আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশী পোশাকের নতুন সম্ভাবনা

চীনের ওপর নির্ভরতা কমাচ্ছে মার্কিন ফ্যাশন ব্র্যান্ড

ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক নীতি ও নীতিগত অনিশ্চয়তা এই পরিবর্তনের মূল কারণ বলে এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

শাহ আলম নূর
Printed Edition
Garments

বিশ্ব ফ্যাশন বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্যাশন কোম্পানিগুলো চীন থেকে তাদের সোর্সিং আরো কমাতে যাচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক নীতি ও নীতিগত অনিশ্চয়তা এই পরিবর্তনের মূল কারণ বলে এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এমন পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের জন্য এটি একটি বড় সুযোগ হতে পারে। তবে এর পেছনে রয়েছে একাধিক চ্যালেঞ্জ, যেগুলো মোকাবেলা না করলে এই সম্ভাবনা হাতছাড়া হতে পারে বলে তারা মনে করছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্যাশন কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিত্বকারী প্রায় ২৫টি কোম্পানির সর্বশেষ কার্যক্রম, আয় বিবরণী ও পরিচালকদের মন্তব্য বিশ্লেষণ করে গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন ইউনিভার্সিটি অব ডেলাওয়্যারের ফ্যাশন ও অ্যাপারেল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. শেং লু। ২০২৫ সালের মে থেকে জুন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, মার্কিন ফ্যাশন কোম্পানিগুলো বাড়তি শুল্ক এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের টানাপড়েনের কারণে চীন থেকে সরবরাহ হ্রাস করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান চীন থেকে পোশাক আমদানিকে এক অঙ্কের ঘরে নামিয়ে আনার চিন্তাভাবনা করছেন। আবার কেউ কেউ সম্পূর্ণভাবে চীন ছাড়ার পরিকল্পনাও করছে।

গবেষণায় বলা হয়, চীন থেকে সোর্সিং হ্রাস করে বিভিন্ন উৎসে সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি করাই এখন কোম্পানিগুলোর অন্যতম কৌশল। এতে উৎপাদন ব্যয় এবং রাজনৈতিক ঝুঁকি কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম পোশাক সরবরাহকারী দেশ। ২০২৩ সালে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের শেয়ার ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ২০১৩ সালে ছিল মাত্র ৬ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, চীন থেকে অর্ডার স্থানান্তরের সম্ভাবনা বাস্তবে রূপান্তর করতে পারলে বাংলাদেশের রফতানি আয় এবং শিল্প খাতে কর্মসংস্থান উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে।

প্লামি ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি শুল্কের কারণে ক্রেতারা চীন বাদ দিয়ে নতুন উৎস খুঁজছে। বাংলাদেশ দক্ষতা বাড়াতে পারলে এই অর্ডার আমরা পেতে পারি। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, নতুন অর্ডারের দাম বাড়লেও ক্রেতারা মূল্য আরো কমিয়ে দিতে চাইছে। অর্থাৎ রফতানিকারকরা তাদের মুনাফা হারাচ্ছে, যা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে ভারত, ভিয়েতনাম ও পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভিয়েতনামের শেয়ার দাঁড়িয়েছে ১৭.৮ শতাংশে, যেখানে ২০১৩ সালে তা ছিল ১০ শতাংশ। ভারতের শেয়ার ৫.৮ শতাংশ এবং পাকিস্তানের ২.৬ শতাংশ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো ইতোমধ্যে চীন থেকে আমেরিকার স্থানান্তরিত অর্ডারের একটি বড় অংশ দখল করেছে। ভিয়েতনাম তাদের উৎপাদন খাতকে প্রযুক্তিনির্ভর ও দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল করে তুলেছে। ভারতের রয়েছে ব্যাপক অভ্যন্তরীণ কাঁচামাল সরবরাহ ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক। বাংলাদেশ যদি নিজেদের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে না পারে, তবে এই প্রতিযোগীদের হাতে সম্ভাবনার সুফল চলে যেতে পারে বলে খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

