গাজায় ইসরাইলি যুদ্ধাপরাধের জোরালো প্রমাণ রয়েছে

মন্তব্য জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

গাজায় বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা এবং সামরিক আগ্রাসনের ফলে সৃষ্ট ধ্বংসলীলার পেছনে ইসরাইলের ‘সম্পূর্ণ অবহেলা’ রয়েছে বলে মনে করেন জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। তিনি সতর্ক করেন, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়েছে বলে বিশ্বাস করার মতো জোরালো প্রমাণ রয়েছে। বুধবার রয়টার্সের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে গুতেরেস এ মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, আমি মনে করি বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যু এবং গাজার ধ্বংসের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অবহেলার সাথে এ অভিযানটি যেভাবে পরিচালিত হয়েছিল, তাতে মৌলিকভাবে কিছু ভুল ছিল। জাতিসঙ্ঘ প্রধান উল্লেখ করেন, যুদ্ধের ফলে গাজা ধ্বংস হয়ে গেছে। অন্য দিকে ইসরাইল ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসকে ‘নির্মূল’ করার ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। দখলদার সরকারের আগ্রাসন যুদ্ধাপরাধের সমতুল্য হতে পারে কি না, জানতে চাইলে জাতিসঙ্ঘ প্রধান বলেন, এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে পারে বলে বিশ্বাস করার জোরালো কারণ রয়েছে।

গত ১১ অক্টোবর থেকে গাজায় মার্কিন মধ্যস্থতায় হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরাইলি গণহত্যার যুদ্ধে নিহতের সবশেষ সংখ্যা ৭০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। একই সময়ে এক লাখ ৭০ হাজারের বেশি বেশি মানুষ আহত হয়েছে। অনেকেই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন। চলতি বছরের শুরুতেও একটি যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ করে ইসরাইল গত ২৭ মে থেকে গাজায় পৃথক সাহায্য বিতরণ উদ্যোগ শুরু করে। এ পদক্ষেপের পর অঞ্চলটিতে দুর্ভিক্ষ প্রকট হয়ে উঠেছিল। ইসরাইলি বাহিনী খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রের কাছে জড়ো হওয়া ফিলিস্তিনিদের ওপরও গুলি চালিয়ে যায়। এর ফলে শত শত মানুষ নিহত হয়। সেই সাথে দুর্ভিক্ষে শিশুসহ বহু মানুষের মৃত্যু হয়। গত বছরের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত গাজায় যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য নেতানিয়াহু ও তার সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। উপত্যকাজুড়ে যুদ্ধের জন্য ইসরাইল আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গণহত্যার মামলার মুখোমুখি।

গাজায় যুদ্ধ বিরতির দ্বিতীয় ধাপ শিগগিরই শুরু হবে : ট্রাম্প : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, গাজায় যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার দ্বিতীয় পর্যায় ‘খুব শিগগিরই শুরু হবে’। বুধবার হোয়াইট হাউজে এক সংবাদ সম্মেলনে গাজায় যুদ্ধ বিরতির দ্বিতীয় ধাপ কখন শুরু হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন বলে জানিয়েছে আরব নিউজ।

ট্রাম্প সাংবাদিকদের আরো বলেন, ‘আমরা এখন মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি পেয়েছি। ৫৯টি দেশ এ প্রক্রিয়ায় অসাধারণ সমর্থন দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সমর্থন পাওয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’ ইসরাইলের প্রায় দুই বছরের সামরিক অভিযানের পর ট্রাম্প প্রস্তাবিত ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা অনুযায়ী, গত ১০ অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধ বিরতি কার্যকর হয়েছে।

তবে এই যুদ্ধ বিরতি লঙ্ঘন করে ইসরাইলের চালানো একাধিক হামলায় গাজায় এ পর্যন্ত নিহত হয়েছে ৩৬০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি। গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি করার ক্ষেত্রে মধ্যস্থতা করা দেশগুলোর মধ্যে ছিল কাতার। ট্রাম্পের মতো কাতারও এ সপ্তাহের শুরুর দিকে আশার বাণী শুনিয়েছিল। দেশটি বলেছিল, তারা আশা করছে ‘ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী সংগঠন হামাস এবং ইসরাইল যুদ্ধ বিরতির দ্বিতীয় পর্যায় নিয়ে খুব শিগগিরই আলোচনা শুরু করবে।’

