এমপিওভুক্তি জটিলতায় কারিগরি শিক্ষকদের বেতন নিয়ে ভোগান্তি
Printed Edition
শাহেদ মতিউর রহমান
এমপিওভুক্তির জটিলতায় বেসরকারি কারিগরি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বেতন নিয়ে ভোগান্তির সৃষ্টি হয়েছে। যদিও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগকৃত শিক্ষকদের এ বিষয়ে কোনো জটিলতা নেই ফলে তাদের বেতনভাতা নিয়েও কোনো সমস্যা তৈরি হচ্ছে না। কিন্তু কারিগরি শিক্ষকরা চাকরিতে যোগদান করেও বেতন না পেয়ে চরমভাবে ভোগান্তিতে পড়েছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায় বেসরকারি শিক্ষা খাতে দীর্ঘ দিনের শিক্ষক সঙ্কট নিরসনে ষষ্ঠ গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বড় পরিসরে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করেছে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)। গণবিজ্ঞপ্তিতে স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৪১ হাজারের বেশি প্রার্থীকে সম্প্রতি নিয়োগের সুপারিশ করা হয়। সুপারিশের দীর্ঘ সময় পর স্কুল-কলেজ ও মাদরাসার শিক্ষকদের এমপিও হলেও এখনো এমপিওভুক্ত হতে পারেননি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুপারিশপ্রাপ্ত বিপুলসংখ্যক শিক্ষক। ফলে মাসের পর মাস বেতনভাতা না পেয়ে চরম আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন তারা।
জানা যায়, দেশের স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, কারিগরি ও ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মোট এক লাখ ৮২২টি শূন্য পদের বিপরীতে ষষ্ঠ গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে এনটিআরসিএ। তবে যোগ্য প্রার্থী না থাকায় ৪১ হাজার ৬২৬ জন নিয়োগ সুপারিশ করা হয়। সুপারিশপ্রাপ্তদের মধ্যে অধিকাংশ শিক্ষক এমপিওভুক্ত হতে পারলেও কারিগরির শিক্ষকরা পড়েছেন বিপাকে। শিক্ষকদের অভিযোগ, নিয়োগে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতার কারণে তারা চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। সুপারিশ পাওয়া সত্ত্বেও এমপিওভুক্তি না হওয়ায় অনেক শিক্ষককে মাসের পর মাস বেতন ছাড়াই পাঠদান করতে হচ্ছে। এর ফলে যোগ্য ও অভিজ্ঞ শিক্ষকরা কর্মস্পৃহা হারাচ্ছেন, যা কারিগরি শিক্ষার গুণগত মান ও ধারাবাহিকতাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
এ ছাড়া এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে এখনো এনালগ পদ্ধতি থাকায় অর্থাৎ ডিজিটাল পদ্ধতি কার্যকর না হওয়ায় আবেদন, যাচাই ও অনুমোদনের প্রতিটি ধাপে অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। দীর্ঘ দিন ধরে এই সমস্যাগুলো অব্যাহত থাকায় শিক্ষকরা মানসিক চাপ ও প্রশাসনিক জটিলতার শিকার হচ্ছেন। এ অবস্থায় এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজড করাসহ দ্রুত এমপিওভুক্তির দাবি জানিয়েছেন শিক্ষকরা। সুপারিশপ্রাপ্ত এক শিক্ষক বলেন, ‘সুপারিশ পাওয়ার দীর্ঘ সময় পার হলেও এখনো আমার এমপিও কার্যকর হয়নি। অথচ একই সময়ে সুপারিশপ্রাপ্ত অন্য শিক্ষকরা নিয়মিত বেতনভাতা পাচ্ছেন। এতে করে স্পষ্টতই বৈষম্যের শিকার হতে হচ্ছে আমাদের। এ ধরনের পরিস্থিতি একজন শিক্ষক হিসেবে আমাদের জন্য চরম হতাশাজনক ও অনাকাক্সিক্ষত। তিনি আরো বলেন, সরকারের কাছে আমাদের বিনীত অনুরোধ; যেন এই বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে দ্রুত আমাদের এমপিওভুক্তি নিশ্চিত করা হয় এবং ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দেয়া হয়।’
তবে এ বিষয়ে আশার কথা জানিয়েছে কারিগরি শিক্ষা অধিদফতর। অধিদফতরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এমপিও সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে কাজ চলছে এবং শিগগিরই সুপারিশপ্রাপ্ত কারিগরি শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। এতে দীর্ঘ দিনের অপেক্ষার অবসান ঘটবে বলে প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট মহলের। এ ব্যাপারে কারিগরি শিক্ষা অধিদফতরের পরিচালক (পিআইইউ) মাকসুদুর রহমান বলেন, শিক্ষক এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়ায় অধিদফতর থেকে মোট ৪০০টি ফাইল উত্থাপন করা হয়েছে। এই ফাইলগুলো যাচাই-বাছাই করে দুইটি পৃথক লটে শিক্ষক এমপিওভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ধাপে ২৮০টি ফাইল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের এমপিওভুক্তি শিগগিরই সম্পন্ন হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি আরো বলেন, বর্তমানে কারিগরি শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক (ডিজি) ছুটিতে থাকায় এসব ফাইলে স্বাক্ষর করা সম্ভব হয়নি। তবে তিনি দায়িত্বে ফিরলেই ২৮০টি ফাইলে স্বাক্ষর করবেন এবং এর মাধ্যমে শিক্ষকরা দ্রুত এমপিও সুবিধার আওতায় আসবেন। এরপর পরবর্তী ধাপে বাকি ফাইলগুলোর বিষয়েও প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।
এ দিকে এমপিওভুক্তির আশায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিপুলসংখ্যক আবেদন জমা পড়লেও নির্ধারিত নীতিমালা ও যোগ্যতা পূরণ করতে না পারায় অনেক আবেদন বাতিল হয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এমপিও পাওয়ার জন্য যেসব শর্ত ও অবকাঠামোগত যোগ্যতা থাকা আবশ্যক, সেসব অনেক প্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান নেই। ফলে নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের এমপিওভুক্ত হওয়ার কোনো সুযোগ থাকছে না।
প্রসঙ্গত, বেসরকারি স্কুল-কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানে এক লাখ ৮২২টি শূন্য পদের বিপরীতে ষষ্ঠ গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে এনটিআরসিএ। এতে আবেদন করেন ৫৭ হাজার ৮৪০ জন। প্রেরিত শূন্যপদ বাতিলের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মোট ৭৮০টি পদের চাহিদা বাতিল করা হয়। এ ছাড়া ১২৫ জন প্রার্থী তাদের নিবন্ধন সনদে উল্লিখিত পদ বিষয় ও প্রতিষ্ঠান ধরনবহির্ভূত পদে আবেদন করায় তাদের আবেদন বাতিল করা হয়। সবমিলিয়ে ৪১ হাজার ৬২৭ জনকে নিয়োগ সুপারিশ করে এনটিআরসিএ। আবেদন করেও বাদ পড়ে যান ১৬ হাজার ২১৩ জন।