ইসলামপুরে ঈদে ভিজিএফ কার্ড বরাদ্দ ৪ ভাগের ১ ভাগ

হতাশ নদী ভাঙনকবলিত ৫০ হাজার পরিবার

Printed Edition

খাদেমুল বাবুল জামালপুর

দেশের দরিদ্রতম উপজেলার মধ্যে অন্যতম ইসলামপুর উপজেলা। এই উপজেলার বুক চিরে বয়ে গেছে যমুনা নদী ও ব্রহ্মপুত্র নদসহ একাধিক নদ-নদী। ফলে বন্যা ও নদীভাঙনের সাথে লড়াই করেই টিকে থাকতে হয় এখানকার মানুষের। এই বাস্তবতায় ঈদের আগে ভিজিএফ খাদ্য সহায়তা তাদের জন্য ছিল বড় ভরসা। কিন্তু আসন্ন ঈদুল ফিতরে সেই সহায়তার বরাদ্দ নেমে এসেছে চার ভাগের এক ভাগে- যা নিয়ে হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে উপজেলার সর্বত্র।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস (পিআইও) সূত্রে জানা যায়, প্রতি বছর ঈদ উপলক্ষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় অসহায়-দরিদ্র পরিবারগুলোকে বিনামূল্যে ১০ কেজি করে চাল দেয়া হয়। ২০২৫ সালে ঈদুল আজহায় ইসলামপুরে ৪৬ দশমিক ৬১০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ ছিল, যা ১২টি ইউনিয়নের ৪৬ হাজার ৬১০টি পরিবারের মাঝে বিতরণ করা হয়। অথচ আসন্ন ঈদুল ফিতরে বরাদ্দ এসেছে মাত্র ১৩৮ দশমিক ৩৪০ মেট্রিক টন। যে বরাদ্দ সর্বোচ্চ ১৩ হাজার ৮৩৪টি পরিবারকে সহায়তা দেয়া সম্ভব।

ফলে ঈদুল ফিতরে সরকারের খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ভিজিএফ সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে অন্তত ৩২ হাজার ২২৭টি অসহায় ও দরিদ্র পরিবার। বরাদ্দ কমার খবর প্রকাশের পর ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন নদী ভাঙনকবলিত ও ছিন্নমূল মানুষেরা।

ত্রাণ শাখা সূত্র জানায়, গত ঈদে যেখানে ৪৬ হাজার ৬১০টি ভিজিএফ কার্ড ছিল, সেখানে এবার তা নেমে এসেছে ১৩ হাজার ৮৩৪টিতে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সাধারণত ঈদ, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়সহ দুর্যোগ পরিস্থিতি বিবেচনায় ভিজিএফ বরাদ্দ দিয়ে থাকে। জনসংখ্যা, দরিদ্রতার হার ও দুর্যোগ ঝুঁকি বিবেচনায় সুবিধাভোগীর সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়।

ইসলামপুরে ১২টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত জামালপুর-২ সংসদীয় আসনে ভোটার সংখ্যা দুই লাখ ৮২ হাজার ১০৩ জন। উপজেলা পরিসংখ্যান অফিসের তথ্য অনুযায়ী মোট জনসংখ্যা প্রায় তিন লাখ। বরাদ্দপত্রে জনসংখ্যার ভিত্তিতে হিসাব দেখানো হলেও স্থানীয়দের প্রশ্ন- গত বছর যেখানে ৪৬ হাজারের বেশি কার্ড ছিল, এ বছর কোন যুক্তিতে তা ১৩ হাজারে নেমে এলো?

বেলগাছা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক বলেন, গত বছর আমার ইউনিয়নে তিন হাজার ৪৩৭টি কার্ড ছিল। এবার পেয়েছি মাত্র এক হাজার ৩২টি। যমুনা নদীর ভাঙনে আমার ইউনিয়নের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ অসহায়। এই স্বল্প কার্ড কাকে বাদ দিয়ে কাকে দেবো- ভেবেই পাচ্ছি না।

কুলকান্দী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান আনিছ জানান, আমার ইউনিয়নের ৯০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে। গত বছর দুই হাজার ৬১০টি কার্ড ছিল, এবার এসেছে মাত্র ৫৭৪টি। মানুষকে কীভাবে বোঝাব, জানি না।

চিনাডুলী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুস ছালাম বলেন, আমাদের ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে পাঁচটি যমুনা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। প্রায় ২৫ হাজার মানুষ বাস্তুহারা। গত বছর চার হাজার ৩১৭টি কার্ড ছিল, এবার মাত্র এক হাজার ২৯৭টি। এত কম কার্ড কীভাবে বণ্টন করবো?

এ বিষয়ে ইসলামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নামজুল হুসাইন বলেন, বিষয়টি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে অবগত নই।

অন্য দিকে জামালপুর-২ (ইসলামপুর) আসনের সংসদ সদস্য এ ই সুলতান মাহমুদ বাবু জানান, বিষয়টি এখনো তার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পৌঁছায়নি। তবে তিনি এ নিয়ে ত্রাণমন্ত্রীর সাথে কথা বলবেন বলে আশ্বাস দেন।

সব মিলিয়ে, নদীভাঙন ও দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত ইসলামপুরে ঈদের ভিজিএফ বরাদ্দ হ্রাস নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। স্থানীয়দের দাবি- বাস্তব দুর্যোগ পরিস্থিতি বিবেচনায় দ্রুত বরাদ্দ পুনর্বিবেচনা করা না হলে ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হবে হাজারো পরিবার।