ট্রাম্পর ২০ দফা গাজা শান্তি পরিকল্পনার প্রথম দফায় শর্ত মেনে ইসরাইল হাজার হাজার ফিলিস্তিনি বন্দীকে মুক্তি দিয়েছে হামাসের কাছ থেকে ইসরাইলি বন্দীদেরকে ফিরে পাওয়ার বিনিময়ে। হামাস ও ইসলামিক জিহাদ আন্দোলন জীবিত ২০ বন্দী এবং ৪৭ বন্দীর লাশ ইসরাইলকে ফেরত দিয়েছে। এখন কেবল এক বন্দীর লাশই গাজায় আছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ইসরাইলের সেনাবাহিনী নিশ্চিত করেছে যে, হামাসের ফেরত দেয়া ইসরাইলের এক থাই বন্দীর লাশ তারা শনাক্ত করেছে। ইসরাইল এ-ও জানিয়েছে, তারা একবার সব বন্দীর লাশ পেয়ে গেলেই মিসরের সাথে গাজার রাফা সীমান্ত ক্রসিং খুলে দেবে। যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার এই প্রথম ধাপের পর দ্বিতীয় ধাপে গাজায় একটি অন্তর্বর্তীকালীন কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব আছে। যেখানে হামাস থাকবে না। যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপে আরো প্রস্তাব করা হয়েছে, গাজায় একটি স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনী প্রতিষ্ঠার, যাদেরকে প্রশিক্ষণ দেবে আরব ও মুসলিম দেশগুলো। এ ছাড়া হামাসের নিরস্ত্রীকরণের বিষয়টিও উল্লেখ আছে দ্বিতীয় ধাপে। হামাস এই শর্ত বরাবরই মানতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। বিশেষ করে ইসরাইলি সেনারা গাজা থেকে সরে না গেলে হামাস নিরস্ত্র হতে রাজি নয়।

ইসরাইলি হামলায় গাজায় শিশুসহ ৭ ফিলিস্তিনি নিহত

যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় থামছে না ইসরাইলি হামলা। বুধবারও দখলদার বাহিনী হামলায় গাজায় দুই শিশুসহ সাত ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী জানিয়েছে, গাজার মিসর সীমান্তের কাছে হামাসের যোদ্ধাদের হামলায় তাদের চার সেনা আহত হয়েছেন। এ ঘটনার পাল্টা জবাবেই হামলা চালিয়েছে ইসরাইল।

আলজাজিরা গাজার চিকিৎসাকর্মীদের বরাতে জানিয়েছে, ভূখণ্ডটির দক্ষিণাঞ্চলের আল-মাওয়াসি শিবিরে ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় পাঁচ ফিলিস্তিনি নিহত হন। ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর আগুন ধরে যায় আর তাতে শিবিরের বেশ কয়েকটি তাঁবু পুড়ে যায়। গাজার দমকল বাহিনীর মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল জানান, ইসরাইলি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে দুই শিশুসহ পাঁচ নাগরিক নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরো অনেকে। আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। গাজার কুয়েতি হাসপাতালের সূত্রগুলো আলজাজিরাকে জানিয়েছে, নিহত শিশুদের বয়স আট ও ১০ বছর আর এ হামলার ঘটনায় আরও ৩২ ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন। ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, আহতদের মধ্যে কয়েকজন মারাত্মকভাবে দগ্ধ হয়েছেন। ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাস এ হামলার নিন্দা জানিয়েছে।

ইসরাইলি কারাগারে এখনো আজীবন সাজাপ্রাপ্ত ১১৪ ফিলিস্তিনি বন্দী

হামাস-সম্পর্কিত বন্দিবিষয়ক গণমাধ্যম অফিস জানিয়েছে, বর্তমানে ইসরাইলি কারাগারে আজীবন সাজাপ্রাপ্ত ১১৪ ফিলিস্তিনি বন্দী রয়েছেন। তারা বিভিন্ন অঞ্চলে বন্দী অবস্থায় মুক্তির অপেক্ষায় আছেন। খবর মিডল ইস্ট মনিটরের। বিবৃতিতে বলা হয়, হেবরনে সবচেয়ে বেশি আজীবন সাজাপ্রাপ্ত বন্দী রয়েছে ২৮ জন। এরপর নাবলুসে ২১ জন, রামাল্লায় ১৭ জন এবং ইসরাইলি নাগরিক ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ১৬ জন। জেনিনে ৯ জন, তুলকার্মে সাতজন, বেথলেহেমে চারজন, জেরিখোতে তিনজন এবং কালকিলিয়া ও সালফিতে দু’জন করে বন্দী রয়েছে। এ ছাড়া দখলকৃত জেরুসালেম থেকে তিনজন এবং গাজা উপত্যকা থেকে দু’জন বন্দী আজীবন সাজা ভোগ করছেন।

