আবার কখনো কোনো ধরনের বেষ্টনী ছাড়া বহুতল ভবন নির্মাণ, সংস্কারের নামে বছরের পর বছর রাস্তা খুঁড়ে রাখা এবং নিয়মিত পানি না ছিটানোর ফলে বাতাসে ধুলাবালির পরিমাণ বিপজ্জনকভাবে বেড়ে চলেছে। এতে শ্বাসকষ্ট ও অ্যাজমাসহ বিভিন্ন জটিল ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন নগরবাসী।
যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ও এসটিএস ভোগান্তি: সিটি করপোরেশনের নানামুখী উদ্যোগ সত্ত্বেও নগরীর অলিগলি এবং মূল সড়কে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ দেখা যায়। এ ছাড়া ঘনবসতিপূর্ণ ও জনবহুল আবাসিক এলাকায় বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র বা সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) স্থাপন করায় সংলগ্ন এলাকার বাতাস পচা গন্ধে বিষাক্ত হয়ে পড়ছে। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন আশপাশের অধিবাসী ও পথচারীরা।
বেআইনি গাড়ি ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের দাপট : রাজধানীতে রুট পারমিট ও ফিটনেসবিহীন হাজার হাজার লেগুনা, অটোরিকশা এবং ঝুঁকিপূর্ণ ফিটনেসহীন বাস চলাচল করছে। এসব যানবাহনের অনেক চালকেরই বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। ফলে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা এবং সড়কে তৈরি হচ্ছে বিশৃঙ্খলা।
এসব সমস্যার নেপথ্যে কারা? দায় ও কারণ বিশ্লেষণ
ঢাকার এই বহুমুখী সঙ্কট কোনো একক কারণে সৃষ্টি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, তদারকির অভাব এবং নাগরিক অসচেতনতা।
সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব : ঢাকায় সিটি করপোরেশন, রাজউক, ডিএমপি ট্রাফিক, ওয়াসা, ডিপিডিসি, বিআরটিএসহ সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে দুই ডজনেরও বেশি। কিন্তু এসব সংস্থার কাজের মধ্যে সঠিক সমন্বয়ের তীব্র অভাব রয়েছে। এক সংস্থা রাস্তা তৈরি করার কিছুদিন পরই অন্য সংস্থা তা খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করে, যা যানজট ও ধুলাবালুর বড় উৎস।
নজরদারি ও আইন প্রয়োগে শিথিলতা : সড়ক পরিবহন আইন ও পরিবেশ সংরক্ষণ আইন থাকলেও সেগুলোর যথাযথ ও ধারাবাহিক প্রয়োগ দেখা যায় না। অবৈধ পার্কিং, ফুটপাথ দখল বা পরিবেশ দূষণকারীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান কার্যকর না থাকায় অনিয়মই একপর্যায়ে বিধিতে পরিণত হয়েছে।
দুর্নীতি ও সুবিধাভোগী চক্র : ফুটপাথ দখল, বেআইনি গাড়ি চলাচল এবং বর্জ্য অব্যবস্থাপনার পেছনে বিভিন্ন প্রভাবশালী চক্র, চাঁদা আদায়কারী গ্রুপ এবং কিছু অসৎ কর্মকর্তার সিন্ডিকেট জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। এই কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহল কোনো স্থায়ী সমাধান বা নিয়ম বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করে।
দুর্বল অবকাঠামো : ঢাকার আয়তনের তুলনায় সড়কের পরিমাণ মাত্র সাত-আট শতাংশ, যেখানে একটি আধুনিক নগরীতে অন্তত ২৫ শতাংশ সড়ক থাকা প্রয়োজন। এছাড়া বাস রুট রেশনালাইজেশন বাস্তবায়ন বা গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন না করা বছরের পর বছর পিছিয়ে পড়া এ সঙ্কটের বড় কারণ।
পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ ও নালা-খাল দখল : বিগত কয়েক দশকে ঢাকার বেশির ভাগ প্রাকৃতিক জলাশয়, নিচু জমি ও খাল ভরাট করে আবাসন ও ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি বের হওয়ার কোনো স্বাভাবিক পথ অবশিষ্ট নেই।
নাগরিক অসচেতনতা: অসচেতনতার কারণে অনেক নাগরিক নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা না ফেলে ড্রেনে বা রাস্তায় ফেলছেন, যা ড্রেনেজ ব্যবস্থা অকার্যক করে দেয়। এ ছাড়াও ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা সঙ্কটের গভীরতা বাড়াচ্ছে।
সমাধানের উপায় : মেগা সিটিকে বাসযোগ্য করার রূপরেখা
ঢাকাকে একটি সচল, নিরাপদ ও বাসযোগ্য নগরীতে রূপান্তর করতে হলে জরুরি ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে :
১. আধুনিক ও সুশৃঙ্খল পরিবহন ব্যবস্থা
বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি চালু: নির্দিষ্ট রুটে একক বা সীমিত কয়েকটি কোম্পানির অধীনে নির্দিষ্ট রঙের বাস পরিচালনা করা এবং সব বাসকে একটি সুনির্দিষ্ট টিকিট ব্যবস্থার আওতায় আনা প্রয়োজন। মরহুম আনিসুল হক ঢাকা উত্তরের মেয়র থাকাকালে এ প্রচেষ্টা শুরু হলেও দীর্ঘসময়েও সে প্রচেষ্টা সফল হয়নি।
ফিটনেসহীন যান চলাচল বন্ধ : বিআরটিএ ও ট্রাফিক পুলিশের কঠোর যৌথ অভিযানের মাধ্যমে লাইসেন্সহীন ও ফিটনেসবিহীন সব ধরনের যানবাহন সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়া।
মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের রুট বিস্তার : গণপরিবহন হিসেবে মেট্রোরেলের নেটওয়ার্ক দ্রুত সম্পন্ন করা এবং দূরপাল্লার দূরবর্তী বাস টার্মিনালগুলো শহরের বাইরে স্থানান্তরিত করা।
২. ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও খাল উদ্ধার
প্রাকৃতিক জলধারা পুনরুদ্ধার : ঢাকার সমস্ত খাল ও ড্রেন থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে পানি নিষ্কাশন পথ সচল করা। সমন্বিত ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান : সিটি করপোরেশন ও ওয়াসার ড্রেনেজ নেটওয়ার্কের নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং ধারণক্ষমতা বাড়ানো।
৩. পথচারীবান্ধব ফুটপাথ ও অবৈধ দখলমুক্তকরণ
জিরো টলারেন্স নীতি : শহরের প্রধান সড়কগুলোর ফুটপাথ সম্পূর্ণরূপে দখলমুক্ত করা। নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান চালুর পাশাপাশি হকারদের জন্য নির্দিষ্ট স্থান ও সময় (যেমন : সান্ধ্যকালীন বাজার বা উইকেন্ড মার্কেট) নির্ধারণ করে দেয়া।
ফুটপাথ সংস্কার : চলাচলের উপযোগী মসৃণ, উঁচু ও বাধাহীন ফুটপাথ তৈরি এবং দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের চলাচলের উপযুক্ত ব্যবস্থা রাখা।
৪. বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও এসটিএস পুনর্বিন্যাস
আবদ্ধ ও অত্যাধুনিক এসটিএস : আবাসিক ও জনবহুল এলাকা থেকে এসটিএস সরিয়ে সুবিধাজনক স্থানে স্থানান্তর করা। এসটিএসগুলোকে সম্পূর্ণ আবদ্ধ এবং আধুনিক গন্ধমুক্ত প্রযুক্তি দিয়ে সজ্জিত করা।
উৎসস্থলে বর্জ্য পৃথকীকরণ : বাড়িঘর থেকে ময়লা সংগ্রহের সময়ই পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য আলাদা করার নিয়ম বাধ্যবাধকতা করা। যত্রতত্র ময়লা ফেললে কঠোর জরিমানার ব্যবস্থা করা।
৫. ধূলিদূষণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশ সুরক্ষা
নিয়মিত পানি ছিটানো ও যান্ত্রিক সুইপিং : সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে প্রধান সড়কগুলোতে সকালে ও বিকেলে নিয়মিত পানি ছিটানো এবং ভ্যাকুয়াম সুইপার দিয়ে ধুলা পরিষ্কার করা। স্বল্প পরিসরে এ কাজ চালু রাখলেও বেশির ভাগ সড়কই এর আওতার বাইরে থাকছে।
নির্মাণকাজে কঠোর পরিবেশবিধি : ভবন বা অবকাঠামো নির্মাণের সময় চতুর্দিক ঢেকে রাখা বাধ্যতামূলক করা এবং মাটিকাটা ও বালি বহনের কাজে ঢাকনাবিহীন ট্রাক ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা।
৬. একমুখী নগর কর্তৃপক্ষ ও কঠোর আইন প্রয়োগ
সমন্বিত নগরায়ণ কর্তৃপক্ষ : ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার সমস্ত সেবা সংস্থাকে একক প্রশাসনিক ছাতার নিচে এনে সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা।
ডিজিটাল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা : ট্রাফিক সঙ্কেত ও তদারকিতে ম্যানুয়াল পদ্ধতির বদলে সিসিটিভি ক্যামেরা ও অটোমেটিক ট্রাফিক ফাইন সিস্টেম চালু করা, যাতে অপরাধী রেহাই না পায়। সম্প্রতি কয়েকটি পয়েন্টে অটোমেটিক ট্রাফিক ফাইন সিস্টেম চালু হলেও এখনো বেশির ভাগ পয়েন্ট এর আওতার বাইরে রয়েছে।
ঢাকা কেবল একটি শহর নয়, এটি পুরো দেশের অর্থসামাজিক অগ্রগতির ইঞ্জিন। রাজধানী যদি এভাবে স্থবির ও দূষিত হতে থাকে, তবে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পুরো দেশের সার্বিক প্রবৃদ্ধিতে। ঢাকার বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান রাতারাতি সম্ভব নয়, তবে দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং সেবা সংস্থাগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি সম্ভব। সরকারি পদক্ষেপের পাশাপাশি নগরবাসী হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্বশীল আচরণই পারে রাজধানী ঢাকাকে একটি পরিচ্ছন্ন, সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ নগরীতে পরিণত করতে।