ক্যা রি য়া র ভা ব না

Printed Edition
pas-3
ক্যা রি য়া র ভা ব না

জীবিকা নির্বাহের উদ্দেশ্যে অর্থ উপার্জনের জন্য পেশাগতভাবে স্থায়ী কোনো কাজের সাথে যুক্ত হওয়াকেই ক্যারিয়ার বলে। ক্যারিয়ার গঠন শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ক্যারিয়ারে সফলতার জন্য শিক্ষাজীবন থেকেই সঠিক পরিকল্পনা ও তদনুসারে চেষ্টা করা অত্যন্ত জরুরি। ক্যারিয়ার নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিচিত্র ভাবনা তুলে ধরছি আমি মো: জাহিদ হাসান শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

স্বপ্নের সারথি : মূল্যবোধ ও আত্মপ্রত্যয়

আমার স্বপ্নের বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল মধ্যবিত্ত পরিবারের সরল আঙিনায়, যেখানে ন্যায়পরায়ণতা ও সততা ছিল চিরাচরিত মূল্যবোধ। বাবা-মায়ের সংগ্রাম ও সততার দৈনন্দিন পাঠ থেকেই আমি প্রথম বুঝতে শিখি যে, সত্যিকারের সম্পদ শুধু অর্থে নয়, মূল্যবোধের অটল ভিতেই নিহিত। এই শিক্ষাই আমাকে আইনের জগতে আকর্ষিত করে, যা ন্যায় ও যুক্তির ভিত্তিতে সামাজিক ভারসাম্য রচনা করে।

আইনের শিক্ষার্থী হিসেবে এই যাত্রা কেবল আইনের ধারা মুখস্থ করা নয়; বরং প্রতিটি মামলার পেছনে লুকিয়ে থাকা মানুষের কষ্ট, আশা ও সঙ্ঘাতকে বুঝে নেয়ার। প্রতিটি সেমিনার, মক ট্রায়াল এবং আদালতে গিয়ে প্রকৃত মামলা পর্যবেক্ষণ- সবই আমাকে এই ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত শক্তি ও দুর্বলতার সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। আমি দেখতে পাই, একজন বিচারকের হাতে কেমন অপরিসীম ক্ষমতা ও দায়িত্ব ন্যস্ত থাকে- একটি রায় একটি পরিবারের ভাগ্য বদলে দিতে পারে, একটি সিদ্ধান্ত সামাজিক প্রথাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।

আমি বিশ্বাস করি, মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা একজন ব্যক্তি হিসেবে আমি সমাজের সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা, আর্থিক ও সামাজিক চাপকে গভীরভাবে অনুভব করতে পারব। এই সংবেদনশীলতাই একজন বিচারকের জন্য অমূল্য গুণ, যার সাহায্যে তিনি কঠোর আইনকে ন্যায় ও মমতার সাথে প্রয়োগ করতে সক্ষম হবেন।

এই পথ মসৃণ নয়। এর জন্য প্রয়োজন অধ্যবসায়, অটল নৈতিকতা, আইনের গভীর জ্ঞান এবং সর্বোপরি মানুষের প্রতি অকৃত্রিম আস্থা।

আমার স্বপ্ন হলো এমন একটি বিচারব্যবস্থার অংশ হওয়া, যেখানে দুর্বল সবলদের পাশে দাঁড়ায়, যেখানে আইনের চোখ সত্যিই অন্ধ- বর্ণ, গোত্র বা শ্রেণীভেদ করে না। আমার এই স্বপ্ন শুধু আমার নয়; এটি আমার পরিবারের, আমার সমাজের এবং সেই সব মানুষের যারা ন্যায়ের মুখ দেখার জন্য আজও অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় রয়েছেন।

