যে প্রাণীর ১ লিটার রক্তের দাম ১৮ লাখ টাকা : আসআদ শাহীন
Printed Edition
সমুদ্রের বালুকাবেলায় অদ্ভুত এক জীব দেখা যায়, যার দেহ দেখতে অনেকটা ঘোড়ার খুরের মতো, তাই এর নাম হর্সশু ক্র্যাব (Horseshoe Crab)। প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন বছর ধরে টিকে থাকা এই প্রাচীন সামুদ্রিক প্রাণীকে বলা হয় ‘living fossil’s বা জীবন্ত জীবাশ্ম। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়- এই জীবটি শুধু সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রেই নয়, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে জীবনরক্ষাকারী ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে এর রক্তই আজকের চিকিৎসা-জগতে ‘অদৃশ্য নীল রক্ষাকবচ’ হিসেবে খ্যাত।
হর্সশু ক্র্যাবের রক্তের অনন্য বৈশিষ্ট্য
হর্সশু ক্র্যাবের রক্ত মানুষের রক্তের মতো লোহা (Iron) নয়; বরং তামা (Copper) দ্বারা সমৃদ্ধ। ফলে রক্তের রঙ হয় নীলচে। এই নীল রক্তে একটি বিশেষ কোষ থাকে- Amoebocyte, যা ব্যাক্টেরিয়ার endotoxin (lipopolysaccharide)-এর সংস্পর্শে এলে সাথে সাথে জমাট বাঁধে (coagulate)। ১৯৫৬ সালে বিজ্ঞানীরা এই বৈশিষ্ট্য আবিষ্কার করেন এবং পরবর্তীতে Limulus Amebocyte Lysate (LAL) Test উদ্ভাবন করেন। এই টেস্টই আজ বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বায়োমেডিক্যাল সেফটি টেস্টগুলোর একটি।
চিকিৎসা বিজ্ঞানে হর্সশু ক্র্যাবের রক্তের ব্যবহার
১. ওষুধ ও ভ্যাকসিন নিরাপত্তা পরীক্ষা (Endotoxin detection) যেকোনো ইনজেকশন, টিকা, ইমপ্লান্ট বা আইভি সলিউশনে যদি সামান্য ব্যাক্টেরিয়াল টক্সিন থাকে, তা মানুষের শরীরে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া ঘটাতে পারে। এই কারণে প্রতিটি ব্যাচের ভ্যাকসিন বা ওষুধ বাজারজাতের আগে LAL Test দিয়ে যাচাই করা হয়। ফলে হর্সশু ক্র্যাবের রক্তই কার্যত মানবজীবনের নিরাপত্তার প্রথম প্রতিরোধ-প্রাচীর।
২. সার্জিক্যাল ও বায়োমেডিক্যাল যন্ত্রের পরীক্ষা : ক্যাথেটার, পেসমেকার, কৃত্রিম জয়েন্ট বা হার্ট ভাল্বের মতো যন্ত্রপাতিও এই পরীক্ষার আওতায় আসে। যদি এসব যন্ত্রে সামান্য ব্যাকটেরিয়া থাকে, তা রোগীর শরীরে সেপসিস সৃষ্টি করতে পারে।
LAL টেস্ট এমন সংক্রমণ প্রতিরোধে অপরিহার্য ভূমিকা রাখছে।
৩. নতুন প্রজন্মের সেল্যুলার থেরাপি ও জিন থেরাপি : সাম্প্রতিক বছরগুলোতে MRNA ভ্যাকসিন (যেমন- Pfizer-BioNTech I Moderna) এবং gene therapy Products তৈরির ক্ষেত্রেও এই টেস্ট ব্যবহৃত হয়েছে, যাতে নিশ্চিত করা যায় কোনো এন্ডোটক্সিন উপস্থিত নেই।
বিকল্প উদ্ভাবন ও নৈতিক বিতর্ক
হর্সশু ক্র্যাবের রক্ত সংগ্রহের জন্য প্রতি বছর প্রায় পাঁচ লাখের বেশি ক্র্যাব ধরা হয় (বিশেষত আমেরিকা ও এশিয়ার উপকূলে)। রক্ত সংগ্রহের পর অনেক ক্র্যাব মারা যায় বা প্রজননক্ষমতা হারায়, ফলে প্রজাতিটি বিপন্ন হতে শুরু করেছে। এ জন্য পরিবেশবিদ ও নৈতিক গবেষকরা বিকল্পের সন্ধান করেন। ২০১৬ সালে জাপান ও ইউরোপের গবেষকরা আবিষ্কার করেন RFC Test (recombinant Factor c), যা জিন প্রকৌশলের মাধ্যমে LAL-এর বিকল্প হিসেবে তৈরি হয়েছে।
তবে এখনো অনেক দেশ ও ওষুধ কোম্পানি LAL টেস্টকে মানদণ্ড হিসেবে ধরে রেখেছে, কারণ RFC-এর জন্য সর্বজনীন রেগুলেটরি অনুমোদন এখনো সম্পূর্ণ হয়নি (বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রে FDA ধীরে ধীরে অনুমোদনের দিকে যাচ্ছে)।
