জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সভা
রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় হত্যা ও ধর্ষণের মতো অপরাধ বাড়ছে : ডা: শফিক
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলমীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, বর্তমানে সরকারি দলের লোকদের চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও দখলবাণিজ্য মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ঘুষ-দুর্নীতি চলছে অবাধে। সরকারি দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলেই মাত্র সাড়ে তিন মাসে তাদের শতাধিক নেতাকর্মী খুন হয়েছেন। বিএনপির সন্ত্রাসীদের হামলায় জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে শেরপুরে জামায়াতের একজন নেতা, নির্বাচনের পরে চুয়াডাঙ্গায় জামায়াতে ইসলামীর দু’জন নেতাকর্মী এবং অতি সম্প্রতি গাইবান্ধায় ইসলামী ছাত্রশিবিরের এক নেতা নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় দেশে হত্যা ও ধর্ষণের মতো অপরাধ জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, ফলে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে।
গতকাল রাজধানীর মগবাজারের আল-ফালাহ মিলনায়তনে কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন। সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন সভায় উপস্থাপন করেন। পরে দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি এবং সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পুশইন ইস্যুসহ বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিশদ আলোচনা ও পর্যালোচনা করা হয়।
ডা: শফিকুর রহমান বলেন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ জাতির সামনে দৃশ্যমান। পতিত ফ্যাসিস্ট শক্তি ও তাদের দোসররা দেশের ভেতর ও বাইরে থেকে আমাদের উসকানি দেয়ার চেষ্টা করবে। এই ক্ষেত্রে আমাদের অত্যন্ত ধৈর্য ও সতর্কতার সাথে পথ চলতে হবে এবং কারো পাতা ফাঁদে পা দেয়া যাবে না। জামায়াত আমির ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, জামায়াতে ইসলামী জনগণকে সাথে নিয়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী ২০২৪ এর আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় ২০২৪-এর জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ফসল বর্তমান সরকার চব্বিশের চেতনাকে ভুলিয়ে দেয়ার এক আত্মঘাতী ও অপরিণামদর্শী অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালিয়ে পরবর্তীতে সেই গণভোটের রায়কে পদদলিত করে জাতির সাথে এক প্রকার প্রতারণা শুরু করেছেন। এই সিদ্ধান্ত সরকারের জন্য বুমেরাং হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ব্যাংকিং খাতের সঙ্কট তুলে ধরে তিনি বলেন, সরকারের কিছু ভুল ও অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্তে দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। ফ্যাসিস্ট আমলে ধ্বংসপ্রায় ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি’ যখন মাত্র ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে সরকার ব্যাংকটিকে আবার ফ্যাসিবাদের দোসরদের হাতে তুলে দেয়ার আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি সরকারের ওই সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতিকে সমূলে ধ্বংস করে দেবে বলে মনে করেন। তিনি আরো বলেন, সরকার দেশের শিক্ষা, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা থেকে শুরু করে প্রতিটি স্তরে নগ্ন দলীয়করণ করছে। এমনকি নবগঠিত সংসদেও চরম বৈষম্য লক্ষ করা যাচ্ছে। সরকারি বরাদ্দের ক্ষেত্রে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে। এভাবে সরকার ক্রমান্বয়ে একদলীয় শাসনের দিকে ধাবিত হচ্ছে, যা জাতির জন্য চরম হতাশাজনক।
তিনি আরো বলেন, জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ইসলামী নীতির আলোকে নিয়মতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক পন্থায় রাজনীতি করে আসছে। বাংলাদেশের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সংগঠনের মর্যাদাপূর্ণ অবদান রয়েছে। জাতীয় সংসদের অংশীদারত্বমূলক সব নির্বাচনেই জামায়াতের প্রতিনিধি ছিল। জামায়াতে ইসলামীর দু’জন মন্ত্রী তিনটি মন্ত্রণালয়ে দেশ ও জাতিগঠনে তাদের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও কৃতিত্বপূর্ণ ভূমিকার মাধ্যমে দেশবাসীর প্রশংসা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর বর্তমান জাতীয় সংসদেও জামায়াতে ইসলামী প্রধান বিরোধী দল হিসেবে বৈষম্য, দারিদ্র্যমুক্ত এবং মর্যাদাপূর্ণ মানবিক বাংলাদেশ গঠনে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে চলেছে।
চব্বিশের শহীদরা যে আশা-আকাক্সক্ষা নিয়ে দেশের জন্য তাদের অমূল্য জীবন উৎসর্গ করেছেন এবং হাজারো পঙ্গুত্ববরণকারী ভাই-বোনেরা যে কঠিন ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাদের সেই স্বপ্ন পূরণে একটি বৈষম্যমুক্ত ও মর্যাদাপূর্ণ মানবিক বাংলাদেশ গঠনে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান এই বিরোধীদলীয় নেতা।
জামায়াত আমির ডা: শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে এবং সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ারের সঞ্চালনায় সভাটি সম্পন্ন হয়। সভার শুরুতে দারসুল কুরআন পেশ করেন সংগঠনের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এ টি এম মা’ছুম। এ ছাড়াও আরো উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ এবং কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের (পুরুষ ও মহিলা) সদস্যবৃন্দ।