ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনি কে কেন তিনি সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু?

ট্রাম্প বলেছিলেন খামেনির ‘খুব চিন্তিত’ হওয়া উচিত, তিনি ইরানিদের সরকার উৎখাতের জন্য আহ্বান জানান

Printed Edition

আলজাজিরা

ইরান ও ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দীর্ঘদিনের ছায়াযুদ্ধ এখন এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। শনিবার ইরানের রাজধানী তেহরানসহ দেশজুড়ে চালানো নতুন দফার হামলায় সরাসরি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কার্যালয় ও বাসভবনের নিকটবর্তী এলাকাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এই হামলা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চলমান আলোচনাকে ধূলিসাৎ করার পাশাপাশি দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বকে ‘নিশ্চিহ্ন’ করার এক প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে।

হামলার কেন্দ্রবিন্দু ও খামেনির অবস্থান

শনিবারের এই হামলায় তেহরানের উত্তরাঞ্চলীয় শেমিরান এলাকায় অবস্থিত প্রেসিডেন্ট প্যালেস এবং খামেনির কম্পাউন্ডের কাছে অন্তত সাতটি মিসাইল আঘাত হেনেছে। বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, খামেনির অফিসের খুব কাছেই বিস্ফোরণগুলো ঘটেছে। তবে হামলার সময় খামেনি কোথায় ছিলেন, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। রয়টার্সের সূত্র মতে, তাকে নিরাপদ কোনো গোপন স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে।

কে এই আয়াতুল্লাহ খামেনি?

৮৬ বছর বয়সী এই ইসলামী পণ্ডিত ১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার পদে আসীন। তিনি ইরানের ইসলামী বিপ্লবের স্থপতি আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির উত্তরসূরি।

ক্ষমতা : ইরানের সরকার, সামরিক বাহিনী এবং বিচার বিভাগের ওপর তার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তিনি দেশটির আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক উভয় দিকেরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তদাতা।

প্রতিষ্ঠানে নিয়ন্ত্রণ : খামেনির শক্তির প্রধান উৎস হলো ‘ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস’ (আইআরজিসি) এবং ‘বাসিজ’ আধ্যাত্মিক বাহিনী।

নীতি : ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তিনি পশ্চিমা বিশ্বের কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ মোকাবেলা করে আসছেন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ‘এক নম্বর শত্রু’ এবং ইসরাইলকে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করেন।

কেন তিনি এখন প্রধান লক্ষ্যবস্তু?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের শীর্ষ নেতৃত্ব সরাসরি খামেনিকে অপসারণ বা হত্যার ইঙ্গিত দিয়েছেন। এর প্রধান কারণগুলো হলো:

শাসন ব্যবস্থার ‘ডিক্যাপিটেশন’

বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে খামেনিকে সরিয়ে দিলে ইরানের বর্তমান শাসন ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, খামেনিকে হত্যা করা হলে দীর্ঘদিনের এই সঙ্ঘাতের অবসান ঘটতে পারে।

পারমাণবিক কর্মসূচি

যদিও খামেনি বারবার বলেছেন যে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না এবং এটি কেবল বেসামরিক কাজের জন্য, কিন্তু ইসরাইল ও ট্রাম্প প্রশাসন তা বিশ্বাস করে না। তাদের মতে, খামেনি ক্ষমতায় থাকা মানেই মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের পারমাণবিক আধিপত্যের ঝুঁকি বজায় থাকা।

ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প খামেনিকে সরাসরি হুমকি দিয়ে বলেছেন, তিনি একজন ‘সহজ লক্ষ্যবস্তু’। ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানিদের তাদের সরকার উৎখাত করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘নিজেদের সরকার দখল করে নিন, এটাই আপনাদের প্রজন্মের একমাত্র সুযোগ।’

সংঘাতের ভবিষ্যৎ

আলজাজিরার বিশ্লেষক আলী হাশেমের মতে, এই হামলার মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের রাজনৈতিক এলিটদের ‘শির-েছদ’ করা। তবে এই কৌশল কতটা সফল হবে তা এখনো অনিশ্চিত। এক দিকে খামেনি তার অনমনীয় অবস্থান বজায় রাখছেন, অন্য দিকে ইসরাইলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাৎজ স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘খামেনির মতো একজন একনায়কের টিকে থাকার অধিকার নেই।’

এই আক্রমণাত্মক নীতি ইরানকে আরো কঠোর প্রতিশোধের দিকে ঠেলে দিতে পারে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক মহাযুদ্ধের দিকে ধাবিত করার ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।