দিল্লিতে হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভ

কূটনৈতিক এলাকায় চরমপন্থীরা ঢুকল কিভাবে প্রশ্ন পররাষ্ট্র উপদেষ্টার

Printed Edition

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে হিন্দু চরমপন্থী সংগঠনের বিক্ষোভকে গুরুতর নিরাপত্তা ব্যত্যয় হিসেবে উল্লেখ করে প্রশ্ন তুলেছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো: তৌহিদ হোসেন। তিনি বলেছেন, কূটনৈতিক এলাকার ভেতরে অবস্থিত একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর স্থানে এ ধরনের চরমপন্থী গোষ্ঠী কিভাবে প্রবেশের সুযোগ পেল তা স্বাভাবিক নয় এবং বিষয়টি উদ্বেগজনক।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন জানান, বাংলাদেশ প্রয়োজনে ভারতে কূটনৈতিক উপস্থিতি কমিয়ে আনবে। তিনি বলেন, কূটনৈতিক মিশনগুলোর নিরাপত্তার জন্য আমরা হোস্ট কান্ট্রির ওপর নির্ভর করি। আমরা আশা করি, বাংলাদেশ মিশনগুলোর নিরাপত্তায় ভারত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।

গতকাল রোববার বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এসব কথা বলেন। তিনি জানান, এ ঘটনার পর থেকে দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহর পরিবার নিরাপত্তা ঝুঁকি ও হুমকি অনুভব করছে।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, দিল্লিতে বাংলাদেশ মিশন কূটনৈতিক এলাকার ভেতরে, খুবই সুরক্ষিত স্থানে অবস্থিত। সেখানে হিন্দু চরমপন্থীরা কিভাবে ঢুকতে পারে? সাধারণভাবে এমন হওয়ার কথা নয়। যদি তারা ঢুকতে পারে, তাহলে ধরে নিতে হয়- তাদের ঢুকতে দেয়া হয়েছে। এটি প্রত্যাশিত নয়।

গত শনিবার রাতে দিল্লিতে ‘অখণ্ড হিন্দু রাষ্ট্রসেনা’ নামের একটি সংগঠনের ব্যানারে ২০-২৫ জনের একটি দল বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে প্রায় ২০ মিনিট অবস্থান নেয়। তারা ব্যানার প্রদর্শন করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেয়। বিক্ষোভ চলাকালে তারা ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে হুমকি দেয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে তৌহিদ হোসেন বলেন, তারা বলছে, ২০-২৫ জনের একটি দল। কিন্তু প্রশ্ন হলো হিন্দু চরমপন্থীদের এমন একটি দল কিভাবে এত সেনসিটিভ এলাকায় পৌঁছাতে পারে? তারা শুধু কোনো একটি ঘটনার প্রতিবাদ করে চলে যায়নি। তারা আরো অনেক উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছে, যা আমরা জানি।

হাইকমিশনারকে হত্যার হুমকির বিষয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, আমার কাছে সরাসরি প্রমাণ নেই। তবে আমরা শুনেছি, তাকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে। প্রশ্ন হলো একজন কূটনীতিককে তার কর্মস্থলের সামনে এসে হুমকি দেয়া হবে কেন?

দিল্লির চাণক্যপুরীর কূটনৈতিক এলাকার নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেদ করে গত শনিবার রাতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে ‘অখণ্ড হিন্দু রাষ্ট্রসেনা’র ব্যানারে বিক্ষোভ হয়েছে। ২০ থেকে ২৫ জন বিক্ষোভকারী কয়েকটি গাড়িতে করে এসে সেখানে বাংলাদেশ বিরোধী স্লোগান দেয়। এ সময় দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে হুমকি দেয়া হয়। রাত সাড়ে ৮টা থেকে প্রায় ১৫ মিনিট বিক্ষোভকারীরা বাংলাদেশ হাউসের সামনে অবস্থান করে ‘হিন্দুদের নিরাপত্তা দিতে হবে’, ‘হাইকমিশনারকে ধর’ বলে স্লোগান দিয়ে স্থান ত্যাগ করে।

ঘটনা সম্পর্কে ভারতের দেয়া প্রেসনোট প্রত্যাখ্যান করে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, বিক্ষোভকারীরা কূটনৈতিক এলাকার নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেদ করে এতদূর কিভাবে এলো? তারা বিভিন্ন ধরনের স্লোগান দিয়েছে। আমরা শুনেছি, বিক্ষোভকারীরা হাইকমিশনারকে হত্যার হুমকিও দিয়েছে। তবে এ সংক্রান্ত প্রমাণ আমাদের হাতে নেই। ঘটনাটি হাইকমিশনার ও তার পরিবারের জন্য হুমকি ছিল। হাইকমিশনের নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট পুলিশ ছিল না। দু’জন গার্ড নীরব ভূমিকা পালন করেছে। আমার কথা হলো, বিক্ষোভকারীরা হাইকমিশন পর্যন্ত আসতে পারবে কেন? এসে হুমকি দিতে পারবে কেন? সাধারণত কোনো হাইকমিশন অভিমুখে বিক্ষোভ কর্মসূচি থাকলে তা মিশনকে আগে থেকে অবহিত করা হয় এবং পুলিশ বিক্ষোভকারীদের আগে থেকেই আটকে দেয়। কোনো দাবিদাওয়া থাকলে দুইজন এসে দিয়ে যায়। এটাই প্রথা। সবখানেই এটা হয়, আমাদের দেশেও হয়। দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে, একজন বাংলাদেশী নাগরিক নৃশংসভাবে খুন হয়েছে। এটার সাথে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাকে এক করে ফেলার কোনো মানে হয়নি। ময়মনসিংহের ভালুকায় যাকে হত্যা করা হয়েছে, তিনি বাংলাদেশের নাগরিক। অন্তর্বর্তী সরকার এ ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। কিছু গ্রেফতারও করা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা যে শুধু বাংলাদেশে ঘটে তা নয়। এ অঞ্চলের সব দেশেই ঘটে। প্রত্যেক দেশের দায়িত্ব হচ্ছে যথাপোযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া। বাংলাদেশ নিচ্ছে, অন্যদেরও উচিত সেরকম ব্যবস্থা নেয়া।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রানধীর জয়সোয়াল স্থানীয় গণমাধ্যমের এক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ঘটনা সম্পর্কে বাংলাদেশের মিডিয়ার একটি অংশ বিভ্রান্তিকর প্রোপাগান্ডা ছড়িয়েছে। প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে, শনিবার রাতে ২০-২৫ জন যুবক দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে জড়ো হয়ে ময়মনসিংহে দীপু চন্দ্র দাসের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয় এবং বাংলাদেশে সব সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার দাবি জানায়। এ সময় কেউ মিশনের দেয়াল টপকানোর চেষ্টা করেনি এবং নিরাপত্তাজনিত কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। কিছুক্ষণ পরই দায়িত্বরত পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। তিনি বলেন, এ ঘটনার ভিডিও প্রমাণ রয়েছে, যা সবার জন্য উন্মুক্ত। ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী ভারত তার ভূখণ্ডে অবস্থিত সব মিশন ও পোস্টের নিরাপত্তা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