আহসান হাবিব

শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

ডাটা নিয়ে স্বপ্নযাত্রা

ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবতে গেলে প্রথমেই আমার মাথায় আসে জীবনে এমন কিছু করার ভাবনা, যা দেশ ও দশের কাজে লাগে। বর্তমানে তথ্য-প্রযুক্তির যুগে আমাদের সবকিছুই ডেটা-নির্ভর বা আমাদের চারপাশে অসংখ্য ডেটা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। আর আমাদের কাজ হলো সেই ডেটাগুলো বিশ্লেষণ করে সঠিক ইনফরমেশন তৈরি করা। ডেটা সংগ্রহ, সংক্ষিপ্তকরণ, বিশ্লেষণ, প্রদর্শন এবং সবশেষে ডেটা সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রদান করা ইত্যাদি ডেটা-নির্ভর কাজ একটা আকর্ষণীয় ক্যারিয়ার হতে পারে। পরিসংখ্যান বিভাগের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে তাই আমার ক্যারিয়ার হিসেবে ডেটা নিয়ে কাজ করার প্রবল ইচ্ছে রয়েছে। ডেটা নিয়ে গবেষণামূলক কাজের মাধ্যমে আমি ভবিষ্যতে নতুন পৃথিবীর জন্য বিভিন্ন মঙ্গলজনক উদ্ভাবনের স্বপ্ন দেখি।

রেজওয়ানুল ইসলাম

শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা দূর করা জরুরি

ক্যারিয়ার শব্দটা কেমন যেন ভারী ভারী শোনায়, এখানে একটা মিশ্র অনুভূতি লক্ষ করা যায়। বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থীকে মাল্টিটাস্কিং করতে দেখা যায়; কিন্তু নিজের সঠিক ক্যারিয়ার কোনটা হবে তা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। ক্যারিয়ার নিয়ে সবার মধ্যে রয়েছে অনিশ্চয়তার ছাপ। আপাতদৃষ্টিতে ক্যারিয়ার বলতে বুঝি, অর্থ উপার্জনের জন্য কোনো পেশাকে বেছে নেয়া। ক্যারিয়ার শব্দটা আর একটু বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এটি একটি দীর্ঘ সময়ের প্রক্রিয়া, যেখানে অল্প অল্প করে নিজেকে গড়ে তুলতে হয়। কিন্তু এই দীর্ঘ পথে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর পরিশ্রম নষ্ট হয়ে যায় হতাশা ও অবসাদে। ক্যারিয়ারের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে তুলতে জ্ঞান ও দক্ষতার হাতিয়ার মজবুত করা জরুরি। প্রতিযোগিতামূলক পৃথিবীতে লক্ষ্য অর্জনের চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছানোর জন্য ধৈর্যের সাথে চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধৈর্য ধরার পরিবর্তে দ্রুত সাফল্য পাওয়ার প্রবণতা বেশি। ফলে, তাদের হতাশার মাত্রা আরো বেড়ে যায় এবং আত্মহত্যার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় অনেকে। ক্যারিয়ার নিয়ে আরো ইতিবাচক চিন্তা-ভাবনা করা প্রয়োজন শিক্ষার্থীদের, প্রয়োজনে ক্যারিয়ার কাউন্সেলরের পরামর্শ নিতে হবে। ক্যারিয়ারে আরো ভালো করতে হলে হতে হবে বিনয়ী, থাকতে হবে আত্মসম্মানবোধ, মূল্যবোধ, দায়িত্বশীল আচরণ ও অন্যকে শ্রদ্ধা করার মানসিকতা।

সামিয়া হক ইরা

শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়

কঠোর পরিশ্রমই ক্যারিয়ার গঠনের মূলমন্ত্র

সফল ক্যারিয়ার গঠনের জন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করা যেমন জরুরি, ঠিক তেমনই জরুরি হলো নিয়ম অনুযায়ী লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে প্রতিদিনের পরিশ্রম। আমার লক্ষ্য শিক্ষকতার মাধ্যমে সমাজ ও দেশের উন্নয়নের অংশ হিসেবে একটি সুন্দর ক্যারিয়ার গড়া। তার জন্য প্রস্তুতি হিসেবে প্রথম কাজ হবে- রুটিনমাফিক একাডেমিক পড়াশোনা সম্পূর্ণ করার পাশাপাশি শিক্ষামূলক বই, পত্র-পত্রিকা ও বিভিন্ন গবেষণাপত্র পড়া এবং তা নিয়ে লেখালেখির অভ্যাস গড়ে তোলা। দ্বিতীয়ত, সুন্দরভাবে কথা বলার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং সুন্দর চরিত্রগঠনে খেয়াল রাখা। তবে, এই কাজগুলোতে একদিনে সফলতা অর্জন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন প্রতিদিন সময়ের সঠিক ব্যবহার ও কঠোর পরিশ্রম। লক্ষ্য অর্জনের জন্য পরিশ্রমই আমার একমাত্র প্রত্যয়। ক্যারিয়ার নিয়ে বিভিন্ন জনের লক্ষ্য ও প্রস্তুতি ভিন্ন হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে, প্রচেষ্টা ছাড়া যেকোনো ধরনের ক্যারিয়ারেই সফলতা সম্ভব নয়। অর্থাৎ যতটুকু পরিশ্রম ততটুকুই সফলতা। তবে, পরিশ্রমের সাথে সৃষ্টিকর্তার ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা উচিত। নিয়মানুবর্তিতা, ধৈর্য ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমেই ক্যারিয়ারের কাক্সিক্ষত লক্ষ্য পূরণ হবে।

