শরিয়াহ- নরম, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক আইন

Printed Edition
islam
শরিয়াহ- নরম, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক আইন

মুফতি জহির রাইহান

মানুষ আজ স্বাধীনতার চরমে দাঁড়িয়ে পরস্পরের অধিকার ভুলে যাচ্ছে; বিচারব্যবস্থা শক্তিশালীকে ছাড় দেয়, দুর্বলকে শাস্তি দেয়; পরিবার ভেঙে পড়ছে; সামাজিক নৈতিকতা ক্ষয়ে যাচ্ছে; আর মানুষের আত্মা- শূন্যতার অন্ধকারে ঘুরপাক খাচ্ছে। ঠিক এই জায়গাতেই শরিয়াহ এক নতুন আলো দেখায়।

শরিয়াহ নৈতিক সঙ্কটের যুগে মজবুত নৈতিক ভিত্তি : বিশ্বব্যাপী আজ নৈতিকতা ‘ব্যক্তিগত পছন্দের’ পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়েছে- যা চাইবে করবে, যা ভালো লাগবে তাই করবে। ফলে পরিবার ভাঙছে, মানসিক অবসাদ বাড়ছে, অপরাধের ধরন জটিল হচ্ছে, যৌনতা ব্যবসায় পরিণত, সুদ ও আর্থিক দাসত্ব সর্বত্র। শরিয়াহ এসে বলে- নৈতিকতা ব্যক্তিগত নয়; এটি সামাজিক দায়িত্ব। ইসলাম মানুষকে শুধু ইবাদতের মাধ্যমেই ভালো হতে বলে না; বরং দৃষ্টি সংযম, ভাষার মর্যাদা, চরিত্রের শুদ্ধতা, পরিবারের প্রতি দায়িত্ব, অসহায়দের প্রতি দয়া, দুর্বলের হক রক্ষা, অন্যের সম্মান রক্ষা- এসবকে আইনি, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক স্তরে দৃঢ় করে। ফলে নৈতিকতা শুধু ধারণা নয়; বরং সমাজের দৈনন্দিন আচরণ হয়ে ওঠে।

শরিয়াহর সর্বোচ্চ নীতি- কঠোরতা নয়, সৌম্যতা : রাসূল সা: বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোমলস্বভাব; তিনি কোমলতা ভালোবাসেন এবং কোমলতার বিনিময়ে এমন পুরস্কার দেন- যা তিনি কঠোরতার মাধ্যমে দেন না।’ (ইবনে মাজাহ-৩৬৮৮)

এই হাদিস শরিয়াহর মূলনীতি। শরিয়াহর প্রতিটি নিয়ম মানুষের প্রতি সহজ, দয়াময় ও লক্ষ্যনির্ভর।

শরিয়াহ সবসময় সহজ পথকে অগ্রাধিকার দেয় : অসুস্থ হলে রোজা ভেঙে দিতে বলে, ভ্রমণে নামাজে ছাড় দেয়, পানি না থাকলে তায়াম্মুম দেয়, ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে বিকল্প পথ দেয়, ক্ষতি হলে নিয়ম বাতিল করে দেয়, যাকে বলে- ‘চরম প্রয়োজন নিষিদ্ধকেও অনুমতি দেয়।’ এখানেই শরিয়াহ কঠোরতার সাথে নয়, বাস্তবতার সাথে সংযোগ স্থাপন করে।

শরিয়াহ সামাজিক ন্যায় ও দুর্বলদের রক্ষার দেয়াল : আজকের সমাজে একটি বড় সত্য হলো- আইন যত আধুনিকই হোক, দুর্বলরা সুরক্ষা পায় না; কারণ আইন ব্যাখ্যা করে শক্তিশালীরা, আর সমাজ চালায় ক্ষমতাবানরা। শরিয়াহ এই অবিচারের দেয়াল ভাঙে। ইসলামের বিচারব্যবস্থায় সবাই সমান। নবীজি সা:-এর সামনে যখন এক সম্ভ্রান্ত নারী চুরির অভিযোগে ধরা পড়ল এবং কিছু লোক ক্ষমার সুপারিশ করতে এলো, তখন তিনি বলেছিলেন, ‘আল্লাহর শপথ! আমার মেয়ে ফাতিমাও যদি চুরি করতো, আমি তারও হাত কর্তন করতাম।’ এমন ঘোষণা শুধু আইন নয়- এক সভ্যতার চরিত্র নির্মাণ।

দুর্বলের অধিকার রক্ষার পাঁচটি স্তর শরিয়াহ নিশ্চিত করে- ১. অর্থনৈতিক : জাকাত-সদকা দারিদ্র্য দূর করে

২. সামাজিক : অনাথ-বিধবা-দরিদ্রের দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সমাজের ৩. নৈতিক : জুুলুমকে বড় গুনাহ ঘোষণা

৪. আইনি : বিচারক দুর্বলের পক্ষ নেবে ৫. আধ্যাত্মিক : জালিমের বিরুদ্ধে আল্লাহর কঠোর হুঁশিয়ারি- এই শক্ত পাঁচ স্তরই শরিয়াহকে একটি পরিপূর্ণ ন্যায় ব্যবস্থায় পরিণত করেছে।

শরিয়াহর পারিবারিক আইন- সংসারকে ভাঙন থেকে বাঁচানোর সর্বোত্তম মডেল : বিশ্বের উন্নত দেশগুলো আজ পরিবার-বিভক্তির দুঃখজনক ইতিহাস ধারণ করছে, বিয়ে ভঙ্গের হার ৫০-৬০ শতাংশ পর্যন্ত। একলা বাবা-মা, অবহেলিত সন্তান, মানসিক সঙ্কট- এগুলো নিয়মিত ঘটনা। শরিয়াহ পরিবারকে শুধু সামাজিক চুক্তি মনে করে না; বরং পবিত্র আমানত বলে।

