ফুলতলীর বালুচর

Printed Edition
555555555555---- sahitto
ফুলতলীর বালুচর

যাইদ আল মারুফ

আজ ফুলতলী নামটা খুব জনপ্রিয়। এই জনপ্রিয়তার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক সোনালি যুগ। যে যুগটা আমার, আমার সমবয়সীর। আজ থেকে প্রায় দেড় যুগ আগের কথা। ফুলতলী ছিল ধু-ধু বালুচর। বালুচরের প্রত্যেকটা বালি আমাদের চিনত। আমাদের পদধ্বনি বুঝত। বালির সাথে আমাদের ছিল নিবিড় সখ্য। এই সখ্য দেখে সাগরের জোয়ার-ভাটা অভিমান করত। আমরা বালিতে গড়াগড়ি খেতাম। বালি আমাদের সুড়সুড়ি দিত। আমাদের অর্ধোলঙ্গ দেহগুলো বালিতে ভরে যেত। আমরা দৌড়ে যেতাম সাগরে। সবাই মিলে জোয়ার-ভাটার অভিমান ভাঙাতাম।

আমরা উপকূলীয় অঞ্চলের। তবুও আমাদের খেলাধুলা ঋতুভিত্তিক ছিল না। এই যেমন, গ্রীষ্মের উত্তপ্ত বালুচর, বর্ষায় তার ঠাণ্ডা মেজাজ, শীত কিংবা শরতের বিষণ্নতা আমাদের দমিয়ে রাখতে পারেনি।

নিয়ম করে খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠতাম। খুঁজে নিতাম ফুটবল। ঘরের বাইরে থেকে শিস বাজাতাম। আমরা বুঝে ফেলতাম শিস বাজানোর অর্থ। মুহূর্তের মধ্যে সবাই একত্রিত হতাম। শুকনো গাছের ডাল দিয়ে মোটর সাইকেল বানাতাম। মুখে থাকত মোটর সাইকেলের নকল আওয়াজ। এক দৌড়ে চলে আসতাম ফুলতলীর বালুচরে। পায়ের বৃদ্ধা আঙ্গুলে রেখা টানতাম বালিতে। তৈরি হয়ে যেত ফুটবল খেলার মাঠ। সারা দিন ফুটবল খেলায় ডুবে থাকতাম। আমাদের পেটে ছিল না খাবারের ক্ষুধা। ক্ষুধা ছিল উপভোগের। আমাদের শরীরে প্রতিটি ফুসকুড়ির মাথায় থাকত একটি করে বালি। দৌড়ে ঝাঁপিয়ে পড়তাম সাগরে। দলেবলে গোসল করতাম নোনাজলে। আমাদের দেখে হাসত গ্রীষ্মের সূর্যিমামা। হাসত সাগরের জোয়ার-ভাটা।

ফুলতলীর বালুচরে ঝাঁকে ঝাঁকে লাল কাঁকড়া ছিল। তাদের সবার ছিল নিজস্ব গভীর গর্ত। চোখ দু’টি খাড়া করে গর্তের মুখে বসে থাকত। আমরা দৌড়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তাম কাঁকড়াদের উপর। কিছু কাঁকড়া গর্তে ডুকে যেত। কিছু কাঁকড়া দিশেহারা হয়ে দৌড়াতে থাকত। কাঁকড়ার গর্তগুলো খুব গভীর। আমাদের হাতগুলোও ছিল অনেক ধারালো। দুই হাতে কাঁকড়ার গর্ত খুঁড়ে ফেলতাম। হাজারবার কাঁকড়ার বড় পায়ের কামড় খেয়েছি। রক্তে লাল হয়ে যেত বালি। চোখে কোনো দিন ছিল না ব্যথার জল। মুখভরা ছিল হাসি। বড় বড় লাল কাঁকড়া ধরে পায়ে রশি বেঁধে দিতাম। তারপর একজনের কাঁকড়ার সাথে আরেকজনের কাঁকড়ার লড়াই লাগিয়ে দিতাম। গোলাকার করে বসে কাঁকড়াদের লড়াই দেখতাম। হাততালি দিয়ে হাসতাম। ভুলে যেতাম কাঁকড়ার কামড়ের ব্যথা।

ভেজা বালিতে গর্ত করলে পানি উঠে যেত। পানিমিশ্রিত বালি আর ডালপালা দিয়ে তৈরি করতাম সম্রাট শাহজাহানের তাজমহল, ঝুলন্ত ব্রিজ কিংবা জমিদার বাড়ি। বালি শুকিয়ে গেলে বাতাসে ঝরে যেত সেই তাজমহল। তখন বাতাসের উপর দেখাতাম অগোছালো রাগ। হাতে হাতে খনন করে ফেলতাম ছোট্ট খাল। সেইখানে ঢুকত জোয়ারের পানি। ঢুকত ছোট ছোট মাছ। আমরা সেই মাছগুলো ধরে বোতলে বন্দী করতাম। খেলা শেষে আবার সমুদ্রে ছেড়ে দিতাম। ঠেলাজালে ধরা পড়ত বড় বড় চিংড়ি। যেগুলো অনেক সময় আমাদের বকুনি থেকে বাঁচিয়ে নিত। ফুলতলীর গাছে গাছে ছিল আমাদের টাঙানো দোলনা। ক্যাঁচক্যাঁচ করে ছিড়ে যেত দোলনার রশি। ভেঙে যেত গাছের ডালপালা। আমরা ধপাস করে পড়ে যেতাম বালিতে। চোখে ছিল না ব্যথার জল। ছিল মুখ ভেঙানো হাসি।

ফুলতলী আজও আছে। নেই আর বালুচর। জোয়ার ভাটার অভিমান ধীরে ধীরে ক্ষোভে পরিণত হলো। ডুবিয়ে দিলো বালির সাথে আমাদের সখ্য। একঝাঁক লাল কাঁকড়া আর দেখা যায় না। হয়তো বিরক্ত হয়ে অন্য কোনো বালুচরে পাড়ি জমিয়েছে। সমুদ্রের স্রোত শিকড় থেকে উপড়ে ফেলল দোল খাওয়া প্রতিটি গাছ। ভাসিয়ে নিয়ে গেল দোলনার প্রতিটি রশি। এখন বাতাস বয়ে আনে কাদামাটির কাঁচা গন্ধ। নেই আর বালির তাজমহল ভাঙার প্রস্তুতি।

আজ আমাদের থুতনিতে এক মুষ্টি দাড়ি। কোথায় গেল সেই চামছেঁড়া ফুটবল! কোথায় হাফ জামাটা! কোথায় সে বালির তাজমহল! কোথায় ঝুলন্ত ব্রিজ!

ওহে ফুলতলীর বালুচর! আমরা তোমাকে এখনো স্মরণ করি। তুমি আবার ফিরিয়ে নাও আমাদের।