মো: মাসরুর রহমান

শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

ক্যারিয়ার : গন্তব্য নয়, বরং একটি বিবর্তনের পথ

বর্তমান শতাব্দীতে ক্যারিয়ার শব্দটি তার পুরনো সংজ্ঞা হারিয়েছে। আগে ক্যারিয়ার মানে ছিল একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে পড়ালেখা শেষ করার পর একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে কাজ করে সারা জীবন পার করে দেয়া। কিন্তু আমি মনে করি, আজকের পৃথিবীতে ক্যারিয়ার মানে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করা। একটা সময় ছিল যখন সার্টিফিকেটের জোরেই চাকরি পাওয়া যেত। কিন্তু এখন নিয়োগকর্তারা দেখেন, দক্ষতার গুণে আপনি সমস্যার সমাধান করতে পারেন কি না, কিংবা আপনার সৃজনশীলতা কতটুকু? আমার মতে, একজন শিক্ষার্থীর উচিত ডিগ্রিকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে নিজ প্রচেষ্টায় দক্ষতার ইমারত তৈরি করা।

প্রযুক্তির এই যুগে আজ যা আধুনিক কাল তা সেকেলে। তাই, ক্যারিয়ারে টিকে থাকার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো খাপ খাইয়ে নেয়ার ক্ষমতা। আমার ভাবনা অনুযায়ী, ক্যারিয়ার একটি ম্যারাথন দৌড়, ১০০ মিটারের স্প্রিন্ট নয়। এখানে ক্লান্তি আসবে, ভুল হবে, এমনকি পথও পরিবর্তন করতে হতে পারে। কিন্তু যতক্ষণ আপনি শেখার মধ্যে আছেন, ততক্ষণ আপনি ক্যারিয়ারের সঠিক পথেই আছেন।

সুতরাং, ক্যারিয়ার যেন কেবল আপনার জীবিকা নির্বাহের পথ না হয়, বরং তা আপনার ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন হলেই জীবন আলোকিত হবে।

মোছা: তানজিনা খাতুন

শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

দক্ষতা ও মূল্যবোধ অর্জন জরুরি

আধুনিক যুগে ক্যারিয়ার গঠনের পথও আধুনিকতার ধারায় চলে। তাই একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমার কাছে ক্যারিয়ার মানে শুধু জীবিকা নির্বাহ, ভালো ফল বা চাকরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি আত্মপরিচয় ও দায়িত্ববোধের প্রকাশ। আমার মনে হয়, পড়াশোনার পাশাপাশি নিজেকে জানার চেষ্টা করা এবং লক্ষ্যকে সুস্পষ্ট করা অত্যন্ত জরুরি। নিয়মিত অধ্যয়ন, সময়ের সঠিক ব্যবহার ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনই একজন শিক্ষার্থীর শক্ত ভিত্তি গড়ে তোলে। আর এভাবে শক্ত থাকতে ব্যর্থতাকে সরিয়ে নতুন পথ খুঁজে নেয়ার সাহস জোগাতে হবে। এ ছাড়াও বর্তমান কর্মবাজারে টিকে থাকতে হলে সূক্ষ্ম ও সৃজনশীল চিন্তা সব থেকে বেশি প্রয়োজন। আমি এমন একটি ক্যারিয়ার গড়তে চাই, যেখানে নিজের স্বপ্ন পূরণের পাশাপাশি, দেশ ও সমাজের কল্যাণে কাজ করার সুযোগ থাকবে এবং নিজের স্বপ্ন পূরণের পথ সুগম হবে।হ

ফাইজা আক্তার আলো

শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া