জুলাইয়ে শুরু হচ্ছে ইউপি নির্বাচন

আগে শেষ হবে সিটি, জেলা, উপজেলা ও পৌর ভোট

Printed Edition

ইকবাল মজুমদার তৌহিদ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে দ্রুত সক্রিয় করতে বড় পরিসরে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। দীর্ঘ সময় ধরে অনেক ইউনিয়ন, উপজেলা ও পৌর প্রতিষ্ঠানে নির্বাচিত প্রতিনিধির অনুপস্থিতি এবং প্রশাসকনির্ভর পরিচালনার কারণে তৃণমূলপর্যায়ে সেবাদান ও জবাবদিহিতায় যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতেই ধাপে ধাপে ভোট আয়োজনের রোডম্যাপ নেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, চলতি বছরের জুলাই মাস থেকে প্রথম ধাপে ২০৪টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন শুরু হতে পারে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, যেসব ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে বা প্রশাসক দিয়ে চলছে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। ২০২১ সালের প্রথম ধাপে নির্বাচিত বেশ কিছু ইউনিয়নের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ায় সেখানেই আগে ভোটগ্রহণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে করে প্রশাসনিক শূন্যতা কমবে এবং স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নেও গতি আসবে বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকেরা।

তবে কেবল ইউনিয়ন পরিষদ নয়- সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে বড় কাঠামো আগে স্থিতিশীল করা। নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে, সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচন আগে শেষ করে তারপর সারা দেশে পর্যায়ক্রমে ইউনিয়ন পরিষদ ভোট সম্পন্ন করা হবে। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের সাথে উন্নয়ন বাজেট, অবকাঠামো ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের সম্পর্ক বেশি।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ তথ্য মতে, দেশে বর্তমানে ১২টি সিটি করপোরেশন, ৬৪টি জেলা পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ৩৩০টি পৌরসভা এবং প্রায় ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বড় অংশেই মেয়াদোত্তীর্ণ বোর্ড বা আংশিক প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় কার্যক্রম চলছে। ফলে স্থানীয় সেবা- রাস্তা সংস্কার, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ভূমিসংক্রান্ত প্রত্যয়ন, নাগরিক সনদ- সব ক্ষেত্রেই সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হচ্ছে।

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, ‘স্থানীয় সরকার শক্তিশালী না হলে জাতীয় উন্নয়ন টেকসই হয় না। তাই যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন আয়োজন করে জনপ্রতিনিধিদের হাতে দায়িত্ব ফিরিয়ে দিতে চাই।’ তিনি আরো বলেন, নির্বাচন কমিশনের সাথে সমন্বয় করে একটি বাস্তবসম্মত সময়সূচি তৈরি করা হচ্ছে।

এ দিকে নির্বাচন কেমন পদ্ধতিতে হবে- এ প্রশ্নে আবারো সামনে এসেছে দলীয় প্রতীকের বিতর্ক। ২০১৫ সালে প্রথমবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক চালু হলেও তা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। অনেকের মতে, দলীয় প্রতীকের কারণে তৃণমূল নির্বাচন অতিরিক্ত দলীয়করণ ও সঙ্ঘাতমুখী হয়ে ওঠে; স্থানীয় উন্নয়ন ও ঐক্যের বদলে রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়ে। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থায় সেই বিধান বাতিল করা হয়। বর্তমানে সাধারণ প্রতীকে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে। বিষয়টি চূড়ান্ত করতে জাতীয় সংসদের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।

স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, দলীয় বা নির্দল- যে পদ্ধতিই হোক, সেটি সংসদে আইন বা অধ্যাদেশের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। আমরা প্রশাসনিক প্রস্তুতি এগিয়ে রাখছি, যাতে সিদ্ধান্ত হলেই দ্রুত ভোট করা যায়।

নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ভোট আয়োজনের আগে ভোটার তালিকা হালনাগাদ, কেন্দ্র নির্ধারণ, আইনশৃঙ্খলা পরিকল্পনা, ব্যালট ও সরঞ্জাম সরবরাহ- এসব বিষয়ে প্রস্তুতি নিতে অন্তত কয়েক মাস সময় প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে কেন্দ্র স্থাপন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগ বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য নির্বাচন কমিশন ও জেলা প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুধু প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়- এটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতারও পরীক্ষা। জাতীয় নির্বাচনের পর জনগণের প্রত্যাশা থাকে স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত সেবা ও উন্নয়ন দেখার। জনপ্রতিনিধি না থাকলে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয় না। ফলে স্থানীয় নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং তৃণমূল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা জরুরি।

গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষও দ্রুত নির্বাচনের পক্ষে মত দিচ্ছেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা সরাসরি নাগরিক সনদ, বয়স্কভাতা, বিধবা ভাতা, ভিজিএফ-ভিজিডি, জন্মনিবন্ধন, অবকাঠামো উন্নয়নসহ নানা সেবা দিয়ে থাকেন। প্রশাসকের মাধ্যমে এসব সেবা পরিচালনা করলে স্থানীয় জবাবদিহিতা কমে যায়। তাই নির্বাচিত প্রতিনিধি থাকলে মানুষ সহজে সমস্যা জানাতে পারেন।

তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দলীয় প্রভাব, অর্থের ব্যবহার এবং ভোটকেন্দ্রিক সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিরপেক্ষ থাকতে হবে- এমন দাবি নাগরিক সমাজের।

সব মিলিয়ে, জুলাই থেকে শুরু হতে যাওয়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন কেবল একটি ভোট নয়; এটি তৃণমূল গণতন্ত্র পুনর্গঠনের বড় পরীক্ষা। সঠিক প্রস্তুতি, স্বচ্ছ প্রক্রিয়া ও অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে স্থানীয় সরকার কাঠামো আবারও সক্রিয় ও কার্যকর হয়ে উঠবে- এমনটাই আশা সংশ্লিষ্ট সবার।