দেশে প্রায় ২ কোটি মানুষ কিডনির সমস্যায় ভুগছে

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশে কিডনি-মূত্রনালী সংক্রান্ত সমস্যায় আক্রান্তের হার দিন দিন বেড়ে চলেছে। বর্তমানে প্রায় দুই কোটি মানুষ কিডনির কোনো না কোনো সমস্যায় ভুগছেন। এই হার দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ অর্থাৎ প্রতি হাজারে প্রায় ১১০-১২০ জন। ইউরোলজিস্টরা বলছেন, প্রতি বছর প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার মানুষ কিডনি বিকল হয়ে মারা যাচ্ছেন। কিডনি প্রতিস্থাপন বা ডায়ালাইসিসের পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় তাদের মৃত্যু হচ্ছে। কিডনি নষ্ট হওয়ার প্রধান কারণগুলোর অন্যতম হচ্ছে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসার আওতায় না আসা।

কিডনি সমস্যা ছাড়াও ৬০ বছরের বেশি বয়সের পুরুষদের প্রায় ৪০ শতাংশ প্রোস্টেট বৃদ্ধিজনিত সমস্যায় ভোগেন। এ ছাড়া সচেতনতা না থাকায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বাংলাদেশী নারী জীবনে অন্তত একবার হলেও ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশনে আক্রান্ত হয়ে থাকে। বিশিষ্ট ইউরোলজিস্ট, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ইউরোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা: প্রভাব চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘বাংলাদেশে ইউরোলজিসংক্রান্ত রোগ ধীরে ধীরে একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হচ্ছে। জীবনযাত্রার পরিবর্তন, খাদ্যাভ্যাস, স্বল্প পানি পান, ডায়াবেটিস ও সংক্রমণজনিত নানা কারণে মূত্র সম্বন্ধীয় রোগের প্রকোপ বাড়ছে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব থাকায় অনেক সময় এসব রোগ দেরিতে ধরা পড়ে এবং পরে জটিল আকার ধারণ করে। কিন্তু সময় মতো চিকিৎসা নিতে পারলে সারা জীবন সুস্থ থাকা যায়।

বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় কিডনি ও মূত্রনালীর পাথর। পর্যাপ্ত পানি পান না করা, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ ও প্রাণিজ প্রোটিন গ্রহণ, গরম আবহাওয়া এবং প্রস্রাব আটকে রাখায় অভ্যস্ত হলে কিডনি ও মূত্রনালীর সমস্যাগুলো বাড়ে। অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, কিডনিতে পাথর হলে তীব্র কোমরব্যথা, প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া, কখনও রক্ত যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা যায়। অনেক সময় পাথর ছোট হলে নিজে নিজেই বের হয়ে যায়, তবে বড় পাথরের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার বা লেজার চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।

অন্যদিকে নারী ও শিশুদের মধ্যে মূত্রনালীর সংক্রমণও একটি সাধারণ সমস্যা। এর প্রধান লক্ষণ হলো ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ, প্রস্রাবে জ্বালা, তলপেটে ব্যথা এবং জ্বর। সময়মতো অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা না নিলে সংক্রমণ কিডনিতে ছড়িয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া বয়স বাড়ার সাথে সাথে পুরুষদের মধ্যে প্রোস্টেট গ্রন্থি বড় হওয়ার সমস্যা দেখা দেয়। এতে প্রস্রাব শুরু করতে দেরি হয়, ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ বিশেষ করে রাতে এ ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। বাংলাদেশে ৫০ বছরের বেশি বয়সী পুরুষদের মধ্যে এই সমস্যা বেশ সাধারণ। চিকিৎসকরা ওষুধ দিয়ে, কখনো কখনো অস্ত্রোপচার করে প্রস্টেটের সমস্যার সমাধান করেন।

ইউরোলজির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো পুরুষ বন্ধ্যত্ব ও যৌন সমস্যা। স্পার্ম উৎপাদন কম হওয়া, অণ্ডকোষের বিভিন্ন রোগ, হরমোনজনিত সমস্যার (অণ্ডকোষের শিরা ফুলে যাওয়া) কারণে বন্ধ্যত্ব দেখা দিতে পারে। আবার ইরেকটাইল ডিসফাংশনও অনেক পুরুষের মধ্যে দেখা যায়, যা ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, ধূমপান এবং মানসিক চাপের সাথে সম্পর্কিত। দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ ও সংক্রমণের কারণে অনেক মানুষের কিডনি ধীরে ধীরে কাজ করা বন্ধ করে দেয়, যাকে কিডনি ফেইলিউর বলা হয়। তখন রোগীকে ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপনের মতো জটিল চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশে কিডনি রোগের হার বাড়ার অন্যতম কারণ হলো ডায়াবেটিসের বিস্তার এবং অনিয়ন্ত্রিত ওষুধ সেবন।

অধ্যাপক বিশ্বাস বলেন প্র¯্রাবে রক্ত দেখা দিলে, তীব্র কোমরব্যথা হলে, প্রস্রাব আটকে গেলে, দীর্ঘদিন প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া দেখা দিলে ইউরোলজিস্ট দেখানো উচিত। এসব সমস্যা সমাধানে এবং সচেতনতা বাড়াতে বাংলাদেশে প্রতি বছর ৫ মার্চ ইউরোলজি দিবস পালন করা হয়ে থাকে।