অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে মিশ্র প্রতিক্রিয়া বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে
Printed Edition
- জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
- মানবতাবিরোধী অপরাধ
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার গঠনের পর প্রশাসন ঢেলে সাজানোর যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তার স্পর্শ লেগেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়াতেও। বিশেষ করে চিফ প্রসিকিউটরের পদ থেকে তাজুল ইসলামকে সরিয়ে দেয়ার পর পরিস্থিতি নতুন মোড় নিয়েছে। প্রসিকিউশন টিমে থাকা একাধিক সদস্যের বিরুদ্ধে ঘুষ দাবি সংক্রান্ত অভিযোগ এবং তার তদন্ত শুরু হওয়ায় পুরো ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রম নিয়ে জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। যদিও নতুন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, প্রসিকিউটর টিমের নির্দিষ্ট কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের দায় ব্যক্তির; এটি ট্রাইব্যুনালের সার্বিক বিচার প্রক্রিয়াকে কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য ইতোমধ্যে পাঁচ সদস্যের একটি ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি’ গঠন করা হয়েছে।
গত ২৩ ফেব্রুয়ারি চিফ প্রসিকিউটর পদ থেকে তাজুল ইসলামের বিদায়ের দিনই পরিস্থিতি নাটকীয় রূপ নেয়। ট্রাইব্যুনালের আরেক প্রসিকিউটর বি এম সুলতান মাহমুদ প্রকাশ্যে অভিযোগ তোলেন যে, চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়কে অর্থ উপার্জনের মাধ্যম বানিয়ে ফেলা হয়েছিল এবং এর পেছনে ছিল একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। ঘটনার একদিন পর তাজুল ইসলাম পাল্টা জবাবে জানান, প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তিনি আগেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেছিলেন। তার অভিযোগ অনুযায়ী, সুলতান মাহমুদ বিশ্বাসভঙ্গ, শৃঙ্খলাভঙ্গ এমনকি ব্যক্তিগত অশোভন আচরণের মতো বিভিন্ন আচরণবিধি লঙ্ঘনের সাথে জড়িত ছিলেন। এ বিষয়ে তিনি সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলকে লিখিতভাবে অবহিত করেছিলেন বলে জানা গেছে। এরই মধ্যে গত ৯ মার্চ একটি সংবাদ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ট্রাইব্যুনালের এক প্রসিকিউটর কারাবন্দী একজন সাবেক আওয়ামী লীগ নেতাকে জামিনে মুক্তি পাইয়ে দেয়ার জন্য তার পরিবারের কাছে এক কোটি টাকা দাবি করেছিলেন। অডিও রেকর্ডিংয়ের বরাত দিয়ে প্রচারিত এই খবরের মধ্যেই প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদারের পদত্যাগ ট্রাইব্যুনালের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে জল্পনা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
তবে এসব কোনো অভিযোগেই সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের সরাসরি কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। এই অবস্থায় চট্টগ্রামের এক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র নেতার বরাত দিয়ে তাজুল ইসলামের নাম জড়িয়ে কিছু সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, যার মূল বক্তব্য ছিল ‘অনিয়মে ছিলেন তাজুল ইসলাম’। এ অভিযোগের বিষয়ে সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম কঠোর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি এখন দায়িত্বে নেই, সুতরাং কোথায় কে অভিযোগ করছে সে সম্পর্কে আমার ধারণা নেই। তবে বুঝতে পারি, বিচারপ্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ করার হীন উদ্দেশ্যে এ ধরনের ভিত্তিহীন, মিথ্যা প্রোপাগান্ডা সুকৌশলে চালানো হচ্ছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশন নিজ নিজ ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে কাজ করেছে এবং প্রাথমিক তদন্তে যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে, তদন্ত সংস্থা তাদেরকেই আসামি করেছে। কাউকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে আসামি করা হয়নি এবং অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত কাউকে বাদও দেয়া হয়নি।”
চট্টগ্রামের মামলার বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে তাজুল ইসলাম বলেন, ‘চট্টগ্রামের মামলার তদন্ত রিপোর্ট এখন পর্যন্ত গৃহীত হয়নি বলে জানি; আমার সময়ে অধিকতর তদন্তের জন্য বিষয়টি বিবেচনাধীন ছিল। জামিন পাইয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র সংক্রান্ত বক্তব্যটি একটি ভয়াবহ মিথ্যাচার। আমার সময়ে উল্লিখিত ব্যক্তির জামিনের কোনো দরখাস্তই করা হয়নি বা কোর্টে শুনানির জন্য উপস্থাপিত হয়নি। অস্তিত্বহীন বিষয়ে কল্পিত অভিযোগ এনে হাইপ তুলে গণহত্যাকারীদের বিচার প্রশ্নবিদ্ধ করার গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে এসব মিথ্যা ও উদ্দেশ্যমূলক অভিযোগ তোলা হচ্ছে।’
চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে সততার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন দাবি করে তিনি আরো বলেন, ‘জুলাই গণহত্যাসহ গুম ও অন্যান্য অপরাধের বিচারের প্রশ্নে আমি ছিলাম আপসহীন, যেটা গোটা জাতি জানে। আমি দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি, দুর্নীতির ন্যূনতম কোনো প্রমাণও কেউ দেখাতে পারবে না। শুধু অবান্তর ও মিথ্যা অভিযোগের ধুয়া তুলে জনমনে বিভ্রান্তি এবং সর্বোপরি গণহত্যাকারী ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার প্রশ্নবিদ্ধ করার অসৎ উদ্দেশ্যে এসব মিডিয়া ট্রায়ালের অপচেষ্টা হচ্ছে।’
অন্য দিকে, সম্রাট রোবায়েতের দেয়া লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামসহ একটি চক্র চিহ্নিত অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা চালিয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, চট্টগ্রামের ঘটনায় ৫৫ জনের বেশি সাক্ষী সরাসরি ফারাজ করিমের নাম বললেও তাজুল ইসলাম বিশেষ আইনি ক্ষমতা ব্যবহার করে তার নাম গ্রেফতারি পরোয়ানা থেকে বাদ দেন। এমনকি পারিবারিক সম্পর্কের কারণে ফারাজের মায়ের সাথে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল বলেও অভিযোগ তোলা হয়েছে। শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও ফজলে করিমকে জামিন দেয়ার ষড়যন্ত্র হয়েছে বলে সম্রাট রোবায়েত যে দাবি করেছেন, সে বিষয়ে বর্তমান চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, তদন্ত চলমান থাকায় এখনই বিস্তারিত কিছু বলা সম্ভব নয়। অভিযোগের বিষয়ে গঠিত ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির প্রতিবেদনেই সব সত্য উঠে আসবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।