অফিসটি জানায়, প্রতিটি বন্দীর জীবনই ‘বঞ্চনার মানবিক গল্প’। চলমান জরুরি অবস্থা ও কারাগারে নির্যাতন, বিশেষ করে আজীবন সাজাপ্রাপ্ত বন্দী ও বন্দী আন্দোলনের নেতাদের ওপর হামলার কারণে তাদের পরিস্থিতি আরো অবনতির দিকে যাচ্ছে। তথ্যে উল্লেখ করা হয়, ‘আল-আকসা ফ্লাড’ অভিযানের আগে ৬০৮ জন ফিলিস্তিনি আজীবন সাজা ভোগ করছিলেন। ‘ফ্লাড অব দ্য ফ্রি’ চুক্তির তিন ধাপে ৫০৩ জন মুক্তি পেয়েছেন। ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত ১১৪ জন বন্দী এখনো আজীবন সাজা ভোগ করছেন।

আন্তর্জাতিক সহায়তা ছাড়া গাজায় বোমা নিষ্ক্রিয়করণ অসম্ভব

গাজার ফিলিস্তিনি পুলিশের ফরেনসিক ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল নভেম্বর মাসে ইসরাইলি হামলার পর অবশিষ্ট থাকা অক্ষত বোমা ও গোলাসংক্রান্ত ২৫২টি সতর্কতা মোকাবেলা করেছে। খবর মিডল ইস্ট মনিটরের।

পুলিশের রিপোর্টে বলা হয়, যুদ্ধবিরতির পর ইসরাইলি সেনারা যে অঞ্চল থেকে সরে গেছে, সেসব এলাকায় সন্দেহজনক বস্তু ও অক্ষত বোমা অপসারণের কাজ চলছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, উদ্ধারকৃত বস্তুগুলোর মধ্যে ছিল বিভিন্ন আকারের বিমান থেকে ফেলা বোমা, কামানের গোলা, নির্দেশিত ক্ষেপণাস্ত্র, স্থলমাইন ও অন্যান্য ভারী বিস্ফোরক। দ্রুত প্রতিক্রিয়া ইউনিট জানায়, তাদের দল প্রায় কোনো সরঞ্জাম ছাড়াই কঠিন পরিস্থিতিতে কাজ করছে। তবুও তারা বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। তারা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে বিশেষায়িত সরঞ্জাম সরবরাহের জরুরি প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, গাজায় বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক ফেলা হয়েছে। এগুলো অপসারণে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক যৌথ প্রচেষ্টা দরকার। ধ্বংসস্তূপ সরাতে ভারী যন্ত্রপাতিরও প্রয়োজন রয়েছে।

যুদ্ধ বিরতির কোনো সুফল ভোগ করছেন না গাজাবাসীরা : ওমানের গ্র্যান্ড মুফতি

ওমানের গ্র্যান্ড মুফতি শেখ আহমদ আল-খলিলি বুধবার বলেছেন, গাজায় ইসরাইলের আগ্রাসন অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে রাফাহে অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চলছে। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক চুক্তি কোনো ইতিবাচক ফল আনতে পারেনি। খবর মিডল ইস্ট মনিটর।

এক্স প্ল্যাটফর্মে দেয়া বার্তায় আল-খলিলি বলেন, পরিস্থিতি তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ দাবি করছে। আলোচনায় যুক্ত দেশগুলোর নীরবতা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, এমনকি ইসলামী দেশগুলোর নীরবতায় তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি গাজায় হামলা বন্ধে জরুরি পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান এবং বিশ্ববাসীকে ফিলিস্তিনি আন্দোলনের পাশে থাকার আহ্বান করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের ট্র্যাজেডির মুখে নীরব থাকা লজ্জাজনক। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্র ও কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের সহায়তায় গাজায় গণহত্যামূলক অভিযান চালাচ্ছে। এতে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ, অনাহার, ধ্বংসযজ্ঞ, বাস্তুচ্যুতি ও নির্বিচার গ্রেফতার চলছে। আন্তর্জাতিক আদালতের রায় ও বিশ্বব্যাপী আহ্বান উপেক্ষা করে এসব কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এ অভিযানে এখন পর্যন্ত দুই লাখ ৪১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত বা আহত হয়েছেন। এর মধ্যে অধিকাংশ নারী ও শিশু। এখনো ১১ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ। লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। দুর্ভিক্ষে বহু মানুষ, বিশেষ করে শিশু মারা গেছে। গাজার বড় অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, পুরো শহর ও জনপদ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।