টিএফআই সেলে গুম

হাসিনাসহ ১৭ জনের অভিযোগ গঠনের আদেশ ২৩ ডিসেম্বর

রামপুরায় ২৮ হত্যা

Printed Edition
back-1
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযুক্ত সাবেক সেনা ও র‌্যাব কর্মকর্তাদের হাজির করা হয় : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

রেদোয়ানুলসহ ৪ জনের অভিযোগ গঠন ২৪ ডিসেম্বর

  • জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
  • মানবতাবিরোধী অপরাধ

টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুম ও নির্যাতন এবং জুলাই অভ্যুত্থানে রামপুরায় গণহত্যার ঘটনায় দায়ের করা দু’টি পৃথক মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিজিবি কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ইসলামসহ মোট ২১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের আদেশ পিছিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। আসামিপক্ষের আইনজীবীদের সময়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী ২৩ ও ২৪ ডিসেম্বর পরবর্তী দিন ধার্য করেছেন আদালত।

গুম ও টিএফআই সেলে নির্যাতন

টিএফআই সেলে গুমের ঘটনায় করা মামলায় শেখ হাসিনা ও সেনা কর্মকর্তাসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য ২১ ডিসেম্বর দিন ধার্য ছিল। তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনাল আদেশের তারিখ দুই দিন পিছিয়ে ২৩ ডিসেম্বর ঠিক করেন। যদিও বিচারকাজ বিলম্ব করতেই আসামিপক্ষ এমন আবেদন করছে বলে আপত্তি জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ বিষয়ে আদেশের দিন ধার্য করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। এর আগে সকালে ঢাকার সেনানিবাসের বিশেষ কারাগার থেকে এ মামলায় গ্রেফতার ১০ সেনাকর্মকর্তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করে পুলিশ।

তারা হলেন র‌্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার মো: জাহাঙ্গীর আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: কামরুল হাসান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: মাহাবুব আলম, কর্নেল কে এম আজাদ, কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন, কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান (অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে), র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার সাবেক পরিচালক কর্নেল মো: মশিউর রহমান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমন ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো: সারওয়ার বিন কাশেম।

এর মধ্যে তোফায়েল, কামরুল ও মশিউর জুয়েলের পক্ষে শুনানির আবেদন করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী। একপর্যায়ে আদেশের জন্য আরেকটি তারিখ নির্ধারণের আর্জি জানান তিনি। পরে দু’দিন পিছিয়ে ২৩ ডিসেম্বর দিন ঠিক করেন ট্রাইব্যুনাল। যদিও আসামিপক্ষের এমন আবেদনে আপত্তি জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। বিচারকাজ বিলম্ব করতেই আসামিদের আইনজীবীরা এমন করছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এ মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মোট আসামি ১৭ জন। পলাতক অন্যরা হলেন- শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষাবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব:) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইজিপি বেনজির আহমেদ, র‌্যাবের সাবেক ডিজি এম খুরশিদ হোসেন, র‌্যাবের সাবেক মহাপরিচালক ব্যারিস্টার হারুন অর রশিদ ও র‌্যাবের সাবেক পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব:) মো: খায়রুল ইসলাম।

গত ১৪ ডিসেম্বর গ্রেফতার তিন আসামির পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী হামিদুল মিসবাহ এবং সাতজনের হয়ে লড়েন তাবারক হোসেন। এ ছাড়া আসাদুজ্জামান খান কামালসহ তিনজনের পক্ষে শুনানি করেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী এম হাসান ইমাম। তিনজনের পক্ষে সুজাদ মিয়া ও শেখ হাসিনার হয়ে লড়েন আইনজীবী মো. আমির হোসেন। শুনানিতে প্রত্যেকেই আলাদা আলাদা যুক্তি (গ্রাউন্ড) এনে নিজেদের মক্কেলের অব্যাহতি চেয়েছেন। তবে প্রসিকিউশনের পক্ষে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আবেদন করেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে এ বিষয়ে আদেশের জন্য ২১ ডিসেম্বর দিন ধার্য করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল।

এর আগে, ৩ ডিসেম্বর অভিযোগ গঠনের ওপর শুনানি শেষ করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। শুনানিতে টিএফআই সেলের বীভৎসতা তুলে ধরার পাশাপাশি গুমের অন্ধকার পেরিয়ে ১৬ বছর পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এক নতুন বাংলাদেশ উদিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। গুম হওয়া ব্যক্তিদের ভাগ্য দু’ভাবে নির্ধারণ হতো বলে উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে ভাগ্য ভালো হলে গুমের শিকার ব্যক্তিদের গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হতো। দ্বিতীয়ত সাত-আট বছর গুম রাখার পর ফেলে রাখা হতো অজানা কোনো স্থানে।

চলতি বছরের ২২ অক্টোবর সেনা হেফাজতে থাকা ১০ কর্মকর্তাকে প্রথমবার ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। শুনানি শেষে তাদের গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১। একইসাথে পলাতক আসামিদের হাজিরে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেয়া হয়। তবে নির্ধারিত তারিখে হাজির না হওয়ায় তাদের পক্ষে স্টেট ডিফেন্স নিয়োগ দেন আদালত। ৮ অক্টোবর এ মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। পরে অভিযোগ আমলে নিয়ে ১৭ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল।

রামপুরায় হত্যা মামলা

অন্য দিকে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন চলাকালে রাজধানীর রামপুরায় গুলি করে ২৮ জনকে হত্যার ঘটনায় বিজিবি কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ইসলামসহ চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশের দিন ধার্য করা হয়েছে ২৪ ডিসেম্বর। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন প্যানেল এ আদেশ দেন।

এ মামলায় কারাগারে থাকা লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ও মেজর রাফাত-বিন-আলমকে কড়া নিরাপত্তায় ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। অন্য দুই আসামি সাবেক এডিসি রাশেদুল ইসলাম ও সাবেক ওসি মশিউর রহমান পলাতক রয়েছেন।

এই মামলায় আদালতে গতকাল রোববার রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মো: শাইখ মাহাদী। সাথে ছিলেন প্রসিকিউটর আব্দুস সোবহান তরফদার ও প্রসিকিউটর তারেক আব্দুল্লাহ। অন্য দিকে আসামি পক্ষের শুনানিতে আইনজীবী ছিলেন ব্যারিস্টার হামিদুল মিজবাহ।

আসামিদের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকালে রামপুরায় গুলি করে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। এ মামলায় পলাতক দুই আসামির পক্ষে স্টেট ডিফেন্স নিয়োগ করা হয়েছে।

রোববার এ মামলায় কারাগারে থাকা লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুলসহ গ্রেফতার দুই সেনাকর্মকর্তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সকাল ১০টার দিকে তাদের প্রিজন ভ্যানে করে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের বিশেষ কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে আনা হয়।

অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরা ও বনশ্রী এলাকায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় রেদোয়ানুল ছাড়াও আসামি করা হয়েছে বিজিবির সাবেক কর্মকর্তা মেজর রাফাত-বিন-আলম, পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) রাশেদুল ইসলাম ও সাবেক ওসি মশিউর রহমানকে। তাদের মধ্যে রেদোয়ানুল ও রাফাত এখন সেনা হেফাজতে আছেন। অন্য দু’জন পলাতক।