শরিয়াহর পারিবারিক আইন চারটি স্তরে পরিবারকে রক্ষা করে- আবেগ, দায়িত্ব, সম্মান, অর্থনৈতিক ভিত্তি, স্ত্রীর জন্য মোহর, ভরণপোষণ, অধিকার, সম্মান- এসব আইন পরিবারকে নিরাপদ রাখে। পুরুষকে দায়িত্বশীল নেতা হিসেবে গড়ে তোলে। স্ত্রীর সম্মান, নিরাপত্তা ও আবেগিক মর্যাদাকে সর্বোচ্চ স্থানে রাখে। সন্তানকে আদর্শ পরিবেশে বড় হতে সহায়তা করে।

এটিই শরিয়াহর পরিবারদর্শন- মায়ের কোলে মমতা, বাবার দায়িত্বে নিরাপত্তা এবং সন্তানদের জন্য নৈতিক বাতিঘর।

শরিয়াহ মানবাধিকারকে রক্ষা করে; কিন্তু বিশৃঙ্খল স্বাধীনতা নয় : আজ ‘ঐঁসধহ জরমযঃং’ নামে এক নতুন উচ্চারণ তৈরি হয়েছে, যা অনেকসময় মানবাধিকার নয়, ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বাধীনতার দিকে ঝুঁকে যায়। ফলে বিশৃঙ্খলা, নৈতিক পতন, পরিবারহানি, সমাজে অসাম্য। শরিয়াহ মানবাধিকারকে স্বীকৃতি দেয়; কিন্তু তা দেয় উচ্চতর নৈতিক কাঠামোর ওপর।

শরিয়াহতে মানবাধিকার তিন স্তরবিশিষ্ট- ১. আল্লাহর অধিকার- সামাজিক ন্যায় ও নৈতিকতার ভিত্তি। ২. মানুষের অধিকার- জীবন, সম্পদ, সম্মান। ৩. সমাজের অধিকার- নিরাপত্তা, পরিবেশ, নৈতিক শৃঙ্খলা। অর্থাৎ শরিয়াহ শুধু ব্যক্তিকে দেখে না; দেখে পরিবার, সমাজ এবং সভ্যতার ভবিষ্যৎ।

শরিয়াহ-শাস্তির আগে অসংখ্য দয়ার দরজা : মানুষ ভাবে- শরিয়াহ শুধু ‘কঠোর শাস্তি’; কিন্তু বরং শাস্তির আগে আছে বিশাল দয়ার জগত- ১. সন্দেহ হলে শাস্তি বাতিল। ২. বিচারকের অধিকার দণ্ড কমানো বা ক্ষমা। ৩. ক্ষতিপূরণ বা সমঝোতার সুযোগ। ৪. অপরাধীর মানসিক-সামাজিক অবস্থা বিবেচনা। ৫. অনুশোচনা করলে সুযোগ। হুদুদ শাস্তি বাস্তবে খুবই বিরল- কারণ শরিয়াহ মূলত শাস্তি চায় না; চায় সংশোধন। যেখানে শাস্তির লক্ষ্য সংশোধন- সেখানেই আইনের মানবিকতা সর্বোচ্চ।

আধুনিক বিশ্বের জন্য শরিয়াহর প্রয়োজন কেন বাড়ছে?

আজকের বিশ্বমানবিকতার সঙ্কটে- বঞ্চিত মানুষ, দুর্নীতি, মানসিক চাপ, পরিবার ভেঙে যাওয়া, যৌনতার বাণিজ্যিকীকরণ, অর্থনৈতিক দাসত্ব, অপারাধচক্রের বিকাশ, নৈতিক পতনের ঢেউ। আধুনিক আইন এসবের সমাধান দিতে ব্যর্থ। কারণ এগুলো কেবল অপরাধের শরীর দেখে; হৃদয় দেখে না। কিন্তু শরিয়াহ অপরাধের মূল কারণকেই উপড়ে ফেলে, দারিদ্র্য দূর করে, নৈতিক শিক্ষা দেয়, পরিবারকে শক্তিশালী করে, অর্থনৈতিক শোষণ বন্ধ করে, যৌনতা নিয়ন্ত্রণ করে, সহমর্মিতা বাড়ায়, সমাজে ভ্রাতৃত্ব গড়ে, আল্লাহর ভয় ও নৈতিক ধপপড়ঁহঃধনরষরঃু সৃষ্টি করে। অপরাধ যেখানে জন্মায়, শরিয়াহ সেই জায়গাতেই আলো জ্বালায়।

শরিয়াহ সভ্যতা নির্মাণের নৈতিক ভিত্তিপ্রস্তর

শরিয়াহ ছিল মুসলিম সভ্যতার এড়ষফবহ ঊৎধ-এর মূল শক্তি- যেখানে জ্ঞান, প্রযুক্তি, চিকিৎসা, বিজ্ঞান, সাহিত্য সবই বিকশিত হয়েছিল। কারণ শরিয়াহ মানুষকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে, নৈতিকতা দেয়, পরিবারকে রক্ষা করে, বিচারব্যবস্থাকে শক্ত করে, সম্পদকে সঠিক পথে প্রবাহিত করে। যে আইন মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও নৈতিক- সেই আইনই সভ্যতা গঠন করে।

লেখক : মুহাদ্দিস ও নায়েবে মুফতি, দারুল উলুম ঢাকা মিরপুর-১৩