চোগলখোরির ভয়াবহ পরিণতি
Printed Edition
মুহাম্মাদ আল আমিন
মানুষের জিহ্বা ছোট হলেও এর ক্ষতি ভয়াবহ হতে পারে। গিবত, মিথ্যা আর চোগলখোরি, এসবই ঘর-সংসার ভাঙার জন্য যথেষ্ট। অনেক সময় সামান্য চোগলখোরির কারণে শান্ত পরিবারে আগুন জ্বলে ওঠে, রক্তপাতও ঘটে। আজকের এই কাহিনী তারই একটি হৃদয়বিদারক দৃষ্টান্ত। একসময় এক ধনী ব্যক্তি গোলাম কেনার জন্য বাজারে গেলেন। অনেক গোলামের মধ্যে তিনি এক যুবক গোলামকে পছন্দ করলেন। গোলামের মালিক বললেন, ‘আমার এই গোলামটির সব গুণই ভালো, শুধু একটি দোষ আছে, সে সামান্য চোগলখোরি করে। ধনী ব্যক্তি একটু ভেবে নিলেন। মনে মনে বললেন, চোগলখোরি তেমন কোনো বড় দোষ নয়। মদ্যপান, জুয়া, চুরি ইত্যাদি নেই তার মধ্যে। সামান্য কথাবার্তা অন্যের কাছে পৌঁছালে তেমন ক্ষতি হবে না। এভাবে তিনি গোলামটিকে কিনে নিজের ঘরে নিয়ে এলেন। গোলাম পরিশ্রমী ছিল, কাজে-কারবারে মুনিবকে সাহায্য করত। ধীরে ধীরে মালিকও খুশি হলেন। কিন্তু শয়তানের ফাঁদ তো নিঃশব্দেই আসে। একদিন হঠাৎ তার অন্তরে আবার মাথাচাড়া দিল সেই পুরনো বদ-অভ্যাস- চোগলখোরির প্রবণতা।’ সে মুনিবের স্ত্রীর কাছে গিয়ে বলল, আপনার স্বামীর অন্য মেয়ের সাথে সম্পর্ক আছে। ওই মেয়েকে আপনার স্বামী শিগগিরই বিয়ে করবেন। আপনাকে আগের মতো বেশি একটা পছন্দ করেন না। কাঁপতে লাগলেন। তার চোখ ভিজে গেল, হৃদয় ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। গোলাম আরো কৌশলে বলল, আপনি যদি চান যে তিনি আপনাকে আগের মতো ভালোবাসুক এবং ওই মেয়েকে বিয়ে না করুক তাহলে এখনই আপনার এই ব্যাপারে চেষ্টা-তদবির করা উচিত।
অবশ্য আমিও একটা তদবির জানি, যে তদবিরের দ্বারা আপনার স্বামী শুধু আপনাকেই ভালোবাসবে এবং ওই মেয়ের প্রতি অনীহা চলে আসবে। মহিলা বলল, তাড়াতাড়ি আমাকে ওই তদবির বলো। গোলাম বলল, তেমন কিছু না, আপনার স্বামী ঘুমানোর পরে ছুরি দিয়ে তার কণ্ঠনালির উপরের একটি পশম কেটে নিজের কাছে রেখে দেবেন। তাহলেই আপনার প্রতি তার আকর্ষণ বেড়ে যাবে। সরল, নিরপরাধ স্ত্রী কথাটি বিশ্বাস করে ফেললেন। চোখে জল, মনে ভয়, তবু একটুখানি আশা ‘এতে যদি সংসারটা টিকে যায়...’ আজকেই আমি ওই পশম সংগ্রহ করব।
ওই দিকে চোগলখোর গোলাম মুনিবের স্ত্রীকে ফুসলিয়ে বসে থাকেনি, সে মুনিবের কাছে গিয়ে বলল, ‘হুজুর! আপনার স্ত্রীর এক লোকের সাথে গোপন সম্পর্ক আছে। তিনি আপনার কাছ থেকে মুক্তি চায়। তাই তারা ষড়যন্ত্র করে আজ রাতে ঘুমানো অবস্থায় আপনার গলা কাটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’ বিশ্বাস না হলে রাতে ঘুমানোর ভান করে শুয়ে থাকবেন। দেখবেন, আপনার স্ত্রী ছুরি নিয়ে আপনার পাশে যাবে। মুনিবের মাথা ঝিমঝিম করে উঠল। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন সত্যতা যাচাই করবেন। রাত গভীর হলো। চাঁদের আলো জানালা দিয়ে ঢুকছে, আর বাতাসে কাঁপছে ঘরের পর্দা। স্ত্রী নিঃশব্দে উঠলেন, হাতে ছুরি। মনের মধ্যে কাঁপন, চোখে জল, মুখে শুধু এক প্রার্থনা-
‘হে আল্লাহ, আমার স্বামী যেন শুধু আমাকেই ভালোবাসেন।’ তিনি আলতো করে এগিয়ে গেলেন ঘুমন্ত স্বামীর কাছে। ঠিক সেই মুহূর্তে স্বামী চোখ খুললেন! দেখলেন, তার স্ত্রীর হাতে ছুরি! ভয়ে, ক্ষোভে, প্রতারণার ভাবনায় তিনি চিৎকার করে উঠলেন, ছুরি কেড়ে নিয়ে এক আঘাত করলেন স্ত্রীর বুকে! স্ত্রী নিথর হয়ে গেলেন, মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন। ঘর নিস্তব্ধ, বাতাস ভারী হয়ে গেল রক্তের গন্ধে। পরদিন সকালেই গ্রামে বাতাসের মতো ছড়িয়ে গেল খবর। স্ত্রীর আত্মীয়রা ছুটে এলো, ক্রোধে তারা ওই খুনি মুনিবকেও হত্যা করল। এভাবে একটি মাত্র গোলামের চোগলখোরির কারণে স্ত্রী নিহত হলো, নিহত হলো স্বামী, দুই পরিবারের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ দেখা দিলো! তাই তো মহান আল্লাহ তায়ালা চোগলখোরকে ফাসেক বা দুরাচারী বলেছেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- ‘হে মুমিনগণ! কোনো ফাসেক যদি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে ভালোভাবে যাচাই করে দেখবে, যাতে তোমরা অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে না বসো। ফলে নিজেদের কৃতকর্মের কারণে তোমাদেরকে অনুতপ্ত হতে হয়।’ (সূরা আল হুজুরাত, আয়াত-৬)
চোগলখোরি কী : কেউ যদি একজনের দোষ বা কথা অন্য জনের কাছে এ জন্য বলে যেন শ্রোতা তার ক্ষতি করে। ক্ষতি যদি হয়েই যায় তাহলে বর্ণনাকারী বেশ খুশি হয়- বেশ ভালো হয়েছে, তার কষ্ট হয়েছে। বর্ণনাকৃত দোষটি বাস্তবেই ওই ব্যক্তির মাঝে পাওয়া যাক বা না যাক- শ্রবণকারী যেন কষ্ট দেয় এটিই উদ্দেশ্য। এরই নাম নামিমাহ বা চোগলখোরি। (ইসলাহি খুতুবাত চতুর্থ খণ্ড, ৭১-পৃষ্ঠা) ইমাম গাযালি রহ. তার বিখ্যাত গ্রন্থ ইহইয়াউ উলুমুদ্দিনে লিখেছেন, কারো গোপন কথা বা তথ্য ফাঁস করে দেয়াও চোগলখোরির অন্তর্ভুক্ত। যেমন কারো এমন কিছু কথা আছে অথবা এমন বিষয় আছে, ভালো কিংবা মন্দ- যার সে প্রকাশ চায় না। যেমন- একজনের ধনসম্পদ আছে। মানুষ জেনে ফেলুক এটি সে চায় না। অথচ আপনি বলে বেড়ালেন, অমুকের এই সম্পদ আছে। তাহলে এটিও চোগলখোরি, যা সম্পূর্ণ হারাম। অথবা কেউ কোনো পারিবারিক পরিকল্পনা করেছে। আপনি সেটি কোনোভাবে জেনে ফেললেন। আর তা বলে বেড়াচ্ছেন, এটিও চোগলখোরির শামিল। অনুরূপভাবে কারো গোপন তথ্য প্রকাশ করে দেয়াও চোগলখোরির অন্তর্ভুক্ত। হাদিস শরিফে আছে, ‘মজলিসের কথাবার্তা আমানত’। যেমন কেউ আপনাকে বিশ্বস্ত ভেবে মজলিসে আপনার সামনে আলোচনা করল, তাহলে এটি আমানত। আপনি যদি অন্যের কাছে বলে দেন, তাহলে আমানতের খেয়ানত হবে এবং এটিও চোগলখোরি হবে। (ইহইয়াউ উলুমুদ্দিন জিহ্বার আপদ অধ্যায় ৫৭৯ পৃষ্ঠা)।
চোগলখোরির ক্ষতি : হজরত নবী করিম সা: বলেছেন- চোগলখোর বেহেশতে প্রবেশ করবে না। (আনওয়ারুল মিশকাত শরহে মিশকাতুল মাসাবিহ, ষষ্ঠ খণ্ড, ৪৬১২ নং হাদিস, মুসলিম শরিফ প্রথম খণ্ড, ১৯২ পৃষ্ঠা, ১৯৮, ১৯৯, ২০০ নং হাদিস, বুখারি শরিফ নবম খণ্ড, ৫৬৩০ নং হাদিস) এ হাদিসের ব্যাখ্যায় আল্লামা মনযুর নোমানি রহ. বলেন, হাদিসটির মর্ম এই যে, পরনিন্দা ও চোগলখোরির অভ্যাস ওইসব মারাত্মক গুনাহের অন্তর্ভুক্ত যেগুলো জান্নাতে প্রবেশের পথে অন্তরায় হবে এবং কোনো মানুষ এ পবিত্র ও শয়তানি স্বভাবের সাথে জান্নাতে যেতে পারবে না। হ্যাঁ, আল্লাহ তায়ালা যদি নিজ অনুগ্রহে কাউকে মাফ করে দিয়ে অথবা এ অপরাধের শাস্তি দিয়ে তাকে পবিত্র করে নেন, তাহলে এরপর সে জান্নাতে প্রবেশাধিকার লাভ করতে পারে। (মাআরিফুল হাদিস, দ্বিতীয় খণ্ড, ১৩৮ পৃষ্ঠা, ১৮৫ নং হাদিস, বুখারি)
অন্য হাদিসে আছে, নবী করিম সা: বলেছেন, ‘আল্লাহর উত্তম বান্দা হচ্ছে তারা, যাদেরকে দেখলে আল্লাহর কথা স্মরণ হয়।’ আর নিকৃষ্ট বান্দা হচ্ছে তারা, যারা চোগলখোরি করে বেড়ায় ও বন্ধুদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে এবং যারা আল্লাহর নিষ্পাপ বান্দাদেরকে কোনো গুনাহে জড়িত করে দিতে অথবা কষ্টে ফেলে দিতে প্রয়াসী থাকে। (মা’আরিফুল হাদিস, দ্বিতীয় খণ্ড, মুসনাদে আহমাদ, অষ্টম খণ্ড, ১১৬-পৃষ্ঠা, ২৪ নং হাদিস, বায়হাকি)
মানুষের উচিত, সাহচর্য ও ভালোবাসার জন্য আল্লাহর এমন বান্দাদেরকে খুঁজে বের করা, যাদেরকে দেখলে অন্তরের উদাসীনতা দূর হয়ে যায় এবং আল্লাহর স্মরণ এসে যায়। এর বিপরীত যারা আল্লাহকে চিনে না এবং মানুষকে কষ্ট দেয়ার পেছনে লেগে থাকে, মানুষের বদনাম ও ক্ষতিসাধন করা যাদের নেশা, এমন লোকদের থেকে নিজেকে দূরে রাখবে এবং তাদের মন্দ প্রভাব থেকে বাঁচতে চেষ্টা করবে। (মা’আরিফুল হাদিস, দ্বিতীয় খণ্ড, ১৩৮-পৃষ্ঠা, ১৮৬ নং হাদিস, মুসনাদে আহমাদ, বায়হাকি)
একবার নবী করিম সা: দু’টি কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন এবং বললেন, এ দু’টি কবরেই আজাব হচ্ছে। তবে বড় কোনো গুনাহের কারণে আজাব হচ্ছে না। তার মধ্যে একজন প্রস্রাবের সময় পর্দা করত না, অপরজন চোগলখোরি করে বেড়াত। (মুসনাদে আহমাদ, অষ্টম খণ্ড, ১১৬-পৃষ্ঠা, ২৬ নং হাদিস, রিয়াজুুস সালেহিন, ৬৯১-পৃষ্ঠা, ১৫৩৭ নং হাদিস, নাসরুল বারি শরহে বুখারি, ১১তম খণ্ড, ২০২-পৃষ্ঠা, ৫৬৫৩ নং হাদিস)
চোগলখোরের কথা শোনার পর করণীয় : ইমাম গাযালি রহ. বলেন, যে ব্যক্তির কাছে চোগলখোরি করা হয়, তার ছয়টি কাজ করা কর্তব্য-
১. চোগলখোরির কথা বিশ্বাস করা যাবে না। কারণ শরিয়তের দৃষ্টিতে সে ফাসেক। আর ফাসেকের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়।
২. তাকে চোগলখোরি করতে নিষেধ করবে এবং বলবে দ্বিতীয়বার আমার কাছে এরূপ কথা বলবে না।
৩. চোগলখোরের কাজকে মন থেকে ঘৃণা করবে।
৪. কেবল তার কথায় অনুপস্থিত ব্যক্তির প্রতি কুধারণা পোষণ করবে না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘তোমরা অনেক কুধারণা থেকে বেঁচে থাকো, নিশ্চয় কতক কুধারণা পাপ।’ (সূরা হুজুরাত-৬)
৫. চোগলখোরের কথার কারণে তামাশা ও তার সত্যতার খোঁজাখুঁজি করবে না।
৬. চোগলখোরকে চোগলখোরি করতে নিষেধ করে নিজে আবার চোগলখোরি শুরু করে দেবে না। উদাহরণত : মানুষের কাছে বলবে না যে, অমুক ব্যক্তি আমাকে এমন এমন বলে। (ইহইয়াউ উলুমুদ্দিন জিহ্বার আপদ অধ্যায় ৫৭৯-পৃষ্ঠা)
চোগলখোরির কাফফারা (প্রায়শ্চিত্ত) : চোগলখোরি থেকে মুক্তি পেতে ও আল্লাহর ক্ষমা অর্জনের জন্য একজন মুমিনের উচিত নিচের আমলগুলো আন্তরিকভাবে পালন করা-
ক. আন্তরিক তওবা করা : গুনাহের জন্য গভীর অনুতাপ প্রকাশ করে, ভবিষ্যতে আর না করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নেয়া।
খ. যাদের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি করেছে, তাদের মীমাংসা করা : নিজের কারণে ভাঙা সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা, উভয়পক্ষের কাছে ক্ষমা চাওয়া।
গ. ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য দোয়া ও ইস্তিগফার করা : যাদের বদনাম বা ক্ষতি হয়েছে, তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা ও দোয়া করা।
ঘ. জবান সংযত রাখা : নিজের মুখকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, অপ্রয়োজনীয় কথা ও পরনিন্দা থেকে দূরে থাকা।
ঙ. বেশি বেশি নেক আমল ও সাদকা করা : নামাজ, রোজা, কুরআন তিলাওয়াত ও দান-সাদকার মাধ্যমে নিজের গুনাহ মুছে ফেলার চেষ্টা করা।
(তথ্য সূত্র : বুখারি শরিফ নবম খণ্ড, নাসরুল বারি শরহে বুখারি ১১তম খণ্ড, মুসলিম শরিফ প্রথম খণ্ড, মুসনাদে আহমাদ অষ্টম খণ্ড, আনওয়ারুল মিশকাত শরহে মিশকাতুল মাসাবিহ ষষ্ঠ খণ্ড, মা’আরিফুল হাদিস দ্বিতীয় খণ্ড, ইহইয়াউ উলুমুদ্দিন, ইসলাহি খুতুবাত, মাসিক মুঈনুল ইসলাম, মুসলিম বাংলা)
লেখক : শিক্ষক, মারকাযুন নূর ওয়াল হুদা রামনগর এবং ইমাম, হাশুয়ারি নয়াপাড়া জামে মসজিদ, কেন্দুয়া, নেত্রকোনা