চীন থেকে অর্ডার স্থানান্তরের সুযোগ কাজে লাগাতে গেলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ একাধিক সমস্যার সমাধান প্রয়োজন যার মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো জ্বালানি সংকট, উচ্চ সুদের হার, উৎপাদন দক্ষতার ঘাটতি এবং এলসি জটিলতা।

স্কয়ার ডেনিমের অপারেশনস ডিরেক্টর সাঈদ আহমেদ চৌধুরী বলেন, দেশের অনেক বড় বড় ভার্টিকালি ইন্টিগ্রেটেড পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠান যেমন বেক্সিমকো, নাসা, মাহমুদ গ্রুপ ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। এতে আমাদের উৎপাদন ক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। তিনি আরো বলেন, ভালুকা ও গাজীপুর অঞ্চলের অনেক কারখানা পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ না পাওয়ায় সম্পূর্ণ উৎপাদন ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারছে না। তদুপরি অনেক কারখানা দুর্বল ব্যাংকের সাথে কাজ করায় এলসি খোলায় জটিলতা দেখা দিচ্ছে।

দেশের রফতানিকারকরা বলছেন, করোনাকালীন সময় যেভাবে ব্যাংকিং খাত ও সরকারের পক্ষ থেকে সহজ শর্তে ঋণসহায়তা পাওয়া গিয়েছিল, এখন তা মিলছে না। ফলে পোশাক খাতের অনেক উদ্যোক্তা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী হলেও আর্থিক সহায়তা না থাকায় এগোতে পারছেন না।

স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে ৯ জুলাইয়ের পর কী হবে তা নিয়ে কোনো স্পষ্ট বার্তা নেই। ফলে আমরা কনফার্ম অর্ডার পাচ্ছি না, আর গ্রাহকদের সাথে ঠিকঠাক যোগাযোগ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি জানান, তার কোম্পানি বসন্তকালীন সিজনের ১৫ শতাংশ অর্ডার স্থগিত করেছে এবং ছুটির মৌসুমের জন্য ১০ শতাংশ কম অর্ডার পেয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু প্রচলিত তুলাভিত্তিক পোশাক নয়, এখন বেশি গুরুত্ব দিতে হবে মূল্য সংযোজনযুক্ত পণ্য ও কৃত্রিম তন্তু ভিত্তিক উৎপাদনে। কারণ বিশ্ববাজারের চাহিদা এখন উচ্চমানের ফ্যাশনেবল ও টেকসই পোশাকপণ্যে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রস্তুতকারীরা এখনো অনেক পিছিয়ে। নেই কাক্সিক্ষত প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ বা উপযুক্ত বিনিয়োগ।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্বের শীর্ষ ব্র্যান্ডগুলো এখন দ্রুত পরিবর্তনশীল ফ্যাশন ট্রেন্ডে কাজ করছে। আমাদের প্রস্তুতকারীরা যদি এখনো তুলার টি-শার্ট আর সাধারণ পোশাকেই আটকে থাকে, তাহলে এই অর্ডার স্থানান্তরের সুযোগও হাতছাড়া হবে। তারা মনে করছেন, চীন থেকে অর্ডার স্থানান্তরের প্রবণতা এক দিকে যেমন বৈশ্বিক অর্থনীতির নতুন বাস্তবতা তুলে ধরেছে, অন্য দিকে বাংলাদেশের জন্য তৈরি করেছে একটি বিরল সম্ভাবনা। তবে এ সম্ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য শুধু উচ্চাকাক্সক্ষা নয়, প্রয়োজন কঠোর প্রস্তুতি, কৌশলগত বিনিয়োগ এবং নীতিগত সহায়তা। এই সুযোগ কাজে না লাগাতে পারলে, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ পোশাক খাতে এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা হারিয়ে ফেলতে পারে বলে তারা মনে করছেন।