এক অমোচনীয় ট্র্যাজেডির স্মারক পিলখানার দরবার হল

বিকেল ২ থেকে ৪ ঘটিকা-মৃত্যুর করিডোর, বেঁচে থাকার আর্তনাদ

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

দুপুর গড়িয়ে বিকেল। ঢাকার পিলখানায় অবস্থিত দরবার হল, যে প্রাঙ্গণ এক সময় আনুষ্ঠানিকতা, কুচকাওয়াজ আর পদক বিতরণের গর্বময় স্মৃতিতে ভরা ছিল- সেই হলরুম কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রূপ নেয় মৃত্যুকূপে। সদর দফতরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক, গুলির শব্দ, আর লাশ টেনে নেয়ার নিষ্ঠুর বাস্তবতা। এই সময়টুকুই ছিল সবচেয়ে অন্ধকার, ১৪ থেকে ১৮ ঘটিকা। প্রত্যদর্শীদের বয়ান, বেঁচে ফেরা কয়েকজন অফিসারের স্মৃতি, আর তদন্ত-সূত্র মিলিয়ে সেই বিকেলের একটি মর্মস্পর্শী পুনর্গঠন-

মেজর জেনারেল (অব.) ফজলুর রহমানের নেতৃত্বাধীন বিডিআর পিলখানা ম্যাসাকারের তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনের লোমহর্ষক বর্ণনায় এ চিত্র ওঠে আসে। পুরো ম্যাসাকারের ঘটনা বিভিন্ন প্রত্যদর্শী বর্ণনায় ওঠে আসে।

ওয়াশরুমে অবরুদ্ধ এক অফিসার : ‘স্যার শেষ...’

উত্তর-পশ্চিম কোণের একটি ওয়াশরুম। প্লাস্টিকের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। ভেতরে লুকিয়ে ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল কামরুজ্জামান (নাম অনুসারে)। বাইরে ভাঙচুর, পায়ের শব্দ, গালাগালি।

‘এই টয়লেটের দরজা বন্ধ, ভেতরে কেউ আছে নাকি?’

দেয়াল টপকে একজন উঁকি দেয়। ‘ভেতরে আছে!’

তিনি কাঁপা গলায় বলেন, ‘আমাকে মারবেন না... আমি কোনো অন্যায় করিনি।’

উত্তর আসে বিদ্বেষে, ‘তোমাদের জন্য আমরা জুতা পালিশ করি!’

দরজায় ৬-৭ রাউন্ড গুলি। ভাগ্যক্রমে গায়ে লাগে না। পরে দরজা ভেঙে ঢুকে একজন অস্ত্র তাক করে। তিনি ব্যারেলের মাথা চেপে ধরে ফেলেন। ধস্তাধস্তি। তখনই অন্য একজন বলে ওঠে- ‘স্যার, এত গুলিতেও মরে নাই... কোয়ার্টার গার্ডে নিয়ে যাই।’

এই একটুকু মানবিকতা, অথবা কৌশল, তাকে কয়েক ঘণ্টা জীবন দেয়। কিন্তু বাইরে বেরিয়ে তিনি যা দেখলেন, তা জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ভোলার নয়, সারি সারি নিথর দেহ। সহকর্মীদের রক্তমাখা ইউনিফর্ম।

পেছনের ড্রেনের পাশে : লুকিয়ে থাকা তিন জীবন

দরবার হলের পেছনে ড্রেনের ধারে আরেকটি গোপন আশ্রয়। কর্নেল আনতাব, মেজর ইকবাল ও মেজর মনিরুল- তিনজন চুপচাপ গুটিসুটি মেরে।

বারবার সশস্ত্র দল এসে খোঁজ করছে।

গাড়ির শব্দ। লাশ তোলার শব্দ। ধাতব দরজা ঠকঠক।

মেজর ইকবাল ফিসফিস করেন, ‘এখানে থাকলে মেরে ফেলবে... বের হই।’

তিনি ঝুঁকি নেন। মশারির জাল ভেঙে বেরিয়ে পড়েন। হাতে একটা ঝুড়ি, মুখে অজুহাত, ‘আমি জহির... বাইরে যাই।’

এই অভিনয়েই তিনি বাঁচেন। কিন্তু কর্নেল আনতাব আর ফেরেননি।

বিকেলের দিকে : লাশ সরানোর প্রক্রিয়া

১৪০০ ঘণ্টা পার হতেই দরবার হলের চরিত্র বদলে যায়। হলরুমের ভেতর ছড়ানো প্রায় ২৫-৩০টি দেহ। কেউ ইউনিফর্মে, কেউ রক্তে ভেজা।

দায়িত্বপ্রাপ্ত কয়েকজনকে দিয়ে লাশ তোলা হচ্ছে। পিকআপ, থ্রি-টন ট্রাক, স্টোরেজের পাশ। কারও দেহ চালের বস্তায় ঢোকানো। কারও মাথায় বেয়নেটের খোঁচা।

কেউ কেউ ব্যঙ্গ করে বলে- ‘খেয়ে দেয়ে তো মোটা হয়েছো, এখন দেখো কেমন লাগে!’

মানবিকতার সব সীমা ভেঙে পড়েছিল সেই বিকেলে।

সন্ধ্যার আগে : দরবার হল এক মৃত্যুনগরী

১৮ ঘটিকার দিকে আলো কমে আসে। বাইরে অ্যাম্বুলেন্স আসা-যাওয়া করছে। ড্রেন ধুয়ে রক্তের দাগ মুছছে পানি।

একজন লুকিয়ে থাকা অফিসার পরে বলেন, রাতভর ২০-৩০ জন সশস্ত্র লোকের কথাবার্তা শুনেছেন। কেউ মোবাইলে বলছে, ‘সিচুয়েশন কন্ট্রোল।’ কেউ বলছে, ‘১৫ জন মারছি... মোট ৬০-৭০ গেছে।’

এই শব্দগুলোই ছিল সেই হলরুমের রাতের সঙ্গীত।

ইতিহাসের রক্তাক্ত অধ্যায়

পিলখানার এই ট্র্যাজেডি শুধু একটি ভবনের নয়, পুরো বাহিনীর ইতিহাসে ত তৈরি করে। তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলস-এর শতাধিক কর্মকর্তা প্রাণ হারান।

দরবার হল, যা ছিল শপথ আর সম্মানের স্থান, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হয়ে ওঠে-

নির্মম হত্যাযজ্ঞের সাী।

দেয়ালগুলো এখনো কি শুনতে পায়?

আজও সেই হলরুমে গেলে কেউ কেউ বলেন, দেয়ালগুলো যেন কথা বলে। মেঝেতে যেন অদৃশ্য রক্তের দাগ। টয়লেটের দরজায় গুলির প্রতিধ্বনি।

১৪০০ থেকে ১৮০০ ঘণ্টা চার ঘণ্টা মাত্র। কিন্তু সেই চার ঘণ্টাই বদলে দিয়েছিল একটি বাহিনীর ইতিহাস, শত পরিবারের ভবিষ্যৎ, আর একটি দেশের সামরিক স্মৃতিকে।

দরবার হল তাই শুধু স্থাপনা নয়, একটি নীরব সাী, এক অমোচনীয় ট্র্যাজেডির স্মারক পিলখানার দরবার হল।