পরিবেশগত ও নৈতিক ভারসাম্য
হর্সশু ক্র্যাব শুধু চিকিৎসা নয়, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যেরও অংশ। এর ডিম migratory shorebirds-এর প্রধান খাদ্য। তাই এদের ব্যাপক শিকার সমুদ্রবাস্তুতন্ত্রে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করতে পারে। এই কারণে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ও দক্ষিণ এশিয়ার কিছু দেশে ‘migratory shorebirds’ নীতিমালা অনুসারে রক্ত সংগ্রহ করা হয়, যাতে প্রাণহানি কমানো যায়।
ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা
২১ শ’ শতকে বায়োটেকনোলজির অগ্রগতির সাথে সাথে হর্সশু ক্র্যাবের রক্ত থেকে অনুপ্রাণিত সিন্থেটিক বায়োসেন্সর, molecular endotoxin detectors, এবং AI-assisted safety testing প্রযুক্তি বিকশিত হচ্ছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত চিকিৎসাবিজ্ঞানে জীবন্ত ক্র্যাবের নীল রক্তই জীবনরক্ষাকারী মানদণ্ড হিসেবে অপরিহার্য।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়, হর্সশু ক্র্যাবের রক্তের দাম ও বাণিজ্যিক মূল্য কত? আসুন জেনে নিই-
প্রতি লিটার বা আউন্সের দাম : বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদন ও বাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হর্সশু ক্র্যাবের রক্তের দাম প্রতি লিটার প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত অর্থাৎ- প্রতি গ্যালন (৩.৭৮ লিটার) রক্তের দাম আনুমানিক ৬০-৭৫ হাজার মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় হিসাব করলে প্রতি লিটার রক্তের দাম দাঁড়ায় প্রায় ১৮-২৪ লাখ টাকা!
এ কারণেই বিজ্ঞানীরা একে বলেন- ‘The most expensive blood in the world.’
কেন এত দামি? : এর মূল কারণ হলো এতে থাকা বিশেষ প্রতিরোধ-উপাদান -Limulus Amebocyte Lysate (LAL), যা ব্যাক্টেরিয়ার endotoxin শনাক্ত করতে ব্যবহৃত হয়। এই পদার্থ কৃত্রিমভাবে তৈরি করা অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল আর হর্সশু ক্র্যাবের রক্ত থেকেই একমাত্র প্রাকৃতিকভাবে এটি পাওয়া যায়। প্রতিটি ক্র্যাব থেকে সাধারণত ৩০ শতাংশ রক্ত (প্রায় ৩০-৫০ মিলিলিটার) সংগ্রহ করা হয়, যা থেকে অত্যন্ত অল্প পরিমাণে (কয়েক গ্রাম) বিশুদ্ধ LAL পাওয়া যায়। ফলে প্রক্রিয়াটি শ্রমঘন, ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল।
বার্ষিক উৎপাদন ও বাজার চাহিদা : প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে আনুমানিক পাঁচ লাখের বেশি হর্সশু ক্র্যাব ধরা হয়। এগুলোর রক্ত থেকে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের বায়োটেস্ট উপাদান প্রস্তুত হয়।
চিকিৎসা শিল্পে ব্যবহৃত প্রতিটি ভ্যাকসিন, ইনজেকশন, আইভি তরল ও সার্জিক্যাল যন্ত্র বাজারজাতের আগে LAL টেস্টের মধ্য দিয়ে যায় - ফলে এর চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মোট কথা, হর্সশু ক্র্যাব প্রকৃতির এক বিস্ময় যে, প্রাণীটি কোটি বছর আগেও ছিল, আজও মানবজীবন রক্ষা করছে। এর নীল রক্ত মানবজাতিকে সংক্রমণের অদৃশ্য শত্রুর হাত থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তবে আমাদের দায়িত্ব- এই অনন্য প্রাণী ও এর বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষা করা, যাতে বিজ্ঞানের অগ্রগতি ও প্রকৃতির ভারসাম্য একসাথে টিকে থাকে।
লেখক : গবেষক ও প্রাবন্ধিক, চট্টগ্রাম