জয়সোয়াল বলেন, বাংলাদেশের চলমান পরিস্থিতির ওপর ভারত নজর রাখছে। আমাদের কর্মকর্তারা বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ রাখছে। তারা সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের ঘটনাগুলো সম্পর্কে বাংলাদেশের কাছে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আমরা দীপু চন্দ্র দাসের বর্বর হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছি।

ঘটনা সম্পর্কে দিল্লি হাইকমিশনে বাংলাদেশের প্রেস মিনিস্টার ফয়সাল মাহমুদ গণমাধ্যমকে বলেছেন, শনিবার রাত সাড়ে ৮টা থেকে পৌনে ৯টার মধ্যে তিনটি গাড়িতে করে কয়েকজন ব্যক্তি বাংলাদেশ ভবনের গেটের সামনে এসে চিৎকার-চেঁচামেচি করেন। তারা বাংলা ও হিন্দিতে কথা বলছিলেন। এ সময় ‘হিন্দুদের নিরাপত্তা দিতে হবে’ এবং ‘হাইকমিশনারকে ধরো’- এ ধরনের স্লোগান দেয়া হয়। তিনি বলেন, ওই ব্যক্তিরা পরে মূল গেটের সামনে এসে কিছুক্ষণ চিৎকার করে চলে যান। তবে এ সময় তারা কোনো ধরনের হামলা চালাননি। কোনো কিছু ছোড়াছুড়িও করা হয়নি।

হাইকমিশনারকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছিল কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে প্রেস মিনিস্টার বলেন, হতে পারে। তারা হিন্দি ও বাংলা মিলিয়ে বলছিল- ‘ওখানে যদি হিন্দু মারা হয়, তাহলে আমরা তোমাদের সবাইকে মেরে ফেলব’।

ঘটনার পরপরই রাতে জরুরি ভিত্তিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের ডিফেন্স উইংয়ের সাথে বৈঠকে বসেন হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ।

এর আগে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অব্যাহত প্রোপাগান্ডার পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর ২ ডিসেম্বর ভারতের আগরতলায় অবস্থিত বাংলাদেশ সহকারী-হাইকমিশনে হামলার ঘটনা ঘটে। হিন্দু সংঘর্ষ সমিতি নামের একটি সংগঠনের ব্যানারে বড় একটি বিক্ষোভকারী দল পূর্ব-পরিকল্পিতভাবে মূলফটক ভেঙে বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনে প্রবেশ করে। স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর উপস্থিতিতে বিক্ষোভকারীরা বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার অবমাননা করে এবং মিশনের অভ্যন্তরে সম্পত্তি বিনষ্ট করে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্থানীয় পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে মিশনকে রক্ষায় নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করে। ফলে অনিরাপদ পরিবেশে মিশনে কর্মরত সকলেই বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশন ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। এরপর থেকে আগরতলায় বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনে কর্মকাণ্ড কয়েক মাস বন্ধ ছিল।

চট্টগ্রামে ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্র বন্ধ : নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণ দেখিয়ে গতকাল চট্টগ্রামের ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্র (আইভ্যাক) বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত এ কেন্দ্রের সব কার্যক্রম স্থগিত থাকবে বলে জানিয়েছে ভারতীয় সহকারী হাইকমিশন।

আইভ্যাকের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় চট্টগ্রামের ভিসা আবেদন কেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। যেসব আবেদনকারীর ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্ট নির্ধারিত ছিল, তাদের জন্য পরবর্তীতে নতুন তারিখ ঘোষণা করা হবে।

গত বৃহস্পতিবার রাতে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে চট্টগ্রামে ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনের সামনে একদল বিক্ষোভকারী অবস্থান নেয়। পরবর্তী সময়ে লাঠিচার্জ ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। ঘটনাস্থল থেকে অন্তত ১২ জনকে আটক করা হয়। এর আগে নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণ দেখিয়ে গত ১৭ ডিসেম্বর দুপুরের পর ঢাকার যমুনা ফিউচার পার্ক এবং ১৮ ডিসেম্বর রাজশাহী ও খুলনার আইভ্যাকের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা আরো জানান, ঘটনার পর থেকে দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার ও তার পরিবার গভীর উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। বিষয়টি কূটনৈতিকভাবে ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হয়েছে এবং বাংলাদেশ সরকার ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে।