যেভাবে বিলাসপণ্যে পরিণত হয় বরফ

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

১৮৩০ থেকে ১৮৭০ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারতের শহরগুলোতে বরফ ছিল বিলাসপণ্য। তখন স্থানীয়ভাবে বরফ সংগ্রহ করা কঠিন ও ব্যয়বহুল ছিল। মোগল আমলে হিমালয় থেকে বরফ আনা হতো, আবার হুগলি অঞ্চলে কৃত্রিমভাবে বরফ তৈরি করা হলেও তা ছিল নিম্নমানের এবং দ্রুত গলে যেত। ফলে উন্নতমানের বরফের চাহিদা বাড়তে থাকে।

দক্ষিণ মুম্বাইয়ের অ্যাপোলো সড়ক (বর্তমানে শহীদ ভগত সিং সড়ক) এলাকায় ১৮৪৩ সালে নির্মিত গম্বুজাকৃতির সাদা ভবন ‘বোম্বে আইস হাউজ’ একসময় ছিল ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বরফ সংরক্ষণাগার। প্রায় ১৬ ফুট উঁচু এই ভবনে একসাথে প্রায় ১৫০ টন বরফ মজুদ রাখা যেত। এর বিপরীতেই ছিল তৎকালীন সরকারি ডকইয়ার্ড, যা বরফ পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত।

এই চাহিদাকে কেন্দ্র করে মার্কিন ব্যবসায়ী ফ্রেডেরিক টিউডর ‘আইস কিং’ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। ১৮৩৩ সালে বোস্টন থেকে ১৮০ টন বরফ নিয়ে যাত্রা করা ‘টাসক্যানি’ জাহাজ প্রায় চার মাস পর কলকাতায় পৌঁছায়, যার মধ্যে প্রায় ১০০ টন বরফ অক্ষত ছিল। এ ঘটনা ভারতীয়দের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি করে এবং বরফ দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

টিউডরের সহযোগী নাথানিয়েল জার্ভিস ওয়াইথ বরফ কাটার আধুনিক যন্ত্র উদ্ভাবন করেন, যা উৎপাদন ও সংরক্ষণ সহজ করে। বরফ পরিবহনে করাতের গুঁড়া ও বিশেষ স্টোরেজ ব্যবহারের ফলে দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় বরফ কম গলত। ফলে কলকাতা, বোম্বে ও মাদ্রাজে আমেরিকান বরফের বাণিজ্য দ্রুত বিস্তৃত হয়।

এই ব্যবসা থেকে বিপুল মুনাফা অর্জনের পাশাপাশি টিউডর ব্রিটিশ প্রশাসনের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধাও পান-যেমন শুল্কমুক্ত আমদানি, দ্রুত আনলোডিং এবং নির্দিষ্ট স্থানে জাহাজ ভেড়ানোর অনুমতি। ধীরে ধীরে বরফঘরগুলো নির্মাণ ও সম্প্রসারণ করা হয় সরকারি ও বেসরকারি সহায়তায়।

তবে ১৯ শতকের শেষ দিকে কৃত্রিমভাবে বরফ তৈরির প্রযুক্তি আবিষ্কার এবং রেলপথের বিস্তারের ফলে বরফ পরিবহন সহজ হয়ে যায়। এতে বিদেশ থেকে বরফ আমদানির প্রয়োজনীয়তা কমে যায়। পাশাপাশি বোস্টনের দূষণের কারণে বরফের মানও কমতে থাকে। ১৮৭৮ সালে ‘দ্য বেঙ্গল আইস কোম্পানি’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভারতে স্থানীয় বরফ উৎপাদন শুরু হয়। ফলে আমদানি নির্ভরতা কমে এবং আইস হাউজগুলোর গুরুত্ব হ্রাস পায়। কলকাতার আইস হাউজ ১৮৮২ সালে এবং বোম্বের আইস হাউজ ১৯২০-এর দশকে ভেঙে ফেলা হয়।

বর্তমানে চেন্নাইয়ের আইস হাউজ ভবনটি ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে টিকে আছে। একসময় এটি আবাসিক ভবন হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে এবং কথিত আছে, স্বামী বিবেকানন্দ তার ভারত ভ্রমণের সময় এখানে অবস্থান করেছিলেন।

ইতিহাসবিদদের মতে, ইন্দো-আমেরিকান বরফ বাণিজ্য শুধু একটি ব্যবসা নয়, বরং এটি ছিল প্রযুক্তি, বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং ঔপনিবেশিক অর্থনীতির এক অনন্য উদাহরণ।